পাড়া-পড়শি পরের কথা-ঘরের লোকেরাই বলছেন যুদ্ধে হেরে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সমমনা উগ্র হিন্দুত্ববাদী শিবসেনা থেকে শুরু করে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, শচিন পাইলট-সবার মুখেই এই স্বীকারোক্তি : ভারত হেরে গেছে। টুইট-টক শো-বিবৃতিতে তুলাধনা করছেন মোদিকে। ১০ মে পাকিস্তানের হামলার পর পালটা হামলায় না গিয়ে থিতু হয়ে বসে থাকা; তারপর মোড়ল ধরে যুদ্ধবিরতিতে যাওয়া নিয়ে রীতিমতো গৃহদাহ শুরু হয়েছে দেশটির সামাজিক গণমাধ্যমে। পরাজয়ের ক্ষুব্ধ নেটিজেনরা যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছে। ছবক দিচ্ছেন দেশটির শিক্ষাবিদরাও। ভারতজুড়ে চলমান
এই নিন্দাঝড়ের মধ্যেই সোমবার রাত ৮টায় বড় গলায় জাতিকে ভারতের ‘বিজয় বার্তা’ শোনালেন মোদি। বললেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ এখনো শেষ হয়নি। মুখে বড় বড় এমন জয়ের বুলি থাকলেও তার ৫৬ ইঞ্চি ছাতির ভেতরে গুমড়ে মরা পরাজয়ের গ্লানিটা ঢাকতেই জাতির যুদ্ধশেষের পরও ‘জাতির উদ্দেশে ভাষণে’ দুদিন সময় লেগে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বিজয় ভাষণের দুদিন পার এদিন টানা ২২ মিনিট অগ্নিঝরা বক্তব্য দেন মোদি। বলেন, ইসলামাবাদের অনুরোধে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ভারতীয় সেনার হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে গোটাবিশ্বে আবেদন জানিয়েছে পাকিস্তান। ১০ মে পাকিস্তানের ডিজিএমও ভারতীয় ডিজিএমও-কে ফোন করে বলেন, ‘আর সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা এবং সেনা তৎপরতা দেখা যাবে না। এরপর ভারত বিষয়টি (যুদ্ধবিরতি) বিবেচনা করেছে। তিনি আরও বলেন, একজন নারীর সিঁদুর মুছে ফেলার মূল্য কতটা চড়া হতে পারে তা সশস্ত্র বাহিনীর পদক্ষেপে নিশ্চিত হয়েছে। পাকিস্তানের কোনো ধরনের পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল সহ্য করা হবে না বলেও হুমকি দিয়েছেন মোদি। তার এই বক্তব্যের পর পাকিস্তানের সিনেটর (ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের নেতা) ইরফান সিদ্দিকী জিও নিউজকে বলেন, মোদিকে দেখে মনে হচ্ছে ‘পরাজিত একজন মানুষ’। তার কথায় যেমন প্রাণ ছিল না, তেমনি তার অঙ্গভঙ্গিতেও। তবে ভারতের এ হার সম্পর্কে সবচেয়ে স্পষ্ট করে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বানন্দ ঝা। দ্যা ওয়্যারে লেখা নিবন্ধে বলেছেন, ‘যুদ্ধ এড়ানো গেছে, দুপক্ষই নিজ নিজ জনগণকে বলছে, তারা বিজয়ী। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময়ই তেতো। এক্ষেত্রে আদর্শিকভাবে পরাজিত হয়েছে ভারতের শাসক দল বিজেপি ও তাদের ভাবাদর্শ। শুধু যুদ্ধের মাঠে নয়, আদর্শের ময়দানেও হেরে গেছে তারা। কারণ ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব এজন্য নয় যে, দেশটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বরং এজন্য যে, ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।’
আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি : ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আর একটিও গুলি চলবে না। ড্রোন চালাবে না। কেউই একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বা শত্রুতামূলক পদক্ষেপ করবে না! এই প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রাখার বিষয় নিয়েই আলোচনা হলো ভারত এবং পাকিস্তানের ‘ডিরেক্টর অফ মিলিটারি অপারেশন (ডিজিএমও)’দের বৈঠকে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সোমবার প্রথমবার ডিজিএমও স্তরে বৈঠক হয় ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে। ভারতের ডিজিএমও লে. জেনারেল রাজীব ঘাই এবং পাকিস্তানের ডিজিএমও মেজর জেনারেল কাশিফ আবদুল্লাহ সোমবার বিকাল ৫টায় হটলাইনে কথা বলেন। দুপুর ১২টায় এই বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে যায়। দুদেশের কোনো পক্ষই তাদের মধ্যকার আলোচনা সম্পর্কে বিস্তারিত বলেননি। এর পরপরই অপারেশন ‘বুনইয়ানুন মারসুস’র আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজিআইএসপিআর) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী।
ভারতই যুদ্ধবিরতি চেয়েছে, পাকিস্তান নয় : ভারতই যুদ্ধবিরতি চেয়েছে, পাকিস্তান নয়-এমনটাই দাবি করেছে পাক ডিজি আইএসপিআর। এছাড়া পাকিস্তানের হাতে ভারতীয় পাইলট আটক হওয়ার গুজব বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। রোববার পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজিআইএসপিআর) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, পাকিস্তান কখনো যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করেনি। ‘৬ ও ৭ মে রাতে কাপুরুষোচিত ও নিষ্ঠুর হামলা চালানোর পর ভারত যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করে। পাকিস্তান পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, আমরা জবাব দেওয়ার পরই কথা বলব।’ ডিজিআইএসপিআর দাবি করেন, ‘১০ মে পালটা জবাব ও প্রতিশোধের পর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধে পাকিস্তান ভারতীয় অনুরোধে সাড়া দেয়।’
