ডিজেলের দাম বাড়ার একদিন পরই তার আঁচ পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের জীবনে। গতকাল সোমবার রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে দূরত্বভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। একই দিনে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পাঠাতে পরিবহন খরচ বেড়েছে ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এই অভিঘাত শুধু বাস বা ট্রাকেই থেমে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, পরিবহনভাড়া, কৃষির উৎপাদন ব্যয়, কারখানার পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদন খরচ সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ তৈরি হবে। বিদ্যুৎহীন বা লোডশেডিংয়ের সময় কেরোসিনের কুপি জ্বালানো গ্রামীণ পরিবার এবং মোটরসাইকেল-গাড়ির মালিকদের খরচও বাড়বে। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার চাপ সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে গরিব, নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি বেশি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে। বাসভাড়া, চাল-সবজির দাম কিংবা রান্নার খরচ বাড়লে নিম্ন আয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় চাপ তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবার এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের হিসাব কিছুটা সহজ হলেও এর বিনিময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও বৈষম্য বৃদ্ধির মতো চাপ তৈরি হতে পারে।
গাবতলী টার্মিনালে গতকাল এসি ও নন-এসি দুই ধরনের বাসেই দূরত্বভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জি আর শহীদ বলেন, বেশি ভাড়া না নিলে বাসমালিকদের লোকসান হবে। এমন অবস্থা দু-তিন দিন থাকতে পারে; শিগগিরই নতুন ভাড়ার তালিকা জানানো হবে। এদিকে বিআরটিএর কমিটি দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগর বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। সিদ্ধান্ত দেবে সড়ক মন্ত্রণালয়।
ট্রাকভাড়াতেও ইতিমধ্যে ২ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি চাওয়া হচ্ছে। কুষ্টিয়া থেকে চট্টগ্রামে এক ট্রাক পণ্যের ভাড়া ৩২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা হয়েছে। সাতক্ষীরা-চট্টগ্রাম পথে আসা-যাওয়ায় এক ট্রাকচালকের ডিজেল খরচে বাড়তি পড়বে ৪ হাজার ৬০০ টাকা। বেনাপোল থেকে কাঁচপুরে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১৮-১৯ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার টাকা।
দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশে ১৩ থেকে ১৫ লাখ ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র রয়েছে; ডিজেলের চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ আসে সেচ ও কৃষি খাত থেকে। দাম বাড়ায় সেচ, জেনারেটর ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালানোর খরচও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে ভোক্তার ওপর পড়তে পারে।
২০২২ সালের আগস্টেও ডিজেলের দাম এক লাফে ৩৪ টাকা বা ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। পরে ২৩ দিনের মাথায় ৫ টাকা কমানো হয়। সে সময় বাস, ট্রাক ও লঞ্চের ভাড়া এবং পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছিল; মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ হয়েছিল।
এবারও মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি থাকা অবস্থায় গত রোববার ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে দাম যথাক্রমে ১৩৫, ১৬০, ১৬৫ ও ১৫৫ টাকা।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ হচ্ছে ২০৫ টাকা; নতুন দামেও প্রতি লিটারে ৭০ টাকা লোকসান থাকছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় এই সমন্বয় জরুরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে নভেম্বরের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে নেমেছে; ১৫ সেপ্টেম্বর তা ছিল ১০৯ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, বারবার জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালে দারিদ্র্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি খাতে উচ্চহারের শুল্ক-কর, অপচয় ও ‘সিস্টেম লস’ কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় আনা দরকার।
বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেলে ২৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলে সাড়ে ২৭ শতাংশ শুল্ক-কর নেওয়া হয়। বিপিসি সূত্র বলছে, বর্তমানে আমদানি করা ডিজেলে প্রতি লিটারে সরকার প্রায় ৩৮ টাকা শুল্ক-কর পাচ্ছে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ানোই সমস্যার একমাত্র সমাধান কি না, তা বিবেচনা করা দরকার। তাঁর মতে, সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার অপচয় এবং ‘সিস্টেম লস’ কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সূত্রঃ প্রথম আলো
