আধুনিক প্যারেন্টিং এর জগতে ‘পজিটিভ প্যারেন্টিং’ একটি জনপ্রিয় ধারণা। কিন্তু যখন এই ইতিবাচকতা চরম রূপ নেয়, তখন তা ‘টক্সিক পজিটিভিটি’ বা বিষাক্ত ইতিবাচকতায় পরিণত হয়। এটি একটি মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে নেতিবাচক আবেগকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা হয় এবং সবসময় ইতিবাচক থাকার চাপ তৈরি করা হয়। শিশু লালন-পালনে এই পদ্ধতি অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।
কী এই ‘টক্সিক পজিটিভিটি’? (What is Toxic Positivity?)
“সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে”, “তোমাকে পারতেই হবে”, “মন খারাপ করবে না”—বএই কথাগুলো আমরা প্রায়শই আমাদের সন্তানদের বলি। এতে কোনো ভুল নেই, কারণ আমরা তাদের মনে সাহস ও ইতিবাচকতা সঞ্চার করতে চাই।
কিন্তু, যখন এই ইতিবাচকতা চরম রূপ নেয় এবং শিশুদের আবেগ, ভয় বা দুঃখকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, তখন তা ‘Toxic Positivity’ বা ‘বিষাক্ত ইতিবাচকতা’ হয়ে দাঁড়ায়। এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে আমরা শুধুমাত্র (সন্তানদের) ভালো লাগা বা ইতিবাচক অনুভূতিকেই গ্রহণ করি, আর কষ্ট, দুঃখ বা হতাশার মতো স্বাভাবিক আবেগগুলোকে জোর করে দমিয়ে রাখি।
এটি যেন শিশুদের অদৃশ্যভাবে বলে, “তুমি কাঁদতে পারো না, তোমাকে সব সময় খুশি থাকতে হবে।” এটি বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। জীবন যে শুধু রোদ্দুরে ভরা তা নয়, জীবনে বৃষ্টিও পড়ে, মাঝে মাঝে ঝড়ও আসে। সেই ঝড়-বৃষ্টিকে অস্বীকার করা আল্লাহ তা’আলার দেয়া প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো।
আপনার আচরণে টক্সিক পজিটিভিটির লক্ষণগুলি চিনুন (Signs of Toxic Positivity in Your Behavior)
এখন প্রশ্ন করতে পারেন, আমরা কীভাবে বুঝব যে আমাদের প্যারেন্টিংয়ে টক্সিক পজিটিভিটি আছে? আজ তা নিয়েই আলোচনা করবো। নিচে চারটি সাধারণ লক্ষণ দেওয়া হলো, যা আমাদের নিজেদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করবে ইন শা আল্লাহ :
১. শিশুর প্রতি সহমর্মিতার অভাব
সহমর্মিতা মানে হলো অন্যের কষ্টকে অনুভব করা। যখন আমাদের সন্তান মন খারাপ করে, তখন তার কষ্টকে ছোট করে দেখা বা অবমূল্যায়ন করা টক্সিক পজিটিভিটির একটি বড় লক্ষণ।
উদাহরণস্বরূপ, আপনার সন্তান হয়তো তার প্রিয় খেলনাটি হারিয়ে ফেলেছে এবং সে খুব মন খারাপ করে কাঁদছে। আপনি তাকে সান্ত্বনা না দিয়ে বললেন,”এত কান্না কিসের? তোমাকে আরেকটা কিনে দেবো। এত ছোট জিনিসের জন্য এভাবে কাঁদতে হয়?”
