দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২৩০ জনের বেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এতে ৮০ জনের বেশি নিহত হয়। হতাহতের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মাসিক অপরাধমূলক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১১ মাসে রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ৮৫২টি ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ১২৯ জন। আহত কমপক্ষে ছয় হাজার ৯৬৬ জন।
গতকাল শুক্রবার দিন-দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত হাদি এখন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।গতকাল সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে রাব্বি নামের এক যুবককে গুলি করে সন্ত্রাসীরা।
এর এক দিন আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কয়েক দিন আগে খুলনায় আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে মিরপুর এলাকায় যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।
চট্টগ্রামের ব্যস্ততম সড়কে গত মঙ্গলবার প্রকাশ্যে আব্দুল হাকিম নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এভাবে চলতি মাসে একাধিক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে। খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো ভীতিকর করে তুলছে।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, প্রকাশ্যে এসব গুলির ঘটনা জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত নভেম্বর মাসে সারা দেশে হত্যা মামলা হয়েছে ২৭৯টি। এর বাইরে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় ১৮৪টি, নারী ও শিশু-নির্যাতনের ঘটনায় এক হাজার ৭৪৪টি, অপহরণের ঘটনায় ৯৩টি, চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় এক হাজার ১১০টি মামলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময় দেশে অপরাধের বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১৪ হাজার ৪৬৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ডিএমপির অধীন থানাগুলোতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৩৮৩টি মামলা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) ৪১২টি ও গাজীপুর মহানগরে পুলিশে (জিএমপি) ২৭০টি মামলা হয়। অন্যান্য মহানগর থানার মধ্যে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর ও বরিশালে মামলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
রেঞ্জভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জে, দুই হাজার ৭৪০টি। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে, দুই হাজার ৪১১টি ও রাজশাহী রেঞ্জে, এক হাজার ৩৯৪টি। এ ছাড়া খুলনা রেঞ্জে এক হাজার ১৯২টি, রংপুর রেঞ্জে এক হাজার ৩৬৯টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৮৫৫টি, সিলেট রেঞ্জে ৭৫৬টি, বরিশাল রেঞ্জে ৯০৭টি এবং রেলওয়ে পুলিশে ৭৩টি মামলা হয়েছে।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ-পরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখলকেন্দ্রিক বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা জনমনে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি না হওয়ায় সর্বত্র হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি—এসব অপরাধ বেড়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা, নৈতিক স্খলন প্রভৃতি কারণে সমাজে অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির বড় কারণ হলো সীমান্ত দিয়ে দেশে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করা।
সাম্প্রতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা বেড়েছে। বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, শ্রমিকদের ওপর হামলা, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদানের ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, চলতি বছরের ১১ মাসে রাজধানীতে চার শতাধিক হত্যার অভিযোগ ওঠে। শুধু ঢাকা নয়, গোটা দেশেই হত্যাকাণ্ড বেড়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
