সমাজ এবং মনোবিজ্ঞানশাস্ত্রে গুজব, পরনিন্দা বা পরচর্চার ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা রয়েছে। জনসাধারণের সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়, ঘটনা বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত কোনো বর্ণনা বা গল্পকে গুজব বলা হয়েছে। অতীতে যখন প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল না তখন মুখে মুখে এটা প্রচার হতো কিন্তু এখন প্রযুক্তির কারণে লিখিতভাবেও প্রচারিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
একসময় গুজব ছড়ানোতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত ভিক্ষুকরা, একটু বেশি ভিক্ষা পাওয়ার আশায় এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ছুটে ছুটে বিভিন্ন উদ্ভট কল্পকাহিনি ছড়িয়ে বেড়াত।
সরলমনা মানুষগুলোও তাদের কল্পকাহিনিগুলো আগ্রহভরে শুনত এবং নিজেদের মধ্যে চর্চা করত, এভাবে সমাজে বিভিন্ন গুজব ডালপালা মেলার সুযোগ পেত। এখন অনলাইনের যুগ। অনলাইনে জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য কেউ কেউ মিথ্যা ও গুজব ছড়ানোর পথ বেছে নেয়, উদ্ভট কল্পকাহিনি ছড়িয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লাইক-শেয়ার ও নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করে।
অফিস-আদালত, বাজারঘাট, পাড়া-মহল্লায় গুজবের চর্চা রয়েছে। প্রতিপক্ষকে বিপাকে ফেলতে এক শ্রেণির মানুষের কাছে গুজব একটি শক্তিশালী অস্ত্র। অন্যকে বিপদে ফেলতে তার ওপর কোনো অপবাদ দেওয়া কিংবা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো মারাত্মক গুনাহের কাজ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ বা পাপ অর্জন করে, অতঃপর কোনো নির্দোষ ব্যক্তির ওপর তা আরোপ করে, তাহলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের বোঝা বহন করল। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১২)
মিথ্যা বলা বা গুজব ছড়ানো মুনাফিকের আলামত। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি : ১. যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, ৩. আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে। ’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩)
তাই কেউ কোনো সংবাদ নিয়ে এলেই যাচাই-বাছাই করা ছাড়া তা বিশ্বাস করা অনুচিত। তা প্রচার করা তো বহু দূরের বিষয়। পবিত্র কোরআনে ভুল তথ্য অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য নিয়ে অধিক চর্চাই গুজবের জন্ম দেয়, যা থেকে সমাজে গজব নেমে আসে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর, এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। ’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)
তাই কোনো চটকদার খবর চোখে পড়লেই যাচাই-বাছাই ছাড়া তা নিয়ে মাতামাতি করা উচিত নয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘সব শোনা কথা (যাচাই-বাছাই করা ছাড়া) বলা কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯২)
আবার গুজব ছড়ানোর কারণে এতে বিভ্রান্ত হয়ে যদি সমাজে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, কোনো গুনাহের প্রচলন হয়ে যায়, এর দায়ভারও যিনি গুজব ছড়িয়েছেন তার ওপর এসে বর্তাবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৎপথের দিকে ডাকবে সে তার অনুসারীর সমান সওয়াব পাবে; অথচ অনুসরণকারীর সওয়াব কমানো হবে না। অপরদিকে যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে ডাকবে সে তার অনুসারীর সমান পাপে জর্জরিত হবে; তার অনুসারীর পাপ মোটেও কমানো হবে না। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬০৯)
মহান আল্লাহ সবাইকে এই ঘৃণ্য কাজ থেকে বিরত রাখুন।
