
২০১৪ সালে তোলা এক ছবিতে মঞ্চে একসাথে এড শিরান ও র্যাপার ম্যাকলমোর। সোমবার দেওয়া বিবৃতিতে র্যাপার ম্যাকলমোর জানান, গত ১৩ বছর ধরে তারা বন্ধু। ছবি: সংগৃহীত
মঞ্চে ফিলিস্তিনপন্থী বক্তব্য দেওয়ার কারণে র্যাপার ম্যাকলমোরকে এড শিরানের যুক্তরাষ্ট্র সফর (ইউএস ট্যুর) থেকে বাদ দেওয়ার পর সফরটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বাকি সব সহশিল্পী।
সফর বর্জনকারী শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন পপ তারকা বিলি আইলিশের ভাই ফিনিয়াস। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘নিপীড়িতদের পক্ষে কথা বললে শিল্পীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা উচিত নয়।’
এ ছাড়া আইরিশ সংগীতশিল্পী ও গীতিকার অ্যারন রো এবং ডেনিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহামও সফর থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতি রাতে মঞ্চে শিরানের সঙ্গে গান পরিবেশন করা আইরিশ ফোক ব্যান্ড ‘বেওগা’ও সফরটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।
গাজা ইস্যু নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কে না জড়ানোর এবং ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে তার কোনো ভূমিকা নেই—শিরানের এমন বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সহশিল্পীদের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে শিরান বলেন, ‘ট্যুর থেকে ম্যাকলমোরের বাদ পড়াটা প্রমোটরের সিদ্ধান্ত ছিল, আমার নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পনা করে রাখা ভক্তদের আমি কখনোই হতাশ করব না; তেমনি কাজের জন্য এবং জীবিকার তাগিদে আমার ওপর নির্ভরশীল ট্যুর ক্রু, অন্যান্য সহশিল্পী ও সংগীতশিল্পীদেরও আমি ছেড়ে যাব না।’
চলতি মাসের শুরুতে নিউজার্সিতে দুটি কনসার্ট চলাকালে ম্যাকলমোর দর্শকদের উদ্দেশে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেন। এ সময় তিনি গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞের বিভিন্ন ছবিও মঞ্চের বড় পর্দায় প্রদর্শন করেন।
তার বক্তব্যের পর ইহুদি সংগঠনগুলোর সমালোচনা শুরু হয়। কয়েকটি ভেন্যু কর্তৃপক্ষও ট্যুরের প্রমোটরদের ওপর ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়।
শিরান জানান, একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে তিনি সপ্তাহজুড়ে ভেন্যু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন’। তবে শেষ পর্যন্ত ট্যুরের প্রমোটর প্রতিষ্ঠান ‘মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ’ ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
শিরান বলেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং উভয় পক্ষের মানুষের দুর্ভোগে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। তবে নিজের মঞ্চকে রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে রাখতে চান তিনি।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে শিরান বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায়ের সহযোগী নই। সংঘাত নিয়ে আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। জনসমক্ষে তা প্রকাশ না করার মানে এই নয় যে বিষয়টি নিয়ে আমি ভাবি না।’
তিনি আরও বলেন, তার কনসার্টে নানা বয়সী মানুষ ও শিশুরা আসে। তারা কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চ প্রত্যাশা করে না। শান্তি প্রতিষ্ঠার একাধিক পথ থাকতে পারে উল্লেখ করে শিরান বলেন, কেবল চিৎকার করলেই পরিবর্তনের সূচনা হয় না।
শিরানের এই বক্তব্যের পর সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় লুকাস গ্রাহাম। ডেনিশ ব্যান্ডটি জানায়, যেখানেই যুদ্ধ হোক কিংবা নিরপরাধ মানুষ ও শিশুরা মারা যাক না কেন, সে বিষয়ে কথা বলার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
আইরিশ ফোক ব্যান্ড ‘বেওগা’ও জানায়, ফিলিস্তিনের মুক্তির পক্ষে কথা বলায় যেখানে কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়, এমন ভেন্যুতে গান গাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আইরিশ সংগীতশিল্পী অ্যারন রো-ও ‘ব্যথিত মনে’ সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ৪ সেপ্টেম্বর নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। সেখানে কনসার্ট চলাকালে ম্যাকলমোর দর্শকদের উদ্দেশে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেন। এরপর গাজায় সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে নিজের গান ‘হিন্দস হল’ পরিবেশন করেন। কনসার্টের বড় পর্দায় তখন গাজার ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য দেখানো হয়।
পরদিনের কনসার্টে ম্যাকলমোর বলেন, ইসরায়েলের আগ্রাসন ও গণহত্যার বিরোধিতা করার মানে সাধারণ ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বিরোধিতা করা নয়।
ট্যুর থেকে ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার দাবিতে পিটিশন চালু করে ‘ইসরায়েলি আমেরিকান কাউন্সিল’। অন্যদিকে ‘স্টপ অ্যান্টিসেমিটিজম’ অভিযোগ করে, এই সংগীতশিল্পী কনসার্টের ভক্তদের ওপর অপপ্রচার চাপিয়ে দিয়েছেন। পপ তারকা পিংক তাদের বক্তব্য ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করলে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।
তবে পরের রাতেও একই মঞ্চে ওঠেন ম্যাকলমোর। উপস্থিত দর্শকদের মধ্যকার ‘ইহুদি ভাই ও বোনদের’ উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের সমালোচনা করা, বর্ণবাদের বিরোধিতা করা কিংবা গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনোভাবেই আপনাদের বিরুদ্ধে যাওয়া নয়।’
তিনি আরও বলেন, গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষ যেন বুঝতে পারে, তাদের ভুলে যাওয়া হয়নি।
তবে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে ইসরায়েল দাবি করছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে আত্মরক্ষার্থে অভিযান চালাচ্ছে তাদের সেনারা।
সফর থেকে বাদ পড়ার পর ম্যাকলমোর জানান, তিনি শিরানের জটিল পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন। তবে সংকটকালে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ম্যাকলমোর বলেন, ‘নিপীড়ক ও নিপীড়িতের মাঝে কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান থাকতে পারে না।’
নিজের অবস্থানের কারণে আর্থিক ও ক্যারিয়ারের ক্ষতি হলেও তিনি বলেন, তার বক্তব্য যদি বিশ্ববাসীর মনোযোগ আবারও ফিলিস্তিনের দিকে ফিরিয়ে আনতে পেরে থাকে, তবে এটিই তার সংগীতজীবনের ‘সবচেয়ে সফল সফর’।
