Tuesday, August 25, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবর১৮০ দিনে বিএনপি: প্রতিশ্রুতি শূণ্য, ব্যর্থতায় পূর্ণ

১৮০ দিনে বিএনপি: প্রতিশ্রুতি শূণ্য, ব্যর্থতায় পূর্ণ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পলিসি ও রিসার্চ বিষয়ক উপকমিটি আজ ১৬ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মূল প্রতিবেদনের শিরোনাম — ‘বিএনপির শাসনের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরনো রাজনীতিতে ফেরা’, উপশিরোনাম ‘অর্থনীতি, প্রত্যাশা, জবাবদিহিতা’, এবং এর সময়কাল ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিস্তৃত।

দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে একই সঙ্গে একটি বুকলেট ও ১৬ পৃষ্ঠার ই-বুক প্রকাশিত হয়। এনসিপি আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এবং রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সালেহউদ্দিন সিফাত অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

প্রতিবেদনের ভূমিকায় নাহিদ ইসলাম মনে করিয়ে দেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকার নিজেই তিনটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছিল — দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। ভাষ্য অনুযায়ী, “বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন মূলত অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অপরিণামদর্শিতা ও অসততার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।” প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “প্রথম ১৮০ দিনে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে তারেক রহমানের কোনো ধরনের পরিকল্পনা নেই দেশকে পরিচালনা করার।”

ক্ষমতায় আসার পূর্বে বিএনপি জানিয়েছিল তারা ৩১ দফা এবং সংশোধনীর মাধ্যমে একটি “পুরোপুরি নতুন বাংলাদেশ” গড়ে তুলবে, কিন্তু ১৮০ দিন পরে এই প্রতিশ্রুতি “পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবির্ভাবে” পরিণত হয়েছে। এই ছয় মাস ক্ষমতাসীনদের আত্মপর্যালোচনার সময় ছিল, কিন্তু তার বদলে “পুরনো পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যাসিস্টদের পরিকল্পনা ও নীতি অনুযায়ী দেশকে পরিচালনা” করা হচ্ছে।

প্রকাশিত ১৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এনসিপি জানায় :

দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায় মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশের পাম্পগুলোতে ভয়াবহ পেট্রল ও ডিজেল সংকট দেখা দেয়। পাম্পগুলোর সামনে কয়েক মাইলজুড়ে গণপরিবহন, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এক লিটার তেলের জন্য অনেককে টানা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময়ে রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহকারী তরুণদের আয়ের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

এই সংকটের মধ্যেই সরকার জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ায়। প্রতি লিটারে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়। এর ফলে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।

জ্বালানি সংকটের দুই মাসে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, ওষুধ, হিমায়িত মৎস্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে গড়ে ২৪ শতাংশ উৎপাদন কমেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অথচ জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হোসেন মাহমুদ সংসদে দাঁড়িয়ে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেছেন।

এই সংকটের পেছনে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে তেল মজুত রাখার ঘটনাও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনিক অভিযানে উঠে এসেছে। কিন্তু সরকার এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা বা সক্ষমতা ছাড়াই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠী উচ্চ কমিশনের ভিত্তিতে তেল-গ্যাস সরবরাহ ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। তারা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পেট্রোবাংলার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাইকারি বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে জ্বালানি ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যাহত ও শ্রমিকের চাকরির ঝুঁকি :

গত দেড় মাস ধরে দেশে গ্যাস সংকট চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার মতো শহরেও দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা চুলা জ্বলছে না। লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে শিল্পকারখানায় এত দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস সরবরাহে এমন সংকট বিরল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। গৃহস্থালিতে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে রান্না করতে হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কাচ, ইস্পাত, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, সিরামিক ও বেকারি শিল্পে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, ময়মনসিংহ, ভালুকা, ত্রিশাল, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জে কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে গেছে। যেখানে উৎপাদনের জন্য অন্তত ৩-৪ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

