কারণ ১: যিনি শরী‘আতের হুকুম বর্ণনায় ভুল করেছেন, ভিন্নমত পোষণকারী এই ব্যক্তির কাছে দলীল না পৌঁছা।
এই কারণটা ছাহাবীগণের পরবর্তী যুগের মানুষের মধ্যে কেবল সীমাবদ্ধ নয়; বরং ছাহাবী এবং তৎপরবর্তীগণের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। আমরা দুটো উদাহরণ পেশ করব- যা ছাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ঘটে গেছে।
প্রথম উদাহরণঃ- আমরা ছহীহ বুখারী এবং অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে বর্ণিত হাদীছ সম্পর্কে জানি যে, আমীরুল মুমিনীন ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন এবং পথিমধ্যে তাঁকে বলা হল, সেখানে মহামারী দেখা দিয়েছে, তখন তিনি থেমে গেলেন এবং ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করতে লাগলেন। তিনি মুহাজির ও আনছারগণের সাথে পরামর্শ করলেন এবং তাঁরা এ বিষয়ে ভিন্ন দুটো মত পোষণ করলেন। তবে ওখান থেকে ফিরে আসার অভিমতটাই ছিল বেশী অগ্রাধিকারযোগ্য। মতবিনিময় সভার এক পর্যায়ে আব্দুর রহমান ইবন আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু আসলেন- তিনি তাঁর কোন প্রয়োজনে অনুপস্থিত ছিলেন। অতঃপর বললেন, এ বিষয়ে আমার জ্ঞান রয়েছে, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ‘যখন তোমরা কোন এলাকায় মহামারীর কথা শুনবে, তখন সেখানে যাবে না। কিন্তু যদি তা তোমাদের সেখানে থাকা অবস্থায় দেখা দেয়, তাহলে সেখান থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে তোমরা বেরিয়ে যাবে না’।[1] বুঝা গেল, মুহাজির ও আনছারের বড় বড় ছাহাবীর রাযিয়াল্লাহু আনহুম এই হুকুম অজানা ছিল। অতঃপর আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু এসে তাঁদেরকে এই হাদীছটা সম্পর্কে খবর দিলেন।
দ্বিতীয় উদাহরণঃ- আলী ইবন আবু তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মতে, কোন গর্ভবতীর স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন অথবা বাচ্চা প্রসবের দিন- এই দুই সময়ের মধ্যে দীর্ঘতম সময় পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করবে। অতএব, যদি সে চার মাস দশ দিনের আগে বাচ্চা প্রসব করে, তাহলে তাঁদের নিকট তার ইদ্দত পালনের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। [অর্থাৎ বাচ্চা প্রসব সত্ত্বেও তাকে ইদ্দত পালন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা এক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন দীর্ঘতম সময়]। আর যদি বাচ্চা প্রসবের আগে চার মাস দশ দিন শেষ হয়ে যায়, তাহলে বাচ্চা প্রসব করা পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করতে থাকবে। [যেহেতু এক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসবের সময় হচ্ছে দীর্ঘতম সময়]। কেননা আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, ‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত’।[2]
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আর তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রীদেরকে রেখে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তাদের বিধবাগণ চার মাস দশ দিন প্রতীক্ষা করবে’।[3]
উভয় আয়াতের মধ্যে ‘আম খাছ ওয়াজহী’[4] عموم وخصوص وجهي-এর সম্পর্ক। আর এমন সম্পর্কযুক্ত দুই আয়াত বা হাদীছের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতি হল, এমনভাবে হুকুম গ্রহণ করতে হবে- যাতে উভয় আয়াত বা হাদীছের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। তবে তা করতে গেলে আলী ও ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর পদ্ধতি মেনে নেওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।
