প্রকৃত পক্ষে আদনানকে নিয়ে আমার বেশ কিছু বলার নাই, মিডিয়ার কল্যাণে বুঝতে পেরেছি তিনি একজন উঠতি বক্তা এবং ইতিমধ্যে তার অনেক ভিউয়ার এবং পক্ষাবলম্বী হয়েছে, কয়দিন আগে তিনি সহ কয়েকজন গুম হয়েছেন, এই গুমকে কেন্দ্র করে পক্ষে বিপক্ষে এত বেশী ফেইছবুক চর্চা হচ্ছে এবং এই চর্চার বেশীর ভাগ ভাষা কুৎসিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না, দুঃখটা সেখানেই। আমরা যারা এই কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করছি, তারা কেউই ক অক্ষর গোমাংস, তা কিন্তু না, তাহলে একবার ভাবুন, এদেরকে কি ইসলাম, এই শিখিয়েছে? এরা কম বেশী সবাই ইসলাম সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞান রাখে, আর কিছু না জানুক, এটা তো জানে, প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ, (সুরা আল-হুমাযাহ, আয়াত ১) একই সুরার শেষে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, এটা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত অগ্নি, (সুরা আল-হুমাযাহ, আয়াত ৬) তা হলে একবার ভাবুন আমরা কিসের থেকে নিরাপদ আছি আর কি করে বেড়াচ্ছি? আমি আশা করি আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে এই ফেতনা থেকে নিরাপদ রাখুন। আহকাম আরকাম বিষয়ে অতীতেও মত বিরোধ ছিল, প্রমান হিসাবে চার মাজহাবের উৎপত্তি। কই এই বলেতো চার মাজহাবের চার কর্ণধার তো ঝগড়া বা বিরোধে লিপ্ত হন নাই, বরং সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে তারা আজ অব্দি পৃথিবীতে উজ্জল নক্ষত্র হিসাবে আলোকিত হয়ে আছেন। তা হলে আমরা কেন কাদা ছোড়াছোড়ি করছি।
এবার আসি গুম বিষয়ে আমাদের ধারণাটা কি? এক হিসাব মতে গত ১০ বৎসরে ৫৪৪ জন গুম হয়েছে[1] বিচার বহির্ভূত হত্যা নিয়ে এই প্রবন্ধ নয়। এখানে শুধু গুম নিয়ে আলোচনা করবো। গুমের শাব্দিক অর্থ হোল হঠাৎ এক দিন নাই হয়ে যাওয়া। খুঁজে ঐ লোকটাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। এবং শেষ পর্যন্ত চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া।
আজ পর্যন্ত আমি যতদুর জানি সরকার এ বিষয়ে কোন দিন স্বীকার করে নাই যে তারা গুম করে থাকে। সরকারের ভিতরে যদি আর কোন সরকার থেকেও থাকে তা হলেও তারাও স্বীকারোক্তি দেয় নাই যে তার গুম করে আসছে। তবে কি, এ ভাবে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোন প্রাইভেট সংস্থা আছে আর তার সংখ্যাটা বা কত? এই কতক প্রশ্নের উত্তর আজ অবদি জনগণ জানতে পারে নাই, স্বাধীনতা পার হয়ে এসে এখনও আমরা এই বিষয়ে অজ্ঞ রয়ে গেলাম যে গুম কারা করে আসছে। কিন্তু সন্দেহের তীর সবসময় সরকারের দিকেই যাচ্ছে। এর বিশদ কারণও আছে, যদিও সন্দেহ বা অনুমান করা অনুচিত, আবার ফিরে যাই আমাদের সেই শাশ্বত ধর্মে, এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, অনুমানকারীরা ধ্বংস হোক, (সুরা যারিয়াত, আয়াত ১০) আমরা এমনি দুর্ভাগা যে গত ১০ বৎসরের শুধু গুমের পরিসংখ্যান পেয়েছি। উদ্ধারের কোন তথ্য, উপাত্ত পাই নাই। সরকার ছাড়া যদি কোন প্রাইভেট সংস্থা বা ব্যক্তি এই দুঃসহ কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত হয় বা থাকে, তবে তাও সরকারের জন্য একটা জঘন্য বিপদ। দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করাও সরকারের দৈনন্দিন কাজের একটা অংশ যা সরকার কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না।
উপায়ন্তর না দেখেই আমরা সরকারের কাছে আর্জি জানাই এই গুমের তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য যেই এই অপকর্ম করে থাকুক, হোক তা সরকারী কোন এজেন্সি বা বেসরকারি কোন সংস্থা বা ব্যক্তি, সার্বিকভাবে সরকারই একমাত্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত, জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে এর মুল কারন সহ ব্যক্তিকে উদ্ধারে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়ার।
