বাংলাদেশে নিয়মিত বিরতিতে ভয়ঙ্কর সব যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটে। মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে, প্রতিবাদ করে, ঝড় ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তারপর কিছুদিন পর আবার একই ঘটনা। একই চক্র, একই ক্ষোভ, একই অক্ষমতা। কেন বারবার এমন হয়? হয়ে আসছে?
আমরা সাধারণত ধর্ষন সমস্যার দায় স্রেফ “দুর্নীতি” বা “প্রশাসন” ওপর চাপিয়ে দেই। কিন্তু মূল সমস্যা আরও গভীরে। এই চক্র চলতে থাকে বর্তমান আইনী ব্যবস্থা এবং আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোগত কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে।
দেখুন কাঠামোগত দিক থেকে এই অপরাধ থামাতে না পারার পেছনে মূল কারণগুলো কী কী?
১। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষক ধরা পড়ে না। কারণ পুলিশ ব্যবস্থা প্রচণ্ড দুর্নীতিগ্রস্ত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। পুলিশ জনগণের সেবা করে না, ক্ষমতাসীনদের রক্ষা করে। অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে মামলার নথিপত্রে আটকে থাকে, অপরাধীরা গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
২। যথাযথ ডেটারেন্ট না থাকায় অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কাজ করে না।
৩। বিচার ব্যবস্থা অসহনীয় রকমের দীর্ঘ, অকার্যকর, এবং ইনকনসিসটেন্ট। বিচার ব্যবস্থা অত্যধিক কেন্দ্রীভূত, স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা বলতে তেমন কিছু নেই। বিচারের চেয়ে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বেশি গুরুত্ব পায়। মামলা শেষ হতে বছর, কখনও দশক লেগে যায়। একাধিক আপিলের সুযোগ থাকায় শাস্তি কার্যকর হতে দেরি হয়। একই অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন দণ্ড, ফলে অপরাধীরা শাস্তিকে গুরুত্ব দেয় না। আর আইনের ফাঁকফোকর কিংবা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কানেকশন ব্যবহার করে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবার ব্যাপারটা তো আছেই।
এই সমস্যাগুলো প্রশাসনিক না, আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যা। আধুনিক রাষ্ট্রে আইন মূলত রাষ্ট্রের হাতিয়ার এবং শাসন যন্ত্রের অংশ হিসেবে ফাংশান করে। এই ব্যবস্থা বিচারের জন্য না, ক্ষমতা ধরে রাখা আর মানুষকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য তৈরি। স্বাভাবিকভাবেই এই ব্যবস্থা ন্যায়বিচারকে বিলম্বিত করে ও অপরাধ দমন করতে ব্যর্থ। পাশাপাশি এই সিস্টেম আমলাতান্ত্রিক, এবং নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন।
এর সাথে ইসলামী শাসনের তুলনা করুন।
ইসলামী ব্যবস্থায় বিচার ছিল স্থানীয়, ডিসেন্ট্রালাইযড, বাস্তবসম্মত এবং দ্রুত। স্থানীয় পর্যায়ে কাযীদের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল। মামলা নিষ্পত্তির জন্য তারা এই মাত্রার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়তেন না। ফলে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি দেওয়া সম্ভব ছিল।
আধুনিক আইন বিচারকে নয়, প্রসেসকে প্রাধান্য দেয়। অপরদিকে, ইসলামী ব্যবস্থা দ্রুত বিচারের পক্ষে। এখানে আইনি ফাঁকফোকর এক্সপ্লয়েট করার সুযোগ নেই।
ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি কঠোর এবং তা দ্রুত কার্যকর হয়। পাবলিকলি কার্যকর করা হয়, এটা শক্তিশালী ডেটারেন্ট তৈরি করে। এছাড়া শরিয়াহ কাঠামোতে অপ্রয়োজনীয় আপিল বা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নেই।
আধুনিক আইন ব্যুরোক্রেটিক আইভরি টাওয়ারে বসে বানানো। ইসলামি বিচার কাঠামো বাস্তব জীবনের সাথে সংগতিপূর্ণ। আধুনিক আইন প্রক্রিয়াকে প্রাধান্য দেয়, ইসলামী ব্যবস্থা প্রাধান্য দেয় নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারকে। আধুনিক আইনী কাঠামো তৈরি হয়েছে কলোনিয়াল ফ্রেইমওয়ার্কের ভেতরে যার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে নিয়ন্ত্রন করা। ইসলামী ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আবশ্যিক দায়িত্ব। শুধু শাসকের না, সমাজেরও।
বারবার ধর্ষনের পেছনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন কারণও আছে। সেগুলোর সমাধান দেয়ার ক্ষেত্রেও আধুনিকতা ব্যর্থ। ব্যর্থ বলেই পশ্চিমা দেশগুলোও আজ পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান করে পারেনি, এবং পারবেও না। তবে সেই আলোচনা আরেক দিনের জন্য তোলা থাক।
সুতরাং, যদি সত্যিকারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এই ফ্রেইমওয়ার্কের ভেতরে তা খুঁজে লাভ নেই। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে—সমাধান এই সিস্টেমের ভেতরে নেই।
আমরা যদি সত্যিই পরিবর্তন চাই, ন্যায়বিচার চাই, তাহলে দরকার সেই ব্যবস্থা যার ভিত্তি সমগ্র সৃষ্টির মালিকের হিকমাহ এবং আসমানী নৈতিকতা; সেই ব্যবস্থা যা বিচারের নামে নাটক না করে, দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে— ইসলামী ব্যবস্থা, শরীয়াহ। বাস্তবসম্মত, কার্যকর, এবং পরীক্ষিত।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চাই? নাকি একই চক্রে আটকে থেকে ক্ষোভ ঝেড়ে, পোস্ট দিয়ে, দু-একদিন প্রতিবাদ করে দায়িত্ব পালন করা হয়েছে মনে করে আবার ভুলে যেতে চাই?
