রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বিভিন্ন সাহাবির অবস্থা জানতে কখনো কখনো রাতের বেলা বের হতেন। বের হয়ে তিনি তাঁদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। একবার তিনি তাহাজ্জুদের সময় বের হন। বের হয়ে তিনি আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে মৃদু কণ্ঠে তাহাজ্জুদের তিলাওয়াত করতে দেখেন।
এরপর তিনি ওমর (রা.)-এর পাশ দিয়ে যান এবং তাঁকে উচ্চৈঃস্বরে তিলাওয়াত করতে শোনেন। তাঁরা উভয়ে নবী (সা.)-এর কাছে একত্র হলে নবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু বকর! আমি তোমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, তুমি নিঃশব্দে কিরাত পড়ছিলে। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তাঁকেই শুনাচ্ছিলাম যাঁর সঙ্গে চুপিসারে কথা বলছিলাম। অতঃপর তিনি ওমর (রা.)-কে বললেন, আমি তোমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, তুমি সশব্দে কিরাত পড়ছিলে। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগাতে এবং শায়তান বিতাড়িত করতে চেয়েছিলাম। হাসান বাসরি (রহ.)-এর বর্ণনায় আছে, নবী (সা.) বললেন, হে আবু বকর! তুমি একটু শব্দ করে কিরাত পড়বে এবং ওমরকে বললেন, তুমি একটু নিচু স্বরে কিরাত পড়বে। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩২৯)
একটু লক্ষ করুন, উভয়ের কথাই আপন আপন স্থানে সঠিক। আবু বকর (রা.)-এর কথাও সঠিক যে যাঁকে শোনাতে চেয়েছি তাঁকে শুনিয়ে দিয়েছি। সুতরাং অন্য কাউকে শোনানোর প্রয়োজন কী? ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কথাও সঠিক যে ঘুমন্ত লোকদের জাগানো এবং শয়তানকে তাড়ানো আমার উচ্চৈঃস্বরে তিলাওয়াতের উদ্দেশ্য। তবু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের উভয়কে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেন। কারণ হলো, ইবাদতের ব্যাপারে নিজের বুঝ অনুযায়ী কোনো পথ বা পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। ইবাদতের ক্ষেত্রে পদ্ধতি নির্ধারণের ইচ্ছাধিকার শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। মহান আল্লাহ তাঁর রাসুলের মাধ্যমে ইবাদতের যে পথ ও পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন তাতেই নুর ও বরকত, উপকার ও মর্যাদা।
উল্লিখিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, যারা ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় উচ্চ মর্যাদা অর্জন করতে চায় তাদের উচিত ইবাদতে সুন্নতের অনুসরণ করা। শুধু অনুসরণই যথেষ্ট নয়, পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ আবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে দ্বিনের রুহ বা আত্মা এ কথার মধ্যে নিহিত যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) কর্তৃক নির্দেশিত পথেই ইবাদত করতে হবে। নিজে থেকে কোনো কিছু উদ্ভাবন করা যাবে না। কেউ তা করলে সেটা বিভ্রান্তি হিসেবেই গণ্য হবে। তার ইবাদতগুলো আল্লাহর নিঃশর্ত আনুগত্য হিসেবেও গণ্য হবে না।
মাওলানা মাসিহুল্লাহ খান (রহ.) বলেন, ভাই! নিজের আগ্রহ পূর্ণ করর নাম দ্বিন নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর অনুসরণ করাই দ্বিন। এই কাজটা করতে খুব ইচ্ছা করে, তাই এখন সেটাই করতে হবে—এর নাম দ্বিন নয়। মনে করুন, ইলমে দ্বিন শেখা বা আলেম হওয়ার আগ্রহ আপনার মধ্যে জন্মেছে। অথচ ঘরে পিতা অসুস্থ, মা অসুস্থ। এমন কেউ নেই যে তাঁদের খোঁজখবর নেবে, তাঁদের সেবা-যত্ন করবে। এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আপনি যদি মাদরাসায় চলে যান, তবে তা দ্বিনের কাজ হবে না। মা-বাবার সেবা করাই দ্বিনের কাজ বলে বিবেচিত হবে। অথবা কারো মুফতি হওয়ার আগ্রহ জাগল, কিন্তু তার মা-বাবা তাতে কোনোভাবেই রাজি নন, এমন সময় মা-বাবার অমতে ইফতা পড়া তার জন্য দ্বিনি কাজ নয়, বরং সে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করছে। অথবা কারো তাবলিগে যাওয়ার ইচ্ছা হলো, কিন্তু ঘরে তার স্ত্রী আছে, ছোট ছোট সন্তান আছে। তাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। তবে স্ত্রী-সন্তান ফেলে তাবলিগে যাওয়া দ্বিনি কাজ হবে না। এটা নিজের মনোবাসনা চরিতার্থ করা মাত্র। কেননা তাবলিগের চেয়ে স্ত্রী-সন্তানের হক বেশি অগ্রগামী। নিজ চাহিদা পূরণ করার নাম দ্বিন নয়। কারো আগ্রহ জন্মায় জিহাদের প্রতি, কারো তাবলিগের প্রতি, কারো মুফতি হওয়ার প্রতি—এমন আগ্রহ ও খায়েশ পূরণ করতে গিয়ে তার ওপর শরিয়ত কর্তৃক আরোপিত সব হক বেমালুম ভুলে যায়। সে বুঝতেও চায় না যে এসব হকের দাবি কী।
কেউ আমার কথার ভুল ব্যাখ্যা করবেন না, ভুল অর্থও গ্রহণ করবেন না। আমি তাবলিগ, জিহাদ বা মাদরাসায় পড়ার বিরোধী নই। আমি অবশ্যই বলি, এসব কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের বড় মাধ্যম। কিন্তু মানুষের ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলোও বিবেচনা করা আবশ্যক। এটাও ভেবে দেখা আবশ্যক যে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন কাজটা করা বেশি দরকার। যদি তা বিবেচনা না করে শুধু নিজের চাহিদা অনুসারে কোনো কাজ করা হয়, কোনো ইবাদতকে নিজের খায়েশ পূরণের হাতিয়ার বানায়, তবে তা আর দ্বিনের কাজ থাকে না।
আমার পিতা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) একটি উপমা দিতেন। তা হলো, এক নববধূকে সাজানো হলো এবং সবাই তাকে দেখে প্রশংসা করছিল, কিন্তু সে কোনো আনন্দই প্রকাশ করছিল না। তখন সখিরা তাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার এত প্রশংসা করা হচ্ছে, অথচ তোমার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই কেন? উত্তরে সে বলে, অন্যের প্রশংসায় আমার কী যায় আসে। যার জন্য আমাকে সাজানো হচ্ছে তার কাছে যদি সুন্দর লাগে, তবেই আমি খুশি হব। আর তখনই না এত আয়োজন সার্থক হবে। ইবাদত-বন্দেগির বিষয়গুলোও অনুরূপ। ইবাদতের উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। এখন ইবাদত যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী না হয়, তবে তিনি কিভাবে সন্তুষ্ট হবেন এবং তার উপকারই বা কী?