সংবিধান অনুযায়ী বর্তমানে আমাদের দেশে একটা স্বাধীন বিচার বিভাগ আছে, যে কেওই সংক্ষুব্ধ হলে সে বিচার বিভাগের দারস্থ হতে কোন বাধা নাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হোল আজ পর্যন্ত গুম বিষয়ক কোন বিচার আদালতে হয়েছে কিনা আমি অন্তত জানি না। এ প্রসঙ্গে আমার একটা আপীল হোল, বিচার বিভাগ যদি মনে করে, গুম করা একটা নৈতিক গুরুতর অপরাধ, তবে কেন না বিচার বিভাগ স্বপ্রনোদিত (suo moto) হয়ে এর একটা বিহিত করবেন, এতে কি মনে হয় না “ডালমে কুচ কালা হ্যাঁয়” মানুষের আহাজারী আর আল্লাহ্ তা’লার মধ্যে কোন পর্দা নাই, এটা মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করতে হবে। মনে রাখতে হবে শেষেরও শেষ আছে। আল্লাহ্র পাকড়াও বেশ কঠিন। গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার মাত্রই জানা আবশ্যক কি অপরাধে সে গুম হওয়ার জন্য দায়ী। স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলাও কারও শাস্তি দান করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহ্ তা’আলার আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হন। আল্লাহ্ তা’আলা তাই বলেন, তিনি হলেন, আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্টতম বিচারক নন? (সুরা আত-তীন,আয়াত ৮) তা হলে আমরা কি ভাবে অপরাধ প্রকাশ না করে দোষী সাবস্ত করি? সরকারের এই গোপন মিশনের প্রযোজনীয়তা কি আসলে বিচার বহির্ভূত হত্যার দিকে নিয়ে যাচ্ছে না, ভাববার অবকাশ আছে।
আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন দুর্বল করে, আল্লাহ্ চান যে তিনি তোমাদের বোঝা হাল্কা করেন, আর মানুষকে দুর্বল ক’রে সৃষ্টি করা হয়েছে । (সুরা আন নিসা, আয়াত ২৮) এই দুর্বলতার কারনে তার অপরাধ, পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশী[2] মানুষ ও জীন জাতির চরিত্রের এই অংশ মজ্জাগত। বৃহৎ পরিসরে দুর্বল শব্দের অনেক আভিধানিক অর্থ হয়। হবেই হবে, সে জন্যই আল্লাহ্ তা’আলা কিছু অনুশাসনও দিয়েছেন, প্রত্যেক দেশে দেশে অপরাধ নিরসনে তাই সংবিধানে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আমরাও তার থেকে বাইরে না, প্রশ্ন হোল তবে কোন সংবিধানের আওতাও এই গুম করা হচ্ছে, যাদেরকে গুম করা হয়েছে, তাদের কৃত অপরাধ কি সংবিধানের শাস্তির আওতায় লিপিবদ্ধ নাই, নাকি সংবিধানে কোন নূতন ধারা আনতে হবে। বিষয়টা সরকার ও বিচার বিভাগের বিবেচনার জন্য পেশ করলাম।
সরকার বিরোধী ও রাষ্ট্র বিরোধী কর্মকাণ্ডকে একই অপরাধে অভিযুক্ত করা কোন ভাবেই সমীচীন না। আজকাল যা ঘটছে তার বেশীর ভাগই সরকার বিরোধী কার্যক্রম। তাই একে অপরাধ বলা আইনের ভাষায় কি হবে তা বিবেচনার দাবী রাখে। গণতন্ত্রের একটি সফল ফসল হোল সরকার বিপক্ষ শক্তি। আমাদের সরকারও তাই বলে থাকেন, বিরোধী দলের সমালোচনা সরকারের চলার পথকে সহজ করে দেয় এবং সরকারকে সঠিক পথের দিশা দেয়। অতএব বিরোধী পক্ষকে কোন ভাবেই তার বিরোধিতার জন্য সরকার শাস্তি দিতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে হচ্ছে তার উল্টো। এখানে স্বাধীন বিচার বিভাগ অবশ্যই তদারকি করতে প্রানান্ত চেষ্টা করতে হবে।
এমন কি অপরাধ করলে গুম করতে হবে তা আমাদের কারোই বোধগম্য হচ্ছে না। এতপ্রকার শাস্তি থাকতে এমনকি মৃত্যুদণ্ড বিধান চালু যেখানে বলবৎ আছে সেখানে কেন গুম হবে সাধারণ জনগণ? ইসলামও এই প্রকার শাস্তিকে একেবারেই নাকচ করে দেয়। আল্লাহ্ তা’আলা ও রাসুলের দেওয়া এমন কোন শরীয়া বিধান আজ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয় নাই যেখানে গুম করার কোন সুযোগ আছে।[i]
প্রত্যেকটা নিরপরাধ পরিবার মাত্রই উৎকণ্ঠায় দিনগুলি যাপন করছে, সরকারের এটাও ভাবা উচিত, গুমকৃত ব্যক্তিদেরকে দোষ প্রমান সাপেক্ষে বিচারিক আদালতে এনে শাস্তি নিশ্চিত করে পরিবারগুলোকে মানসিক অসস্থি থেকে রেহাই দেওয়ার বন্দোবস্ত করা সমীচীন বলে আমি মনে করি। আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন, আমিন।
[1] অধিকার ও ইসলামের দৃষ্টিতে গুম ও ক্রসফায়ার, ডঃ কাবিরুল ইসলাম
[2] তাফসীর আহসানুল বায়ান
[i] ভিডিও, ইসলামের দৃষ্টিতে গুম ও ক্রসফায়ার, ডঃ কাবিরুল ইসলাম
