আমেরিকার “লাইব্রেরী অব কংগ্রেস” ও ব্রিটেনের “দ্য ব্রিটিশ লাইব্রেরি” কে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী ৷ মধ্যযুগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী ছিলো বাগদাদের “বাইতুল হিকমাহ” বা “হাউস অব উইজডম”।
হালকু খান কর্তৃক বাগদাদ আক্রমণের সময় বাইতুল হিকমাহ ধ্বংস হয়ে যায় । সে সময় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী দজলা (টাইগ্রিস) নদীতে অসংখ্য বই ফেলে দেয়ার ফলে নদীর পানি বইয়ের কালির কারণে কালো হয়ে গিয়েছিল ৷ স্পেন, তুরষ্ক, ভারতের মুসলিম শাসকদের নিজস্ব লাইব্রেরী ছিলো ৷ লাইব্রেরী সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়ে সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যু হয়েছিলো ৷
মুসলিম শাসন অবসানের পর, ইতিহাসে তাদের অনেক বিষয় বর্ণণা করা হলেও, কোন এক অজানা কারণে লাইব্রেরী ও বইয়ের ব্যাপারে তেমন একটা আলোচনা হয় না বললেই চলে ৷ ফলে সেসব লাইব্রেরীর বইয়ের ব্যাপারে আমরাও অজ্ঞাত ৷ আরব্য উপন্যাসে এক বই প্রেমিক হেকিম বইয়ের পাতায় পাতায় বিষ মেখে নিজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন ৷ হয়তো সে রকম কোন আশংকা থেকেই বইগুলো নিয়ে বিজয়ীরা নাড়াচাড়া করতে সাহস করেনি, অথবা বইগুলো কেউ চুরি করেছে ৷ বইয়ের বসুমতিতে অনেক ভদ্রলোকই চোর ৷
মার্ক টোয়েনের লাইব্রেরী নাকি গড়ে উঠেছিলো বন্ধুদের বই চুরি করে! ব্রিটেনের বিখ্যাত বই চোর ঊইলিয়াম জোকস (ছদ্মনাম টম রেইডার) ব্রিটেনের প্রায় সব নামি দামি লাইব্রেরি থেকেই বই চুরি করেছিলো । তার চুরি করা বইয়ের মূল্য প্রায় ১৫০ মিলিয়ন পাঊন্ড । মার্কিন বই চোর স্টেফান ব্লুমবার্গ তিরিশ বছর ধরে বই চুরি করে প্রায় তেইশ হাজার বই-এর মালিক হয়েছিলো । তার চুরি করা বইয়ের সর্বমোট মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় পাঁচ মিলিয়ন ডলার ৷ ভদ্রলোকের দেশ জাপানও রেহাই পায়নি বই চোরের হাত থেকে ৷ জাপানের মিতসুকা সুইজু প্রায় পনেরোটিরও বেশি লাইব্রেরি থেকে প্রায় ১,১৭০ টি বই চুরি করেছিলো । চিলিয়ান কবি ও কথাসাহিত্যিক রবার্তো বোলানি তাঁর জীবনে বইয়ের দোকান থেকে প্রচুর বই চুরি করেছেন ৷
বই চোরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যই হয়তো “চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা” ঘোষণা করা হয়েছে ৷ আমাদের বর্তমান বিদ্যার্থীরা অনেক সৎ, টাকা দিয়ে বই কিনে ৷ কোন বইটা ভালো হবে? কোন বইটা কিনলে কিছু শেখা যাবে? এসব নিয়ে তারা প্রায় সময়েই নানা জনের কাছে পরামর্শ খোঁজে ৷ কর্মজীবি মানুষদের জন্য বই বিনোদন এবং জ্ঞানার্জনের অন্যতম একটা মাধ্যম ৷ কিন্তু স্কুল-কলেজের বিদ্যার্থীরা যখন পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বইয়ের তালাশ করে তখন জানতে ইচ্ছে করে, “অত বই পড়িয়া কি হইবে?”
পিএইচডির জন্য আহমেদ ছফা পরামর্শক হিসেবে পছন্দ করেছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সাহেবকে ৷ তিনি যখন অধ্যাপক সাহেবের সাথে তাঁর গবেষণার বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতে গিয়েছিলেন, অধ্যাপক সাহেব তখনই তাঁর হাতে কোন না কোন বই ধরিয়ে দিয়েছিলেন ৷ বই পড়তে পড়তে তাঁর আর পিএইচডি করা হয়নি ৷ দেশের অনেক বানরের গলায় ডক্টরেট ডিগ্রী ঝুললেও আহমেদ ছফাকে বাপের দেওয়া নাম নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ৷
বেগম রোকেয়া যেকালে “পাশ করা বিদ্যাকে আমরা শিক্ষা বলি না” বলেছিলেন সেকালে কেউ থার্ড ডিভিশনে ম্যাট্টিক পাশ করলেও আশেপাশের কয়েক গ্রামের লোক দেখতে আসতো ৷ এখন পিএইচডি করলেও কেউ খোঁজ নেয় না ৷ “সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত” এসব নীতিবাক্য কেবল পাঠ্য বইয়ে শোভা পায় ৷ সেদিনও কবি আল মাহমুদ এসএসসি পাশ করে সাংবাদিকতা করেছেন ৷ আর এখন সাংবাদিকতার নাম নিলেও গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট থাকতে হবে ৷ বর্তমানে “পাশ করা বিদ্যাই শিক্ষা” ৷ তাই আগে যে বই পড়লে সার্টিফিকেট হাসিল হবে বিদ্যার্থীদের সে বইয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিৎ ৷ সার্টিফিকেট হাসিলের পরেও যে আউট বই পড়ার সুযোগ হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই ৷
ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ একবার লাইব্রেরীতে বই পড়ছিলেন ৷ লাইব্রেরীয়ান তাঁকে লক্ষ্য না করে লাইব্রেরী বন্ধ করে চলে যায়৷ পরদিন লাইব্রেরী খোলামাত্র তিনি লাইব্রেরীয়ানের চোখে পড়েন ৷ লাইব্রেরীয়ান তো হতবাক! ডঃ শহীদুল্লাহকে তিনি বললেন, আপনি পুরো রাতদিন লাইব্রেরীতে বন্দি ছিলেন? ডঃ শহীদুল্লাহ বই থেকে মুখ তুলে বললেন, “না তো, আমি বই পড়ছিলাম ৷” বর্তমান সময়ে বই পড়ুয়া কেউ যদি এমন নিরূদ্দেশ থাকে তাহলে বৌ এর প্রথম প্রশ্ন হবে, সারা রাইত কাটাইছো কার সাথে?