এর ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ ব্যাহত হচ্ছে। ক্রেতারা ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দাবি করছেন এবং কেউ কেউ ক্রয়াদেশের একটি অংশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন। বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলো বর্তমানে সক্ষমতার তুলনায় গড়ে ৩০-৩৫ শতাংশ কম উৎপাদন করছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হবিগঞ্জে একই সঙ্গে ১৭১টি শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৪৫০টি ডাইং কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের চিত্রও একই। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এবং তাদের চাকরিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সামগ্রিকভাবে ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেখানে চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এই বিপুল ঘাটতি সত্ত্বেও সরকার এখন পর্যন্ত সুপরিকল্পিত কোনো সমাধান বা পরিকল্পনা হাজির করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বরং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়াকে ‘হঠকারিতা’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রতিবেদনের অভিযোগ, সরকারের ব্যর্থতা শুধু সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়; কিছু ক্ষেত্রে সংকটকে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করে তা থেকে লাভ করার আয়োজনও করা হচ্ছে। সংকটকে পুঁজি করে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে জ্বালানি কেনা এবং লুটপাটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ সংকট ও রেকর্ড লোডশেডিং :

বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি মাসেই বাংলাদেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। গ্রাম ও মফস্বলে দিনে ১০ ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লসের দায় গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

নির্বাচনী ইশতেহারে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা এবং দুই বছর মূল্য না বাড়ানোর অঙ্গীকার থাকলেও মাত্র তিন মাসের মধ্যে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সংকট সমাধান না করে বিদ্যুৎ বিভাগ উল্টো ভূতুড়ে বিল নিয়ে ‘অপপ্রচার’ চালানোর অভিযোগে জনগণকে শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। পরে গণপ্রতিরোধের মুখে ওই বক্তব্য সংশোধন করতে বাধ্য হয় বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে শেখ হাসিনার আমলের লুটপাটের ব্যবস্থা চালু থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও সরকারকে অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত এক দশকে শুধু ভাড়া বাবদ ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সরকার এখন পর্যন্ত কাঠামোগত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ফলে জনগণের অর্থের অপচয় অব্যাহত রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ সংকটের দায় পূর্ববর্তী সরকারের ওপর চাপানো হলেও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—পনেরো বছরের দুঃশাসনের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিস্থিতির দায়িত্ব নেওয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন রেকর্ড লোডশেডিং দেখা যায়নি কেন। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের এই ব্যাখ্যা দায়সারা।

কৃষকের ওপর হয়রানি ও সার সংকট :

সরকারের দুর্বল মনিটরিং এবং রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সিন্ডিকেটের কারণে চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের প্রতি বস্তা সারের জন্য অতিরিক্ত ৩৫০-৪৫০ টাকা দিতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকদের অসাধু ডিলারদের কাছ থেকে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট অসাধু ডিলাররা নগদ মেমো চাইলে সার না দেওয়ার হুমকিও দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, মেহেরপুর ও জয়পুরহাটসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব জেলায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবেদনের দাবি, কৃত্রিমভাবে সার সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। আমদানি বাজারে থাকা সিন্ডিকেট ও অসাধু আমলাদের দুষ্টচক্র সক্রিয় থাকবে এবং কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। সরকারের কৃষিকার্ডের মূল্যও কৃষককে বস্তাপ্রতি সারে ৪০০-৬০০ টাকা পরিশোধ করে চুকাতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি :

কাগজে-কলমে এবং বিএনপির অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চিনি, তেল, মুরগি, ডিম, চাল, ডাল ও সবজি কিনতে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতি কেজিতে অন্তত ১০-১৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কারণ কৃষক থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক দিনে কোটি টাকার চাঁদাবাজি চলে বলে একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

পণ্য পরিবহনের প্রতিটি ধাপেই চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কখনো বাজার ইজারা, কখনো পার্কিং চার্জ, কখনো পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতি, আবার কখনো শ্রমিক কল্যাণের নামে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করছেন।

অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ব্যাংক দখল ও বাজার সিন্ডিকেট :

