সহিংস ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে থানাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশির ভাগ অস্ত্র ও গুলি লুটপাট হয়েছে। অপারেশন পরিচালনার গাড়ি পুড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স সারা দেশে থানা ও ফাঁড়িগুলোর কার্যক্রম চালু করার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। গতকাল শনিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত সারা দেশের সর্বমোট ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৫৩৮টি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
অর্থাৎ সারা দেশে ৮৪ দশমিক ১৯ ভাগ থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মেট্রোপলিটনের ১১০টি থানার মধ্যে ৮৪টি এবং জেলার ৫২৯টি থানার মধ্যে ৪৫৪টি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তাদের অপারেশনাল কার্যক্রম ও অস্ত্র উদ্ধারে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করে যাচ্ছে। অনেক থানার নিরাপত্তার দায়িত্বেও রয়েছেন সেনাবাহিনী। স্ব স্ব থানাভিত্তিক, জেলাভিত্তিক ও বিভাগভিত্তিক সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন আছে। যেখানে যে ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটুক সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে ফোন করলেই তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি ও প্রতিহিংসার ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও বিজিবি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মইনুল হাসান বলেন, ডিএমপির ৫০টি থানার মধ্যে ৩৯টি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। থানা পুলিশ জিডি নিচ্ছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী সহযোগিতা করছে। দ্রুত সময়ে বাকি থানার কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, থানা ও গাড়িগুলো যেহেতু আগুনে পুড়ে গেছে, তাই পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রমে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করেছে। পুলিশের অফিসাররা থানায় এসেছে। অফিসারদের বেশির ভাগ গাড়ি পুড়ে গেছে। থানার ওসির গাড়ি ও টহল গাড়িও পুড়ে গেছে।
এদিকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে জানানো হয়, সিএমপির ১৬ থানার মধ্যে ১১ থানা, আরএমপির ১২ থানার মধ্যে ২ থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া কেএমপি, বিএমপি, এসএমপি, জিএমপি এবং আরপিএমপির সব থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। ঢাকা রেঞ্জে ৯৮ থানার মধ্যে ৮৭, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১২ থানার মধ্যে ৬৩, রাজশাহী রেঞ্জের ৭১ থানার মধ্যে ৭০, বরিশাল রেঞ্জে ৪৬ থানার মধ্যে ৩৮, রংপুর রেঞ্জের ৬২ থানার মধ্যে ৬১, খুলনা রেঞ্জে ৬৪ থানার মধ্যে ৬১, সিলেট রেঞ্জে ৩৯ থানার মধ্যে ৩৮ ও ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৩৭ থানার মধ্যে ৩৬ থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর থানাগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে থানার কর্মকর্তাদের কথা বলতে গেলে তারা বলেন, আসলে এখন পুলিশে অনেকের মনোবল ভেঙে গেছে। বিশেষ করে কনস্টেবলদের মনোবল বেশি ভেঙেছে। তাদের মনোবল চাঙা করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই আগের মতো পুরোদমে কার্যক্রম চালু হবে। গতকাল ভুক্তভোগী অনেকেই থানায় জিডি করতে যান। রমনা থানায় দুই জন ভুক্তভোগী জিডি করতে আসেন। তারা বলেন, পুলিশ ছাড়া জিডি কার্যক্রম সম্ভব হবে না। অপরাধ দমন ও মামলার তদন্তে জরুরি ভিত্তিতে সারা দেশে পুলিশের কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, পুলিশের যে মনোবল ভেঙে গেছে, সেটা ফিরিয়ে আনতে এখন অফিসারদের সামনে আসতে হবে। তাদের অধস্তনদের বোঝাতে হবে। দ্রুত ভিত্তিতে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। রিকুইজিশন করে আপাতত কিছু গাড়ির ব্যবস্থা পুলিশকে করে দিতে হবে। এভাবেই পুলিশের কাজ শুরু করতে হবে। তাদের কোনো দাবি থাকতে পারে, সেগুলো কাজে যোগ দেওয়ার পরে বলতে হবে।
পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ বলেন, পুলিশের মধ্যে ভয়-ভীতি কাজ করছে। এই মুহূর্তে তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি। যেহেতু এই কাজটি শুরু হয়েছে, আশা করি, দ্রুত তারা আগের মতো কর্মস্থলে যোগদান করবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে ৮৪ ভাগ থানার কার্যক্রম গতকাল পর্যন্ত চালু হয়ে গেছে। অপারেশন কার্যক্রমও দ্রুত শুরু হয়ে যাবে। পুলিশের মনোবল ব্যাহত হয়েছে, ভেঙে গেছে। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা কাজে যোগদান শুরু করে দিয়েছেন। তারা মনোবল ফিরে পাচ্ছেন। দ্রুত সময়ে তারা সবাই কাজে যোগদান করবেন।
থানা ও কারাগার থেকে লুট করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত নিকটস্থ সেনাক্যাম্পে জমা দেওয়ার অনুরোধ :এদিকে আইএসপিআর গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটপাটের কিছু ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে কারো কাছে রক্ষিত এ ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ অথবা এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য থাকলে অতি দ্রুত নিকটস্থ সেনা ক্যাম্পে জমা অথবা যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
ইত্তেফাক/এমএএম
