গত সপ্তাহে সিদ্ধান্ত এলো — দেশের সব শপিংমল, মার্কেট আর দোকান রাত আটটার মধ্যে বন্ধ। বিলবোর্ডের আলো নিভবে সাতটায়।
কারণ? বিদ্যুৎ সাশ্রয়।
এই লেখাটা যখন লিখছি, দেশের ৪১টা বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ। কোথাও কোথাও দিনে দশ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা কিন্তু ৩২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কেন্দ্রগুলো স্বস্থানেই আছে, শুধু চলছে না।
কারণ জ্বালানি নেই।
সংকটের শুরুটা গ্যাসে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাস দরকার প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। পাচ্ছে ৭০ কোটি। চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
কিন্তু গ্যাস না থাকলে বিকল্প আছে — তরল জ্বালানি। ফার্নেস অয়েল, ডিজেল। অনেক কেন্দ্র দুটোতেই চলতে পারে।
তাহলে তেলে চালানো হচ্ছে না কেন?
খবরেই উত্তরটা আছে। তেল আছে, কিন্তু অতিরিক্ত খরচের ভয়ে পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না।
এখানেই আসল প্রশ্ন। আমাদের জন্য তেলটা এত ব্যয়বহুল কেন?
এবার আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা বলি।
বছরখানেক আগে আমি জ্বালানি তেলের খাতটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। বাংলাদেশ থেকেই। তখন রাশিয়ার ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা চলছিল। রাশিয়া তেলও ছেড়েছিল অস্বাভাবিক কমে। বাজারদরের চেয়ে অনেক কম।
লোভনীয় প্রস্তাব। ভারত নিল, চীন নিল, আরও অনেকে নিল। আমি ভাবলাম, এটা যদি বাংলাদেশে আনা যেত — দেশের জন্য দারুণ একটা ডিল হতো।
তারপর খুঁজতে নামলাম।
আর যা দেখলাম, তাতে বুঝলাম ব্যাপারটা যত সহজ ভেবেছিলাম, তত সহজ না। দেশের ভেতরে কয়েক স্তরের লেয়ার। সীমানার বাইরেও আরো কয়েকটা লেয়ার। প্রতিটা স্তরে নির্দিষ্ট কিছু মুখ, নির্দিষ্ট কিছু নাম।
একটা শিক্ষা হয়ে গেল, যেটা আজও মনে আছে —
“If you want to sell dark, you have to be dark.”
ক্রুড ওয়েল যেমন কালো। এটা বেঁচতে গেলে নিজেকেও কালো হতে হবে।
কিন্তু আজ আমি অভিজ্ঞতা নিয়ে বসিনি। কারণ অভিজ্ঞতা প্রমাণ নয়। আজ শুধু সেই তথ্যগুলো বলব, যেগুলো সরকারি নথিতেই আছে।
প্রথম তথ্য।
বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধনের দায়িত্ব একটাই প্রতিষ্ঠানের — বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, বিপিসি।
একটাই আমদানিকারক। একটাই বণ্টনকারী।
দ্বিতীয় তথ্য।
দেশে তেল পরিশোধনের কারখানা আছে মাত্র একটি — ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। চট্টগ্রামে। ষাটের দশকে তৈরি।
এর বার্ষিক সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। আর এটা দেশের মোট চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ। তার মানে বাকি ৮০ শতাংশ আমরা আমদানি করি ইতিমধ্যে পরিশোধিত অবস্থায়। ডিজেল, অকটেন, পেট্রল — সব কেনা তেল হিসেবে।
তৃতীয় তথ্য। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশোধিত তেল কেনা অপরিশোধিত তেল কিনে নিজে পরিশোধন করার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
বিপিসি ও রিফাইনারির সূত্র ধরে গণমাধ্যমে এসেছে — নিজেরা পরিশোধন করলে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১ ডলার সাশ্রয় হতো।
লিটারপ্রতি কয়েক টাকা। প্রতি বছর কয়েক লাখ টন। হিসাবটা নিজেই করে নিন।
এবার আমার সেই প্রশ্নের উত্তরটা মিলিয়ে নিন।
রাশিয়া যেটা কম দামে ছাড়ছিল, সেটা ছিল অপরিশোধিত তেল। যাকে ক্রুড বলা হয়।
আর ক্রুড কিনে লাভবান হতে হলে দরকার পরিশোধনক্ষমতা। আমাদের সেটা নেই। আমাদের একটাই রিফাইনারি, যেটা চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ সামলায়। তাই সস্তা তেল্টা আমাদের সামনে থাকলেও, আমরা নিতে পারি না।
এখন প্রশ্ন হলো — দ্বিতীয় আরেক রিফাইনারিটা কি কেউ কখনো চায়নি?
