১০ জুলাই ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে অনুষ্ঠিত কথিত সমলিঙ্গের বিবাহ অনুষ্ঠান পরিচয় জালিয়াতি, জাল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার, ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই ব্যক্তি হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে অনুষ্ঠিত ওই বিবাহ অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং তাদের একজনকে কনে হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কনে হিসেবে উপস্থাপিত ব্যক্তি তাসনুভা আনান, যিনি শিশির বিশ্বাস নামেও পরিচিত এবং এর আগে কামাল হোসেন নামে পরিচিত ছিলেন। সারাবাংলার এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, মন্দিরে জমা দেওয়া NID-টি জাল ছিল। ওই NID নম্বরটি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম নামের অন্য এক ব্যক্তির, কিন্তু এতে নাম, বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা ও ছবি পরিবর্তন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ধর্মীয় স্থানে কীভাবে এমন একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে পারল এবং জাল পরিচয়পত্র কীভাবে যাচাইয়ের বাইরে থেকে গেল—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, কনে হিসেবে উপস্থাপিত ব্যক্তি ট্রান্সজেন্ডার—এ বিষয়টি তারা জানতেন না এবং উভয় পক্ষই তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক তথ্য গোপন করেছিলেন।
ঢাকেশ্বরী মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডি. এন. চ্যাটার্জি বলেছেন, হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয় এবং মন্দির কর্তৃপক্ষ প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ২ হাজার টাকা গ্রহণ করে। বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল—এমন অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন। বিতর্কের পর মন্দির কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে দম্পতিদের নথিপত্র জমা নিয়ে তা আগেই যাচাই করার নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ঘটনাটি বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার প্রয়োগ, পাশাপাশি হিন্দু মন্দিরে অনুষ্ঠিত কথিত সমলিঙ্গের বিবাহের আইনি ও ধর্মীয় অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ আশরাফুজ্জামান মামুন বলেছেন, মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নথিপত্র গ্রহণ করে পুলিশ সেগুলো পরীক্ষা করেছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অথচ মন্দির কমিটির দাবি, তারা ইতোমধ্যে অভিযোগ দায়ের করেছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও পুলিশের কাছে দিয়েছে।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর এবং NID জালিয়াতির কথিত প্রমাণ পুলিশের কাছে জমা দেওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো আইনগত ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়নি?
আমরা বিশ্বাস করি, আইনের প্রয়োগ সবার ক্ষেত্রে সমান হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক থাকতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের পরিচয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি।
কিন্তু এই ঘটনায় এই তিনটি বিষয় নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রাঙ্গণে একটি কথিত সমলিঙ্গের বিবাহ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে, আর একই সময়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দৃশ্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। বিষয়টি এখন আর শুধু একটি অনুষ্ঠান কিংবা মন্দির কর্তৃপক্ষের নথি যাচাইয়ে ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কথিত পরিচয় জালিয়াতি, জাল সরকারি নথি ব্যবহারের অভিযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং অভিযোগ দায়েরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব।
কোনো অপরাধের প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপিত হওয়ার পরও যদি একটি ব্যবস্থা নীরব থাকে, তাহলে সেই প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তাই একসময় প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার জন্ম দিতে পারে।
তাই সরকারের কাছে জনগণের কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর প্রত্যাশিত। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং কথিত NID জালিয়াতির নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের আইনে সমলিঙ্গের বিবাহের আইনগত স্বীকৃতি না থাকলে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন অনুষ্ঠান কীভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারল? এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা বা অনুমোদন ছিল কি না, নাকি এটি বৃহত্তর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফল—সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি স্বচ্ছভাবে তদন্ত করে জনগণকে জানানো—কীভাবে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হতে পারল, এর কোনো আইনগত বৈধতা রয়েছে কি না এবং অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও কেন দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
