আলোচ্য সুরায় আল্লাহ তাআলা কর্তৃক মুহাম্মদ (সা.)-কে দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও নিয়ামতের বর্ণনা ব্যক্ত করা হয়েছে। সব ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করার এবং শত্রুদের নির্মূল হয়ে ইসলাম বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।
সুরা কাওসারের শানে নুজুল
এ সুরার শানে নুজুল সম্পর্কে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মদিনার সর্দার কাব ইবনে আশরাফ মক্কায় পদার্পণ করলে কুরাইশরা তাকে বলল, আপনি কি আমাদের সম্প্রদায়ের সেই শিকড় কাটা ও নির্বংশ লোকটিকে দেখেছেন, যে নিজেকে আমাদের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মনে করে? অথচ আমরাই হাজিদের পুরনো খাদেম।
আমরাই তাদের পানি পান করিয়ে থাকি এবং আমরাই নেতৃস্থানীয় লোক। তখন তাদের বাজে মন্তব্যের প্রতিবাদে আল্লাহ তাআলা ‘ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার’ আয়াত অবতীর্ণ করেন। মূলত রাসুল (সা.)-এর পুত্ররা শৈশবে ইন্তেকাল করেন। এ কারণে কাফিররা তাকে আবতার অর্থাৎ শিকড়হীন ইত্যাদি বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত।
বিশেষ করে যখন পুত্র কাসেমের ইন্তেকাল হলো, তখন আস ইবনে ওয়ায়েল বলল, মুহাম্মদ নির্বংশ হয়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা সুরা কাউসার নাজিল করেন। এর মাধ্যমে রাসুল (সা.)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। (তাফসিরে জালালাইন : ৭/৫৯১)
শ্রেষ্ঠ নিয়ামত হাউজে কাওসার
আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে হাউজে কাওসার উপহার দিয়েছেন।
এটা শ্রেষ্ঠ একটি উপহার। আবু উবাইদা (রহ.) বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে আল্লাহর বাণী ‘ইন্না আ‘তাইনা কাল কাওসার’-এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি । তিনি বলেন, কাওসার এমন একটি নহর, যা তোমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রদান করা হয়েছে। এর দুটি পার আছে। উভয় পারে বিছানো আছে খোলা মোতি।
এর পাত্রের সংখ্যা তারকারাজির অনুরূপ। (বুখারি, হাদিস : ৪৬০৫)
শিরক ও বিদআতমুক্ত কোরআন-সুন্নাহর প্রকৃত অনুসারীরা কিয়ামতের ময়দানে হাউজে কাওসারের পানি পান করার সৌভাগ্য লাভ করবে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, একদিন রাসুল (সা.) আমাদের মধ্যে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর তন্দ্রার ভাব হলো। এরপর তিনি মুচকি হেসে মাথা ওঠালেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার হাসির কারণ কী? তিনি বলেন, এইমাত্র আমার ওপর একটি সুরা নাজিল হয়েছে। এই বলে তিনি সুরা কাওসার পাঠ করলেন। এরপর বলেন, তোমরা কি জানো কাউসার কী? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বলেন, সেটা হলো একটি নহর (ঝরনা), আল্লাহ তাআলা আমাকে যার ওয়াদা করেছেন। সেখানে বহু কল্যাণ আছে। সেটি একটি জলাশয়। কিয়ামতের দিন আমার উম্মত (পানি পানের জন্য) সেখানে আসবে। তার গ্লাসের সংখ্যা হবে আকাশের তারকার সমান। তারপর তাদের মধ্য থেকে একজন বান্দাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তখন আমি বলব, পরওয়ারদিগার, সে তো আমার উম্মত। বলা হবে, আপনার জানা নেই যে আপনার পরে এরা কী বিদআত উদ্ভাবন করেছিল? (মুসলিম, হাদিস : ৭৭৯)
সুরা কাওসার থেকে শিক্ষা
মক্কার কাফিররা মনে করেছিল, রাসুল (সা.)-এর সন্তানরা ইন্তেকাল করায় বংশপ্রদীপ নিভে যাবে। তাঁর ধর্ম-শরিয়ত দীর্ঘায়িত হবে না। সুরা কাওসারের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদের ভ্রান্ত চিন্তাধারার জবাব দিয়েছেন। তিনি রাসুল (সা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, নিশ্চয়ই তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই তো নির্বংশ। আল্লাহর ওয়াদা প্রতিফলিত হয়েছে। কাফিররা বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও লাঞ্ছিত, অপমানিত ও অপদস্থ হয়েছে। তাদের নাম-নিশানা মুছে গেছে। আর রাসুল (সা.)-এর বংশধারা পৃথিবীর বুকে টিকে আছে। যুগে যুগে মানুষ আল্লাহর বিধান, নবীর সুন্নাহ মেনে চলছে। পৃথিবীতে এখনো সমুজ্জ্বল তাঁর নাম ও মর্যাদা।