চেয়েছে। প্রকল্পটার নাম ইআরএল-২।
নকশা হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগ হয়েছে। খরচের হিসাব বারবার সংশোধিত হয়েছে। শুধু নির্মাণকাজটা কখনো শুরু হয়নি। অনুসন্ধান বলছে, প্রকল্পটা ষোলো বছর পিছিয়ে।
আর এই বছরের এপ্রিলে কী হলো সেটা তো সবাই দেখলেন। উপসাগরে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্ববাজার টালমাটাল, হরমুজ অবরোধ আর আরব উপদ্বীপ থেকে আমাদের চিরাচরিত সরবরাহ ব্যাহত।
আর আমাদের একমাত্র রিফাইনারিটার ক্রুড ফুরিয়ে গেল। প্রায় ২৬ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। একটা দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ছাব্বিশ দিন বন্ধ! যে কারখানাটা ঠিক এই সংকট ঠেকানোর জন্য বানানোর কথা ছিল, সেটা তখনো কাগজেই আটকে।
এটা কি কারও ব্যর্থতা? নাকি কারও সাফল্য? আরও সহজ করে বলি আবার।
তেল পাওয়ার দুটো পথ আছে।
এক নম্বর পথ
একাধিক রিফাইনারি বানিয়ে ফেলা। তারপর সারা দুনিয়া থেকে সস্তায় কাঁচা তেল কিনে নিজেরাই পরিশোধন করা।
দুই নম্বর পথ
কারখানা না বানিয়ে প্রতি বছর পরিশোধিত তেল কিনে আনা। বেশি দামে।
আমরা দুই নম্বর পথে চলি বেশি। আর এই কেনাকাটা হয় বছরে দুইবার, ছয় মাসের চুক্তিতে।
এখন পার্থক্যটা খেয়াল করুন। এক নম্বর পথে কারখানাটা একবার বানাতে হয়। তারপর কাজ শেষ।
দুই নম্বর পথে? প্রতি ছয় মাসে নতুন চুক্তি। নতুন টেন্ডার, নতুন আলোচনা, নতুন মধ্যস্থতা। বছরের পর বছর, অনন্তকাল।
আর এখানে একটা বিষয় আছে, যেটা জানা দরকার।
আমরা কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারদরে তেল কিনি না। আমরা কিনি বাজারদর প্লাস প্রিমিয়াম দামে। প্রিমিয়াম মানে ব্যারেলপ্রতি বাড়তি একটা অঙ্ক, যেটা দরকষাকষি করে ঠিক হয়।
কত বাড়তি?
ভারতের সাথে ২০১৭ সালে করা একটা ১৫ বছরের চুক্তিতে প্রিমিয়াম ঠিক করা আছে ব্যারেলপ্রতি সাড়ে পাঁচ ডলার। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সিঙ্গাপুরে গিয়ে দরকষাকষি করে প্রিমিয়াম কমানো হলো। সাশ্রয় হলো ৭৬০ কোটি টাকা।
একবার দরকষাকষিতেই ৭৬০ কোটি।
প্রশ্নটা তাহলে সহজ — আগের বছরগুলোতে এই টাকাটা কোথায় যাচ্ছিল?
আর সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবরটা শুনুন। কয়েক সপ্তাহ আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পরের দফার টেন্ডার প্রস্তুতির সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ২১ দিন করা হবে।
সময় অর্ধেক করে দিলে কারা অংশ নিতে পারে? যারা আগে থেকেই প্রস্তুত।
তাই প্রশ্নটা আমি এভাবে রাখব —
রিফাইনারিটা তৈরি হয়ে গেলে এই ছয় মাস পরপর চুক্তিগুলোর কী হয়?