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো সরকারের অব্যবস্থাপনা ও সংস্কারে অনিচ্ছার কারণে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিংকে নেতিবাচক আউটলুকে নামিয়ে এনেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয় নিম্নমুখী থাকলেও এখন তা আবার ঊর্ধ্বমুখী। এর বিপরীতে সরকারি পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পাহাড়সম আকার ধারণ করেছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ফোনে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বদলি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এস আলমের মতো ব্যাংক লুটেরাদের এবং লুট হওয়া অর্থ ফেরত আনার দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের হিড়িক পড়েছে।

Bank Resolution Act, 2026-এর ১৮(ক) ধারার মাধ্যমে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ অলিগার্কদের আবার ব্যাংক দখলের সুযোগ তৈরি করার উদ্যোগ সরকার নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে ধারাটি প্রত্যাহার করা হয়। তবুও ইসলামী ব্যাংক দখলের আশঙ্কায় অনেক গ্রাহক আমানত তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার স্বাধীনতা-পরবর্তী সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। নতুন ব্যবসা দূরের কথা, পুরোনো ব্যবসাও টিকে থাকতে কষ্ট করছে। শেয়ারবাজারে আবার স্বল্প মূলধনী শেয়ার নিয়ে কারসাজি ও জুয়া ফিরে এসেছে।

একই সময়ে বসুন্ধরা গ্রুপকে তেল বিতরণ লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্থিক খাত ধ্বংসকারী লুটেরা এস আলম গ্রুপকে ব্যাকডোরে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের পক্ষে এলসি খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ৩২ লাখ মার্কিন ডলারের ছাড়ের অনুমতি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখার যুক্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিশেষ অনুমতি দিয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষায়, এভাবেই পুরোনো লুটেরাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে।

মেগা প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও লুটপাটের আয়োজন :

নির্বাচনের আগে তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিএনপি মেগা প্রকল্পে যাবে না, কারণ মেগা প্রকল্প মানেই মেগা দুর্নীতি। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর বাস্তবে বিপরীত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোরেলের সম্প্রসারণ লাইন এমআরটি-৫ উত্তরের ব্যয় ১২৬ শতাংশ এবং এমআরটি-১-এর ব্যয় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। রাজবাড়ীর পাশায় পুরোনো ফিজিবিলিটি স্টাডির ভিত্তিতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি, টেকনিক্যাল ডিউ ডিলিজেন্স বা কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ৪৬৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। প্রতি মেগাওয়াটে এই ব্যয় প্রায় ১৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি মেগাওয়াট ব্যয়ের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য প্রতি ইউনিট ২৬ দশমিক ৭৯ টাকা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এ ধরনের প্রকল্পে যৌক্তিক খরচ ৮-১১ টাকা হওয়ার কথা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা :

১৯৮২ সালে প্রণীত জাতীয় ওষুধনীতি বাংলাদেশে সুলভ ও মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ এবং একটি শক্তিশালী দেশীয় ওষুধশিল্প গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করেছিল। এর ফলে বাংলাদেশ বর্তমানে নিজের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা নিজেই পূরণ করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করে।

১৯৯৪ সালে মূল্য নিয়ন্ত্রণের আওতা সংকুচিত করে মাত্র ১১৭টি ওষুধে সীমিত করা হয় এবং পরবর্তী তিন দশকে তা আর হালনাগাদ হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই কাঠামো সংস্কার করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২৯৫টিতে সম্প্রসারণ করে। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬ চালু করা হয়। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ এবং সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল এর লক্ষ্য।

বিএনপি সরকার আইনি প্রক্রিয়াগত ত্রুটির অজুহাতে পুরো সংস্কার বাতিল করে ১৯৯৪ সালের পুরোনো ব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়। ফলে এই সিদ্ধান্ত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর বাড়তি স্বাস্থ্যব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগী এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে মূলত লাভবান হবে ওষুধ কোম্পানিগুলো বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বহু পরিবার সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছে। মহামারি ঘোষণা করে জরুরি অবস্থা জারি না করা, জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারা এবং সামগ্রিক অব্যবস্থাপনাকে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপি সরকার কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে কাজ সারতে চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে বারবার বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। একবার বলা হয়েছে পর্যাপ্ত টিকা আছে, পরে পরিস্থিতি খারাপ হলে বলা হয়েছে কোনো টিকাই নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে টিকা নিয়ে মিথ্যা বলেছেন এবং এতদিন নাকি টিকাই দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে।