বই আর বৌ পরস্পর সতীন ৷ ঘরে যদি গ্যাস না থাকে, তখন বৌ হয়তো বইয়ের পাতা ছিঁড়ে রান্নার কাজ শুরু করে দিবে ৷ দুই বধূর কোলাহল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতেই হয়তো অনেক বিখ্যাত বই পড়ুয়া সারা জীবন চির কুমার রয়ে গেছেন ৷ আবার অনেক বই পড়ুয়া বৌ পাগল হয়েছেন ৷ বইয়ের সাথে যত খুশি প্রেম করা যায় ব্যাচেলর জীবনে ৷ বই পড়ুয়াদের বিবাহিত জীবনে বই আর বৌয়ের যুদ্ধ লেগেই থাকে ৷ এই যুদ্ধে বৌ সব সময় বিজয়ী থকে ৷ খরাজ মুখুজ্জে বলেছেন, “বই এর চ্যাপ্টারগুলোর শুরুতেই ‘মুখবন্ধ’ থাকলেও বৌ এর কোন চ্যাপ্টারেই ‘মুখবন্ধ’ বলে কিছু নেই ৷”
বই কেনার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, “বই কিনে কেউ কখনো দেউলে হয় নি ৷” বই যে কাউকে দেউলিয়া বানায় না, এ সত্য আমরা আবিষ্কার করেছিলাম ফেরিওয়ালার কাছে ৷ বছর শেষে ফেরিওয়ালাকে পুরাতন বই দিয়ে দু’হাত ভরে কটকটি পাওয়ার যে সুখানুভূতি অনির্বচনীয় ৷ সৈয়দ মুজতবা আলী যে কথাটি বলেননি,”বই লিখে কেউ কোন দিন ধনী হয়নি ৷” ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররূখ আহমেদ, আল মাহমুদ, হুমায়ুন আহমেদ সহ প্রত্যেক লেখকের বিকল্প পেশা ছিলো ৷
পৃথিবীর সব গল্প একই বৃত্তের মধ্যে একইভাবে আবর্তিত হতে থাকে ৷ লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, সোনালী-ত্রিস্তান, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস, শ্রাবণ মেঘের দিন সহ প্রায় বিখ্যাত সব গল্পের সমাপ্তি হয়েছে মৃত্যু দিয়ে ৷ কোন জনপদ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে থাকে স্রষ্টা তখন কোন মহাপুরুষ প্রেরণ করে জনপদের লোকদের আলোর পথে নিয়ে আসেন অথবা সে জনপদকে ধ্বংস করে দেন ৷ কোন একজন বীর যোদ্ধা সম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন, উত্তরসুরীদের কেউ কেউ সেটিকে বিস্তৃত করে আবার কোন এক সময় উত্তরসুরিদের অযোগ্যতায় সেটি শেষ হয়ে যায় ৷ কিছু লোক সংঘবদ্ধ হয়ে জাতিকে মুক্ত করতে লড়াই করে, কিছু দিন পর স্বজাতির কাছেই তারা বন্দি হয় ৷
লেখালেখিতে নতুনত্বের কিছু নেই ৷ নতুনত্ব হলো লেখার ভঙ্গিতে ৷ কখনো লেখক পাঠক আবিষ্কার করেন, কখনো পাঠক লেখক আবিষ্কার করেন ৷ কে কাকে আবিষ্কার করলো সেটা কোন বিষয় নয়, কিন্তু এর মাঝে একটা লেখক এবং পাঠক উভয়ের রুচিবোধ প্রকাশ পায় ৷ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের রুচিবোধ বিভিন্ন রকম ৷ কারো কাছে ভর্তা ভালো তো, কারো কাছে বিরিয়ানী ৷ কারো কাছে শাক ভালো তো, কারো কাছে মাছ ৷ রুচির ভিন্নতা থাকা সমস্যা নয় ৷ সমস্যা হলো একজন যা খেতে পছন্দ করে অন্যদেরও তা খেতে জোর করা বা অন্যদের খাওয়ার প্রলোভন দেখানো ৷
যারা জোর করে খাওয়াতে চায়, বা যারা খাওয়ার প্রলোভন দেখায় মিডিয়াগুলো এখন তাদের নিয়েই ব্যস্ত ৷ ফলে যাদের বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা যাবে তারা রয়ে যাচ্ছেন আড়ালে ৷ অনেক বছর আগে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন বলেছিলেন, “এখন তো চারিদিকে রুচির দুর্ভিক্ষ! একটা স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির দুর্ভিক্ষ! এই দুর্ভিক্ষের কোন ছবি হয় না ।” সেই দুর্ভিক্ষ লাঘব হয়েছে, না প্রশমিত হচ্ছে সেটা জনগণই ভালো বলতে পারবে৷