আমি উত্তর দিচ্ছি না। আমার কাছে প্রমাণ নেই, আর প্রমাণ ছাড়া আমি কাউকে অভিযুক্ত করি না।
আমি শুধু প্রশ্নটা রেখে যাচ্ছি।
আবার এই আগস্টেই সিদ্ধান্ত এসেছে, বেসরকারি খাতকে তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।
শুনতে ভালো লাগে। একচেটিয়া ব্যবস্থা ভাঙবে, নতুন প্রতিযোগিতা আসবে।
কিন্তু খেয়াল করুন — জ্বালানি বিভাগ নীতিমালার খসড়া চেয়েছে মাত্র চার দিনের মধ্যে। একটা জাতীয় জ্বালানি নীতি, মাত্র চার দিনে!
নীতি-বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন: পরিশোধিত তেল আমদানি করতে লাগে গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বিশাল সংরক্ষণাগার, পাইপলাইন, কয়েকশো মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন।
বাংলাদেশে এই সামর্থ্য কয়টা প্রতিষ্ঠানের আছে?
তিন-চারটা। বড়জোর।।তার মানে একচেটিয়া মাফিয়াগিরি ভাঙছে না। শুধু হাত বদলাচ্ছে।
আর নামটা রাখা হচ্ছে “প্রতিযোগিতা।”
সরকার বদলায়। মুখ বদলায়। কাঠামোটা থেকে যায়।
আমি কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে বলছি না। আমি বলছি সেই ব্যবস্থাটার কথা, যেখানে অল্প কয়েকজনের হাতে একটা জাতির জ্বালানি জিম্মি থাকে।
আর ঠিক এখানেই আমাদের দ্বীন এমন কিছু বলে, যেটা শুনলে থমকে যেতে হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —
“মুসলিমরা তিনটি জিনিসে অংশীদার — পানি, ঘাস এবং আগুন।”
(সুনানে আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
পানি — জীবনের উৎস।
ঘাস — জীবিকার উৎস।
আর আগুন — জ্বালানি। শক্তি।
চৌদ্দশ বছর আগে, যখন আগুন মানে ছিল কাঠের চুলা, তখনই বলা হয়ে গিয়েছিল — এতে সবার অংশীদারিত্ব আছে। এটা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
আজ সেই আগুনের নাম গ্যাস, তেল, বিদ্যুৎ।
নীতিটা বদলায়নি। শুধু আমরা ভুলে গেছি।
আর নবীজি আরও বলেছেন —
“পাপী ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না।”
(সহিহ মুসলিম)
মজুতদারি। মানে জিনিস আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, তারপর বেশি দামে বেচা।
ইসলাম দাম নির্ধারণ করে দেয়নি। বাজারকে চলতে দিয়েছে। কিন্তু কৃত্রিম সংকট তৈরি করাকে সরাসরি পাপ বলেছে। কারণ মুক্ত বাজার আর নিয়ন্ত্রিত বাজার এক জিনিস না।
তাহলে আমরা কী করব?
আমি নীতিনির্ধারক নই। কিন্তু নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন করার অধিকার আমার আছে। আপনারও আছে।
১। ইআরএল-২ কবে শুরু হবে? নির্দিষ্ট তারিখ কী?
২। তেল আমদানির দাম আর পরিমাণ কি নিয়মিত প্রকাশ করা হবে?
৩। যে নীতিমালা চার দিনে খসড়া হয়, সেটা নিয়ে কি খোলা আলোচনা হবে?
প্রশ্নগুলো কোনো দলের বিরুদ্ধে না। কাঠামোর কাছে।
আর প্রশ্ন করাটাই আমাদের দায়িত্ব। কারণ আমরা প্রশ্ন না করলে, উত্তরটা কেউ একজন আমাদের হয়ে ঠিক করে দেবে।
এসি রুমে বসে, কোনো একটা বোর্ডরুমে।।
আল্লাহ আমাদের জ্বালানিতে বরকত দিন। আমাদের সম্পদ যেন গুটিকয়েকের হাতে জিম্মি না হয়। আর সত্য জেনে সত্য বলার সাহস আমাদের দিন।
আমীন। ![]()
© Abu MuHammad Rafiuzzaman