এপ্রিলের টিকা প্রদান কর্মসূচিতে সরকার ভুল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। প্রায় ৪৬ লাখ বা ২০ শতাংশ শিশুকে হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পাঁচ মাস পরও হাম নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ এটি।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক পরিবেশ :

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৪৯০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

নোয়াখালী-৬ আসনের এমপি ও এনসিপির সিনিয়র মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে গেলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের হামলার শিকার হন। ঝিনাইদহে পুলিশের উপস্থিতিতেই ছাত্রদল-যুবদল নেতা-কর্মীরা এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীসহ নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে ১৭ জন আহত হন। পরে আহতদের বিরুদ্ধেই ছাত্রদল মামলা করে এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুইজনকে কারাগারে ঈদ কাটাতে হয়।

হবিগঞ্জে ‘জুলাই পদযাত্রা’ শেষে জেলা সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণেই এনসিপি নেতা-কর্মীদের গাড়িতে হামলা হয়। প্রতিবাদ মিছিলেও হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১০ জন নেতা-কর্মী এবং কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। ছাত্রশক্তি নেতা আলিফ চৌধুরী এক চোখের দৃষ্টি হারান। এখানেও হামলায় আহতদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হয়।

এর প্রতিবাদে কুড়িগ্রামে এনসিপি-ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ মিছিলে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের অতর্কিত হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হন। একই মাসে সিলেটেও এনসিপির পদযাত্রায় হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রতিবেদনের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের এই ধারাবাহিক সহিংসতা রাজনৈতিক সহাবস্থান, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার এবং নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। এসব ঘটনায় সরকারকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এমনকি দলীয়ভাবেও হামলাকারী নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার, অব্যাহতি বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ :

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনার শাসনামলে এনটিএমসি বা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেলের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর নজরদারি ও ইন্টারনেট বন্ধের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হতো। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ও মানবাধিকারকর্মীরা সংস্থাটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনটিএমসি বিলুপ্ত করে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট’ নামে নতুন সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার এনটিএমসির কার্যক্রম বহাল রেখে বরং এটিকে আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

মে মাসে এনটিএমসির কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং সম্প্রসারণে ৯৫ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনার প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফায়ারওয়াল ডিভাইস ও প্যাকেট ব্রোকারসহ নজরদারি অবকাঠামো থাকার কথা বলা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনাকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপকে নিয়ে একটি এআই-নির্মিত কার্টুন পোস্ট করার কারণে কনটেন্ট নির্মাতা হাসান নাসিমকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। জুনে ভুয়া স্ক্রিনশটের অভিযোগে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং নিয়ে প্রতিবাদ করায় হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহাদীসহ তিনজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের মুচলেকায় জামিন দেওয়া হয়।

সাংবাদিকদের হয়রানি ও হামলা :

সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘এখন টিভি’র চার সাংবাদিককে প্রথমে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো এবং পরে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

শাহবাগ থানার ভেতরে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অন্তত ১০ জন সংবাদকর্মী ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত মামলাই গ্রহণ করেনি বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রার সংবাদ সংগ্রহের সময় কয়েকজন সাংবাদিক হামলার শিকার হন এবং কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ২৩৭টি। প্রতিবেদনে এটিকে স্বাধীন গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণপিটুনি :

সরকার গঠনের এক মাস পরই তথ্য ভবনে জুলাই অভ্যুত্থান বিষয়ক তথ্যচিত্রের বকেয়া বিল আনতে যাওয়া চলচ্চিত্রকর্মী ও শিল্পী হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ ছাত্রদলের একাংশের হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা সরকারি অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ছয় মাসে দ্বিগুণ হয়ে ১৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণভোটের রায় উপেক্ষা ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ :

নির্বাচনের আগে বিএনপি দলগতভাবে গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তারেক রহমান নিজেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি সরকার। বরং পরিষদকে ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, নির্বাচনের স্বার্থে তারা সে সময় অনেক কথা বলেননি এবং নির্বাচন যাতে বিলম্বিত না হয়, সে জন্য জুলাই জাতীয় সনদে সই করেছিলেন। প্রতিবেদনে এটিকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনগণের সংসদে দাঁড়িয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার স্বীকৃতি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির ৩১ দফার একটি দফা ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার হয় না, সংবিধান সংশোধন হয়।’ এর পরিবর্তে সরকার নিজস্ব দলীয় উদ্যোগে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ গঠন করেছে। প্রতিবেদনে এটিকে লোক দেখানো ও চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ :

ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম মাসেই ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা একজন দলীয় ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তিনি বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ২৩তম সদস্য ছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে কোনো দলীয় ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগের এটি প্রথম ঘটনা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সরকার আসার পর ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জনই দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্চ কমিটির সুপারিশ ছাড়াই এবং তিনটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের প্যানেল গঠনের বিধান এড়িয়ে ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ অজুহাতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ বর্তমানে কোনো বিশেষ পরিস্থিতি নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুন-জুলাইয়ে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা, বোর্ড-করপোরেশন এবং আটটি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বর্তমান-সাবেক ১৭ নেতাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী তাদের দলীয় পদ ছাড়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বিএনপির দলীয় ক্লাবে পরিণত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৬৩টি জেলা পরিষদে বিএনপির নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই নির্বাচনে পরাজিত অথবা দলীয় মনোনয়ন পাননি। এটি বিএনপির নিজেদের ৩১ দফার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ৩১ দফায় বলা হয়েছিল, আদালতের আদেশ ছাড়া স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না।

কিন্তু বিএনপি সরকার ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র অজুহাতে নির্বাচন ছাড়াই দলীয় কর্মীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়েও দলীয় সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে দাবি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি:

পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের সন্তানরা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারি কাজে নিয়োগ পাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অ্যাডহক কমিটিতে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ, মির্জা আব্বাসের ছেলে ইয়াসির আব্বাস এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরুকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমের ছেলে মীর সীমান্তের কোম্পানিকে বগুড়ার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি দেওয়া হয়েছে। তার নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন ইউনিয়নের নামকরণেও পারিবারিক নাম ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে এসব সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়।

চলতি মাসে জাপানি কোম্পানি Miyagawa Kensetsu ভোলা-বরিশালসহ তিনটি সেতুতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে। এই বিনিয়োগ প্রকল্পের স্থানীয় অংশীদার হিসেবে উপস্থিত ছিল স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল, যার চেয়ারম্যান সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ। দুই কোম্পানিরই এত বড় প্রকল্প পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রকল্পে এমপি-মন্ত্রীদের সন্তানদের যুক্ত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও পারিবারিক রাজনৈতিক বিকাশের নতুন সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও ন্যায়পাল :

বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমন আইন সংস্কার, কমিশনের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি এবং ন্যায়পাল নিয়োগের প্রতিশ্রুতি ছিল। বাস্তবে দ্রুতগতিতে জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ ১৬৬ দিন শূন্য ছিল। ন্যায়পাল নিয়োগের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি এবং একই পরিস্থিতি মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সম্প্রতি দুদকের চেয়ারম্যান পদে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় পদ ছাড়া প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ দেওয়া যায় না। দুদক চেয়ারম্যানের পদ একটি লাভজনক পদ এবং দুদক কোনো বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান নয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বিএনপি তাদের আগের শাসনামলেও একইভাবে একজন সাবেক বিচারপতিকে দুদকের দায়িত্ব দিয়েছিল। তখনও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। প্রতিবেদনের দাবি, সরকারের কর্মকাণ্ডের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স করতে পারে এমন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা কৌশলে অকার্যকর করে রাখা হচ্ছে।

মানবাধিকার কমিশন আইন দুর্বলীকরণ:

সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিল করে দিয়েছে। বিরোধী জোটের আপত্তির মুখে আরও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া বিলের কয়েকটি ধারা ২০০৯ সালের আইনের চেয়েও দুর্বল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বিদ্যমান আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়নি। কমিশন শুধু সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে ও সুপারিশ করতে পারবে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন কোনো অজুহাতে রেহাই পাবে না। কিন্তু নতুন খসড়ায় এই বিধান নেই। অধ্যাদেশে কারাগার, আটককেন্দ্র ও নিরাপত্তা হেফাজত পরিদর্শনের স্বাধীন ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। নতুন খসড়ায় এ ধরনের পরিদর্শনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হবে।

এর ফলে শেখ হাসিনার আমলে পরিচালিত গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর মতো স্থাপনা পরিদর্শনের ক্ষেত্রে আইনটি বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কারণ কর্তৃপক্ষ অতীতেও এসব বন্দিশালার অস্তিত্ব স্বীকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও সরকারি প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অধ্যাদেশে বাছাই কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মানবাধিকার গবেষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও ভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধি। কিন্তু নতুন খসড়ায় স্পিকারের সভাপতিত্বে গঠিত নয় সদস্যের কমিটির পাঁচজনই সরাসরি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হলে সরকারের পছন্দের বাইরে কাউকে নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সরকারের ছয় মাস পার হলেও কার্যকর কোনো মানবাধিকার কমিশন নেই। ফলে এই সরকারের আমলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় প্রাতিষ্ঠানিক, দলীয় ও নিরপেক্ষ তদন্ত দেখা যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল করে দুর্বল আইন :

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬ বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা গুমের অভিযোগ পুলিশই তদন্ত করবে। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী পরিবারের সদস্যরা শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। প্রতিবেদনের দাবি, এই কাঠামো প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানাতেই নিরুৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্টে গুম থেকে সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে। এর ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটিও বলেছে, অভিযুক্ত বাহিনী নিজের বিরুদ্ধে তদন্তে অংশ নিতে পারে না। কিন্তু খসড়া বিলের ১৪ ধারা এই ন্যূনতম মানদণ্ডও পূরণ করতে পারে না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইলিয়াস আলীসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা গুম হওয়ার ঘটনায় বিএনপি ও ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ সংস্থা, বিভাগীয় তদন্ত এবং এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন বিএনপি সরকার গুমের ঘটনায় পুলিশের তদন্তেই আস্থা রাখতে চায় বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে মোংলায় কোস্টগার্ডের হাতে মিরাজ শেখ নামে এক নাগরিককে তুলে নেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের রিট আবেদনের পর হাইকোর্ট ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে হাজির করার নির্দেশ দিলেও এখনো তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। বরং পরিবারের সদস্যরা হামলা-মামলা ও জেলের শিকার হচ্ছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন মোড়কে র‍্যাব: স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন :

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গোপন বন্দিশালা পরিচালনার অভিযোগে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহল থেকে র‍্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ এসেছিল। নির্বাচনের আগে বিএনপিও সংবাদ সম্মেলন করে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সরকার র‍্যাব বিলুপ্ত না করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে র‍্যাব পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া অনুযায়ী, র‍্যাবের জনবল, ক্ষমতা, তহবিল, সম্পত্তি ও নথি প্রায় অবিকৃতভাবে এসআরবিতে হস্তান্তর করা হবে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সুপারিশ ছিল—নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে সেটি শুধু প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে গঠন করতে হবে; সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের এতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কারণ প্রেষণে আসা সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তারা মূল বাহিনীর কমান্ড কাঠামোর বাইরে চলে যান এবং অপরাধে জড়ালে মূল বাহিনীর পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

কিন্তু অনুমোদিত খসড়ায় এই সুপারিশ প্রতিফলিত হয়নি। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের এসআরবিতে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। খসড়ার ১২ ধারা অনুযায়ী, এসআরবি পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করতে পারবে। এর নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে। আদালত, সরকার বা আইজিপি এসআরবিকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। ফলে পুরোনো র‍্যাব কাঠামোর তুলনায় এর ক্ষমতা আরও সম্প্রসারিত হবে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

