অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে ফ্রান্স। সঙ্গে আছে ভূরাজনৈতিক কারণ। বাংলাদেশেরও ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে জোরালো আগ্রহ আছে। এর কারণ কৌশলগত।
ফ্রান্স মনে করছে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ফলে এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে অন্য দেশের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কম।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ দুই দিনের সফরে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌঁছেছেন।
১৯৯০ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরা বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। এবার প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর সফরের পর সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে মন্ত্রী পর্যায়ের আরো সফর অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ম্যাখোঁর সফরের প্রাক্কালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টর দপ্তর এলিসি সূত্র জানায়, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের সাফল্য, অগ্রগতি অগ্রাহ্য করেছিল ফ্রান্স। এখন অনেক বিষয়ে তাদের ধারণা বদলাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বিপুল জনগোষ্ঠী, দীর্ঘ মেয়াদে রোহিঙ্গা সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের সামনে জোরালো সম্ভাবনা আছে। এটি ফ্রান্স আমলে নিচ্ছে।
এলিসি সূত্র জানায়, ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে স্কুলগামী শিক্ষার্থীর হার বাড়ছে। বাড়ছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা। জিডিপিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান, মালয়েশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে।
আয়তনে ছোট রাষ্ট্রে বিশাল জনসংখ্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড সাগরগর্ভে যাওয়ার আশঙ্কা এবং রোহিঙ্গা সংকটও ভবিষ্যতের দিকে বাংলাদেশের দৃষ্টি ঠেকাতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নামে এক বড় উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। ভারতীয় অংশীদারদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ করে তুলতে তিনি বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করছেন।
এলিসি সূত্র বলেছে, ফ্রান্স এখন বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে মনে করছে। অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ ঋণদাতাদের চাপে পড়ছে না। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির দেশ হওয়ার কথা রয়েছে।
ফান্সের প্রেসিডেন্টের সফর উপলক্ষে এলিসির এক ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে বাংলাদেশের অত্যন্ত ইতিবাচক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ফ্রান্সকে এর অংশীদার হতে আগ্রহী করে তুলেছে। বাংলাদেশের শক্তিশালী খাতগুলোর সঙ্গে ফ্রান্স এখন অংশীদারি করতে চায়।
ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে যে প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে, তাতে অত্যন্ত জোরালো রাজনৈতিক আগ্রহ রয়েছে ফ্রান্সের।
এলিসির এক ব্রিফিং নোটের বিষয়বস্তু জানিয়ে মূল্যায়ন করতে বললে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার এম শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অর্থনীতির অন্যতম হবে—এমন পূর্বাভাস আছে। বাংলাদেশ গ্লোবাল সাউথের নেতা। এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগের কারণে বাংলাদেশের প্রতি ফ্রান্সের সক্রিয় আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন কারিগরি খাতে বাংলাদেশে ফ্রান্সের সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখছেন সাবেক এই পররাষ্ট্রসচিব। তিনি বলেন, প্যারিস ঘোষণা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ফ্রান্স বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিমানের জন্য এয়ারবাস সরবরাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ আছে।
শহীদুল হক মনে করেন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স ইন্দো-প্যাসিফিক ক্লাবের সদস্য। ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবনার মিল আছে। দুই দেশই অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছে।
এলিসির ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, ফ্রান্স বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা করতে চায়। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে অ্যারোনটিকসের মতো কৌশলগত খাতেও কাজ করতে আগ্রহী। বাংলাদেশ বিমানের বহরে এয়ারবাস কেনার বিষয়ে গত মে মাসে একটি বিবৃতি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই সফরে এ বিষয়ে ফ্রান্স আলোচনা করবে।
এ ছাড়া ফ্রান্স বাংলাদেশকে জ্বালানি খাত রূপান্তর ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহযোগিতা করতে চায়। বাংলাদেশে ফরাসি উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা এএফডির সহযোগিতা তিন গুণ বেড়ে প্রায় ২০০ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে। আগামী তিন বছরের এএফডির প্রকল্পের জন্য আরো ১০০ কোটি ইউরো দেওয়ার কথা রয়েছে।
রূপপুরে রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মীয়মাণ প্রকল্পের বিষয়েও ফ্রান্স অবগত। এলিসির ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা নিয়েও আলোচনা করতে চান। বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের চাহিদাগুলো চিহ্নিত করা হবে। পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা আছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পুরো পারমাণবিক শিল্পকে নতুন করে সাজিয়েছেন।
ব্রিফিং নোটে বলা হয়েছে, এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নদ ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জলবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে ফ্রান্সের সহযোগিতার সুযোগ আছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলো বাংলাদেশকেই নিতে হবে। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা দিতে চায় ফ্রান্স। বাংলাদেশের সামনের চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে ও উন্নয়ন সহায়তা দিতে ফ্রান্স অঙ্গীকারবদ্ধ।
এলিসি সূত্র এই অঞ্চলের প্রতি ফ্রান্সের অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ গত ১৪ জুলাই ফ্রান্সে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। ওই মাসেই প্রথম ফরাসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি শ্রীলঙ্কা সফর করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ সফর করছেন।
এলিসি সূত্র জানায়, এই অঞ্চলের বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোও ফ্রান্সের দিকে ঝুঁকছে। এ বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক আগে পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন ছিল। এই অঞ্চলের দেশগুলোর ফ্রান্সের দিকে ঝোঁকার কারণ, তাদের অনেকের ওপর চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার জোরালো চাপ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের অন্যতম কারণ হিসেবে এলিসি সূত্র বলছে, ফ্রান্স বাংলাদেশকে অনেক প্রস্তাব দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েক বছর ধরেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে আসছিলেন।