এই কথাগুলো বলার মাধ্যমে কিন্তু আপনি তার কষ্টকে “তুচ্ছ” বা “ছোট” বলে দিলেন। আপনার কাছে খেলনাটা হয়তো সামান্য, কিন্তু তার কাছে তা হয়তো অনেক মূল্যবান। যখন আপনি তার কষ্টকে গুরুত্ব দিলেন না, তখন সে শিখল যে তার অনুভূতি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
২. সন্তানকে কাঁদতে না দেওয়া বা দুঃখ প্রকাশে বাধা দেওয়া
কান্না মানুষের একটি স্বাভাবিক আবেগ, যা মনের ভার হালকা করে। কিন্তু আমরা প্রায়ই আমাদের সন্তানদের কান্নায় বাধা দেই। যেমন:
• যখন ছোট শিশু ব্যথা পেয়ে কাঁদে, আমরা প্রায় বলি, “চুপ করো, কান্না করা পচা কাজ।”
• যখন একটু বড় হয়, তখন বলি, “এত বড় মেয়ে হয়ে কাঁদতে লজ্জা করে না?” অথবা “ছেলে মানুষের কাঁদতে নেই।”
এই ধরনের কথাগুলো শিশুদের মনে একটি ভুল ধারণা তৈরি করে, কান্না করা দুর্বলতা বা লজ্জার বিষয়। এর ফলে তারা দুঃখ বা কষ্ট পেলে তা প্রকাশ করার স্বাভাবিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং তাদের কষ্টগুলো মনের মধ্যে জমিয়ে রাখে। যা ভবিষ্যতে তাদের মানসিক বিকাশে বাধা প্রদান করবে।
আসলে, একজন মানুষ হিসেবে সব ধরনের আবেগ প্রকাশ করার অধিকার সবার আছে। আমাদের সন্তানকে শেখানো উচিত যে কান্না কোনো দুর্বলতা নয়, এটিও হাসির মতোই একটি স্বাভাবিক আবেগ। তবে কান্না যেন “অতিরিক্ত আর্তনাদ কিংবা আহাজারি” না হয় সেটাও জানিয়ে দিবেন।
৩. রাগ বা কষ্টের প্রতি অসহিষ্ণুতা:
সন্তান যখন রাগে বা কষ্টে থাকে, তখন আমরা প্রায়ই তাদের বলি “এত রাগ করা ভালো না” অথবা “এসব নাটক বন্ধ করো।” এর মাধ্যমে আমরা কিন্তু তাদের রাগকে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অন্যায়’ বলে চিহ্নিত করি।
ধরুন, আপনার সন্তান হয়তো স্কুলের কোনো বন্ধুর সাথে (আপনার সন্তানের খেলনা ভেঙ্গে ফেলার কারণে) ঝগড়া করে খুব রেগে আছে। আপনি যদি তাকে বলেন, “প্রতিদিন এসব ঝগড়া ভালো লাগে না, শান্ত থাকতে পারো না?” তবে সে মনে করবে তার রাগ করাটা ভুল। সে তার আবেগকে বৈধতা বা স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো অনুভব পায় না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাগ বা কষ্টও জীবনের অংশ। আমাদের উচিত তাদের রাগের কারণটি বুঝতে চাওয়া। এছাড়া রাগের ক্ষতি, কিভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তাও শেখাতে পারি। এতে সে বুঝবে তার আবেগগুলো গুরুত্বহীন নয়। তবে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
৪. বাস্তবতাকে অস্বীকার:
টক্সিক পজিটিভিটির আরেকটা বড় লক্ষণ হলো বাচ্চার বাস্তব অভিজ্ঞতা বা আবেগকে অস্বীকার করা। আমরা হয়তো ভাবি, তাদের বলে দিলাম “সব ঠিক হয়ে যাবে” তাহলেই তারা ভালো বোধ করবে। কিন্তু এটা তাদের বর্তমান আবেগকে অনেক ক্ষেত্রেই অবমূল্যায়ন করে।
ধরুন, আপনার বাচ্চা স্কুলে বন্ধুর কাছে অপমানিত হয়ে কষ্ট পাচ্ছে। আপনি যদি বলেন, “দূর বোকা, ওসব ভুলে যাও, এটা কোনো ব্যাপার না”, তাহলে তার কষ্টটা অগ্রাহ্য হয়। তার অনুভূতির সঠিক মূল্যায়ন সে পেল না। সঠিকভাবে তাদের সমস্যাকে বুঝে, সঠিকভাবে কথা বলে সমাধান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের শিশুরা শুধু হাসতে বা খুশি হতে জন্ম নেয়নি। তারা আমাদের মতোই মানুষ। তাদেরও মন খারাপ, রাগ, কষ্ট বা হতাশা থাকতে পারে। তাদের এই আবেগগুলোকে সম্মান করা এবং সেগুলো প্রকাশ করার সুযোগ দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এতেই তারা সুস্থ মানসিকতা নিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে।
এই পর্বে আমি টক্সিক পজিটিভি প্যারেন্টিং এর ক্ষতিকর প্রভাব ও কোন সমাধান নিয়ে আলোচনা করি নি, পরবর্তী পর্বে সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত জানাবো ইন শা আল্লাহ।
বি:দ্র: মনে রাখবেন, প্রত্যেক শিশুর প্যারেন্টিং ভিন্ন। তা নির্ভর করে পরিবার ও পরিবেশের উপর। আপনারা বুঝে-শুনে আপনাদের শিশুর উপযোগী কাঠামো এপ্লাই করবেন। কারণ আপনার সন্তান ও আপনার সন্তানের বেড়ে উঠার পরিবেশ আপনিই সবচেয়ে বেশি ভালো জানেন। আমি পারি শুধু আপনাদের সহোযোগিতা করতে। জাযাকাল্লাহু খইর।
শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু….