খসড়ায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে অনতিবিলম্বে থানার হেফাজতে দেওয়ার বিধান এবং এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা রাখার বিধানের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ রয়েছে। এসআরবি নামে র‍্যাবের পুনর্গঠন এবং নতুন আইন প্রণয়নকে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল ছাড়া অন্য কিছু নয় বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি :

বিএনপির ৩১ দফায় বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ দফাগুলোর নোট অব ডিসেন্টে এই বিষয়ে বিএনপি কোনো আপত্তি জানায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অধ্যাদেশ জারি করে সচিবালয় গঠন করেছিল।

কিন্তু ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে সচিবালয় বিলুপ্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এটিকে নিজেদের প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নের পর আবার তা বাতিল করা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এনসিপির অভিযোগ, সরকার অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি :

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে থানায় মোট ৮৮ হাজার ২১৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা ১ হাজার ৫৩৯টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৯ হাজার ৯৮৪টি, ডাকাতি ও ছিনতাই ২ হাজার ৩৯৭টি, চুরি ৪ হাজার ১৭৪টি, মাদক ৩০ হাজার ৮২৩টি এবং চোরাচালান ১ হাজার ৫৬টি।

এই সময়ে সারা দেশে মাসে গড়ে ৩০৮টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সময় চুরি, ডাকাতি-ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক এবং চোরাচালানের মামলাও বেড়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে মোট ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। ৮৩০টি ঘটনার মধ্যে ৭৭০টিতেই বিএনপির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এর মধ্যে বিএনপির নিজস্ব দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৭৩টি সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ৩১ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ৪০০ নারী, কিশোরী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০১ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ৪০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একদিকে সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া ছাত্রদল নেতাকেও মুচলেকায় ছেড়ে দিয়ে নিজ দলের সন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

দখল ও চাঁদাবাজি :

নির্বাচনের আগে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী নেতা-কর্মীদের বলেছিলেন, ১২ তারিখ পর্যন্ত চাঁদাবাজি না করতে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরদিন থেকেই ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা, বিএনপি নেতা-কর্মীদের ব্যাপক চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এর বিরুদ্ধে লোকদেখানো দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আইনি ব্যবস্থা প্রায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চলতি মাসে কক্সবাজারে সরকারি খাসজমি দখলের চেষ্টা করে বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতা-কর্মী। পরে প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়।

গাজীপুরের টঙ্গীতে চাঁদা চাওয়ার সময় ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতিকে ফোনে বলতে শোনা যায়, ‘এখানে তারেক রহমান আইলেও কাম হবে না।’ বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টিতে ঝুট ও শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাত দখল ও চাঁদা তোলাকে কেন্দ্র করে যুবদল ও ছাত্রদলের সংঘর্ষ হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। চাঁদা না দিলে হামলা বা গুলি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওয়ার্ডের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে এমপিপুত্র এবং আজিমপুর কবরস্থান থেকে মহিষ চারণভূমি পর্যন্ত—চাঁদাবাজির ঘটনা এত বেশি যে স্বল্প পরিসরে সবগুলো উল্লেখ করা সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের হেনস্তা

ফ্যামিলি কার্ডের সুষ্ঠু তালিকা ও সুপারভাইজার পদ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, রাজশাহীর বাগমারা, গাইবান্ধার ফুলছড়িসহ মোট ১৮টি ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর বা হুমকির ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ে সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ থেকে হামলা, ভাঙচুর ও লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরদিনই নাটোরের জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার এবং লালপুরের ইউএনওকে বদলি করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আদালতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সমালোচনা করার জেরে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরা বিচারকের খাসকামরা ও এজলাস কক্ষ ভাঙচুর করেছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য :

ক্ষমতায় আসার পরপরই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল পুরোনো কায়দায় দখল ও সন্ত্রাস ফিরিয়ে এনেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

শাহবাগ থানার ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ও ডাকসু নেতৃত্বের ওপর ছাত্রদলের হামলার পরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশক্তি ও রাকসু নেতৃত্বের ওপর হামলা, এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গত ছয় মাসে শিক্ষার্থী ও বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে।

