দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের গতি। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চ মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে রেমিট্যান্স। মার্চের পুরো সময়ে এসেছে ৩২৯ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে) যার পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, মার্চের পুরো সময়ে ৩২৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এসেছিল প্রায় ২৫২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৭৭ কোটি ডলার। আর গত বছরের মার্চে এসেছিল ১৯৯ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে (মার্চ ২০২৪) রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৩০ কোটি ডলার।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নয় মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ১৭৭ কোটি ডলার আর গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এসেছিল ১ হাজার ৭০৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স। সে হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের চেয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪৭০ কোটি ডলার। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে দেশে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১৯১ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগস্টে এসেছে ২২২ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৪০ কোটি ৪১ লাখ, অক্টোবরে ২৩৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, নভেম্বরে ২২০ কোটি ডলার, ডিসেম্বরে ২৬৪ কোটি ডলার, জানুয়ারিতে ২১৯ কোটি ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ২৫৩ কোটি ডলার ও সর্বশেষ মার্চে ৩২৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত মার্চের রেমিটেন্স পরিমাণ আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। অর্থাৎ একক মাস হিসাবে আগে কখনোই এত পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি। এর আগে করোনাকালীন ২০২০ সালের জুলাইয়ে ২ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। সেই রেকর্ড ভেঙ্গে যায় ২০২৪ সালের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে। ২০২৪ সালের শেষ মাস ডিসেম্বরের পুরো সময়ে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৬৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার বেশি। গত বছরের ডিসেম্বরে এসেছিল ১৯৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০২৪ সালের জুলাই মাস বাদে বাকি ১১ মাসই দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারায় বেড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সবশেষ ২৭ মার্চ পর্যন্ত দেশে বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে। তবে এ দুই হিসাবের বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের আরও একটি হিসাব রয়েছে, সেটি ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ। এ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে শুধু আইএমএফকে প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ হিসাবে আইএমএফের এসডিআর খাতে থাকা ডলার, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাবে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা এবং আকুর বিল বাদ দিয়ে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের হিসাব করা হয়।
সেই হিসাবে দেশের ব্যয়যোগ্য প্রকৃত রিজার্ভ এখন ১৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। সাধারণত একটি দেশের ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। আমাদের দেশে সেই পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে। আর নিট রিজার্ভ গণনা করা হয় আইএমএফের ‘বিপিএম-৬’ পরিমাপ অনুসারে। মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বাদ দিলে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যায়। প্রতি মাসে ৫ বিলিয়ন ডলার হিসেবে এ রিজার্ভ দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। সাধারণত একটি দেশের ন্যূনতম ৩ মাসের আমদানি খরচের সমান রিজার্ভ থাকতে হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়নের ডলারের নিচে নামে। সে সময় বৈদেশিক ঋণ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনার মাধ্যমে রিজার্ভ বাড়ানো হয়। আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছে। আবার বিভিন্ন সোর্স থেকে ডলার যোগানের চেষ্টা করছে।
