নাশকতা ও আইন হাতে তুলে নিলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কঠোরভাবে দমন করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আনসার সদস্য। জ্বালাও-পোড়াও বা রাষ্ট্রের সম্পদ ধ্বংস কিংবা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করলে কোনো ছাড় না দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থার সদস্যদের বুধবার রাত থেকে মোতায়েন করা হয়েছে। গত কয়েক দিনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সারা দেশের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ‘লকডাউন’ কর্মসূচির দিনও দেশে গণপরিবহন চলবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশের সব দোকান ও বিপণিবিতান খোলা থাকবে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিটে রাজধানীর ধোলাইপাড়ে একটি বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আগুন কীভাবে লেগেছে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, পুলিশ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করলেও কার্যত মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব পুরোপুরি লক্ষ করা যায়নি। গত কয়েক দিনে দুর্বৃত্তরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যানবাহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়েছে। এছাড়া, মুখোশ ও হেলমেট পরিধানকারী আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নির্বিচারে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক সৃষ্টির ব্যর্থ চেষ্টা করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ হতে যাচ্ছে ১৩ নভেম্বর। এ দিনকে ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঢাকায় ‘লকডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়সহ প্রধান প্রধান সরকারি অফিসগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনী সদস্যরাও মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীজুড়ে বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ১ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ১৭টি ককটেল বিস্ফোরণ ও গত দুই দিনে ৯টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা দায়ের ও ৫০ জন গ্রেফতার করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, গত সোমবার দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ি এলাকায় আলম পরিবহন নামে একটি বাসে আগুনের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় এক হেলপারের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী ও সোনারগাঁও জনপদ, ধানমন্ডি সায়েন্সল্যাব, মিরপুর, বাড্ডা ও বসুন্ধরার ১০০ ফিট এলাকায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। যদিও ঢাকার এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এর আগে বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে তিনজন আহত হন। মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে একইভাবে ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই দিন ভোরে মোহাম্মদপুরে সরকারের একজন উপদেষ্টার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এছাড়া মঙ্গলবার মধ্যরাতে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের গেটে দুটি পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করেছে দুর্বৃত্তরা।
ডিএমপি জানায়, রাজধানীতে নাশকতার অভিযোগে গত তিন দিনে ১০০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে টাকার বিনিময়ে ঢাকার নাশকতার করার চেষ্টা করছে দাবি পুলিশের।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী সাংবাদিকদের বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থেকে চোরাগোপ্তা মিছিল ও নাশকতার অপচেষ্টা করছে। অক্টোবর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ১৪টি ঝটিকা মিছিল হয়েছে এবং ৫৫২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের বেশির ভাগই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে। টাকার বিনিময়ে তারা মিছিলে অংশ নেয়, তারপর ঢাকার বাইরে চলে যায়। এসব মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। অল্পবয়সী তরুণদের হেলমেট ও মাস্ক পরিয়ে ককটেল বিস্ফোরণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নগরবাসীর ভূমিকার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার সফল অভ্যুত্থানে আমরা স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছি। নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের একইভাবে সবাই মিলে প্রতিহত করতে হবে। নগরবাসীই আমাদের শক্তি। তাদের সঙ্গে করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ যেকোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সক্ষম। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। অতএব নাশকতাকারীদের বিচ্ছিন্ন কর্মকা-ে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
কঠোর অবস্থানে ডিবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় নজরদারি : রাজধানীতে সাম্প্রতিক সহিংসতা, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ানো ও উসকানিমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে। গত ২৪ ঘণ্টায় আমরা ৪৪ জনকে গ্রেফতার করেছি। কিছু ব্যক্তি রিকশাচালক বা সাধারণ পথচারীদের অর্থ দিয়ে স্লোগান দিতে বাধ্য করে ভিডিও তৈরি করছে। এসব ভিডিও পরে অনলাইনে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। যারা বিদেশে বসে এসব উসকানি দিচ্ছে, তাদেরও শনাক্ত করা হচ্ছে। নাশকতা ঠেকাতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, অপরিচিত কাউকে আশ্রয় দেয়ার আগে তার পরিচয় নিশ্চিত করুন। কোনো যানবাহন অরক্ষিত রাখবেন না। ঢাকাবাসীই আমাদের শক্তি।
বিশেষ নজর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে : পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছাড়াও রাজধানীর বনানী, উত্তরা, বাড্ডা, পল্টন ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবে, বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ সম্পূর্ণ ধানমন্ডি এলাকায়। ধানমন্ডি থানা সূত্রে জানা যায়, বিশেষ করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতার ঘটনা যেন না ঘটতে পারে, সে জন্য গত দুই দিন ধরেই সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড দেয়া হয়েছে। সন্দেহজনক যান চলাচল দেখলে পুলিশ ব্যারিকেডে আটকে তল্লাশি করছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও থানায় বাড়তি নজর : ঢাকার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ডিএমপি। এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রতিটি থানার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাশকতার শঙ্কায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে শুরু করে প্রতিটি থানার সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৮ থেকে ১০ জন করে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
রমনা মডেল থানার ওসি গোলাম ফারুক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় গত কয়েক দিন ধরে রমনা থানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শুধু থানায় নয়, রমনা থানার অধীনে যেসব এলাকা আছে, সেসব এলাকায়ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মনসুর বলেন, থানার সামনে বাড়তি পুলিশ সদস্য মোতায়েনের বিষয়টি স্বাভাবিক নিরাপত্তা কার্যক্রম। এছাড়া, শাহবাগ থানা এলাকায় প্রায়ই দাবি-দাওয়া নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংঘটিত হয়। এসব বিষয় এবং বর্তমান পরিস্থিতি মাথায় রেখে বাড়তি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবে, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
সারাদেশে বিজিবি মোতায়েন : নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা ও আশপাশের জেলায় ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার বিজিবি সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীসহ ঢাকায় ১২ প্লাটুন ও আশপাশের জেলায় দুই প্লাটুনসহ মোট ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