প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের সামনেই এসব হামলা সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং একটি ঘটনায় লাঠি হাতে এক পরিচিত যুবদল নেতাকে প্রকাশ্যে পুলিশকে নির্দেশ দিতে দেখা গেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমান সরকার-নিযুক্ত প্রশাসন বাকি ক্যাম্পাসগুলোতে নির্বাচন আটকে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এইচএসসি পরীক্ষায় অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য :

এবারের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ব্যাপক অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীদের কোমর বা হাঁটুসমান পানি পার হয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগাম প্রস্তুতি ছিল না।

৫ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সভায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিকে ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এর অর্থ শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে শিক্ষামন্ত্রী পরে জানান, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থান :

নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার পাশাপাশি বিদেশগামী জনশক্তি রপ্তানিও ধারাবাহিকভাবে কমছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ছিল ১১ দশমিক ৯৭ লাখ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ১০ দশমিক ১৬ লাখে দাঁড়ায়, যা ১৫ দশমিক ১৬ শতাংশ হ্রাস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংখ্যা আরও কমে ৯ দশমিক ৬৯ লাখে দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।

২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৯ দশমিক ৮৯ লাখ থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১২ লাখে পৌঁছানোর পর এই নিম্নমুখী প্রবণতা বৈদেশিক কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের জন্য উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতি বছর ২০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অর্থাৎ মাসে গড়ে দেড় লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার কথা। অথচ BMET-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে গড়ে মাত্র ৫৫ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৮৫ হাজার এবং তার আগের বছর ৮৩ হাজার। চলতি আগস্ট মাসে বিদেশে নতুন কর্মীর সংখ্যা গত বছরের অর্ধেকেরও কম হওয়ার পথে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

জুলাই গণহত্যার বিচারে অগ্রগতি দৃশ্যমান নয় :

সরকারের অগ্রাধিকার পরিকল্পনায় জুলাই গণহত্যার বিচার ছিল না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে বিচার কার্যক্রমেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গেজেটভুক্ত জুলাই শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের জন্য পৃথক পৃথক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু এসব মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো খবর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভ্যুত্থানের ইতিহাস দলীয়করণের অভিযোগ

জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ছাত্র নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকে বিএনপি সরকার দলীয় ইতিহাসে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে এক দফা থেকে জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর প্রকৃত নায়কদের আড়াল করে সেটিকে বিএনপির দলীয় আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এনসিপি ও আহত যোদ্ধাদের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ভুল স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জুলাই জাদুঘর থেকে ফালানি ও সীমান্ত হত্যাবিরোধী লড়াই, আগ্রাসনবিরোধী আন্দোলন এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের একাধিক নিদর্শন সরকারি হস্তক্ষেপে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। এভাবে সরকার অভ্যুত্থানকে জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে নিজেদের দলীয় ইতিহাসে পরিণত করার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে গাফিলতি :

অভ্যুত্থানের দুই বছর অতিবাহিত হলেও জুলাইয়ের আহত যোদ্ধাদের দুর্ভোগ শেষ হয়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সম্প্রতি জুলাইয়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ এক আহত শিক্ষার্থীর পা কেটে ফেলার পরামর্শ চিকিৎসকেরা দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এভাবে অনেক জুলাই আহত এখনো চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। অনেকের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই, ওষুধ কেনার অর্থও নেই। অথচ এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য ও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

দ্বিধান্বিত পররাষ্ট্রনীতি :

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকার দ্বিধাদ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কখনো সরকার প্রবল আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নেয়, আবার কখনো সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় পড়ে থাকে।

সীমান্ত হত্যা বন্ধে সরকার দু-একটি কড়া বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। একদিকে সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর বক্তব্য, অন্যদিকে জুলাই জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যার অন্যতম প্রতিবাদী নিদর্শন ফালানির ছবি সরিয়ে ফেলা—এটিকে কোনো আত্মবিশ্বাসী পররাষ্ট্রনীতির পরিচায়ক নয় বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে দুবাইয়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু দুই মাস পরও ওই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eight + 1 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য