কিন্তু সুন্নাত এসবেরই ঊর্দ্ধে। ‘সুবায়আ আল-আসলামিইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, তিনি সুবায়আ তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার কয়েক দিন পরে প্রসূতি অবস্থায় পতিত হলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁকে আবার বিয়ে করার অনুমতি দেন’।[5] এর অর্থ এই যে, আমরা সূরা ত্বালাকের উক্ত আয়াতের অনুসরণ করব- যে সূরাকে ‘ছোট সূরা নিসা’ বলা হয়। আর এই আয়াতে আল্লাহর সাধারণ ঘোষণা হচ্ছে, ‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত’।[6]আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, যদি এই হাদীছ আলী ও ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা পর্যন্ত পৌঁছত, তাহলে তাঁরা নিশ্চয়ই তা মেনে নিতেন এবং নিজেদের মত ব্যক্ত করতে যেতেন না।
>
[1] . বুখারী, ‘চিকিৎসা’ অধ্যায়, হা/৫৭২৯; মুসলিম, ‘সালাম’ অধ্যায়, হা/২২১৯।
[2] . সূরা আত-ত্বালাক ৪।
[3] . সূরা আল-বাক্বারাহ ২৩৪।
[4] এটি উসূলে ফিক্বহ-এর একটা পরিভাষা। দুইটা আয়াত বা হাদীছের প্রত্যেকটাতে একই সময়ে একদিক বিবেচনায় ‘আম’ عام এবং অন্যদিক বিবেচনায় ‘খাছ’ خاص হুকুম পাওয়া গেলে তাকে ‘আম-খাছ ওয়াজহী’ বলে। আর যা দুই বা ততোধিক বস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাকে ‘আম’ عام বলে এবং যা দুই বা ততোধিক বস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করে না, তাকে ‘খাছ’ خاص বলে।
আম-খাছ ওয়াজহী-এর উদাহরণ:
মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আর তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রীদেরকে রেখে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তাদের বিধবাগণ চার মাস দশ দিন প্রতীক্ষা করবে’ [বাক্বারাহ ২৩৪]। অত্র আয়াত সবধরনের স্ত্রীর ক্ষেত্রে ‘আম’। সুতরাং গর্ভবতী মহিলা, গর্ভবতী নয় এমন মহিলা, বিয়ের পর সহবাস করা হয়েছে এমন মহিলা এবং সহবাস করা হয়নি এমন মহিলা সবাই এই আয়াতের আওতাভুক্ত হবে। এই দিক বিবেচনায় আয়াতটা ‘আম’। কিন্তু যে স্ত্রীর স্বামী মারা গেছে, তার ক্ষেত্রে আয়াতটা ‘খাছ’।
‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত’ [আত-ত্বালাক্ব ৪]। অত্র আয়াত তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা স্ত্রীর ক্ষেত্রে ‘আম’। কিন্তু গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে ‘খাছ’। সুতরাং প্রথম আয়াতের ‘আম’ হুকুম দ্বিতীয় আয়াতের ‘খাছ’ হুকুমের উপর এবং দ্বিতীয় আয়াতের ‘আম’ হুকুম প্রথম আয়াতের ‘খাছ’ হুকুমের উপর বহন করতে হবে। তখন অর্থ দাঁড়াবে, গর্ভবতী ব্যতীত স্বামী মারা গেছে এমন সব মহিলা চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে। আর গর্ভবতী মহিলা সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে।-অনুবাদক।
[5] . বুখারী, ‘তালাক্ব’ অধ্যায়, হা/৫৩১৮-৫৩২০; মুসলিম, ‘তালাক্ব’ অধ্যায়, হা/১৪৮৪।
[6] . সূরা আত-তালাক্ব ৪।
কারণ ২: হাদীছ তাঁর কাছে পৌঁছেছে, কিন্তু তিনি সেটার বর্ণনাকারীর উপর আস্থা স্থাপন করতে পারেন নি। বরং ঐ হাদীছকে তিনি সেটার চেয়ে শক্তিশালী হাদীছের বিরোধী মনে করেছেন। ফলে তার দৃষ্টিতে যেটা শক্তিশালী মনে হয়েছে, তিনি সেটাকেই গ্রহণ করেছেন।
এখন আমরা স্বয়ং ছাহাবীগণের মধ্যে ঘটে যাওয়া এমন একটা ঘটনা দিয়ে উদাহরণ পেশ করবঃ
ফাতিমা বিনতে ক্বায়স রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে তাঁর স্বামী তিন ত্বালাকের সর্বশেষ ত্বালাক দিয়ে দেন। অতঃপর তিনি তাঁর [ফাতিমার] নিকট তাঁর [ফাতিমার স্বামীর] প্রতিনিধির মাধ্যমে কিছু যব ইদ্দতকালীন সময়ে তাঁর খোরপোষ হিসাবে পাঠান। কিন্তু ফাতিমা বিনতে ক্বায়স রাযিয়াল্লাহু আনহা এতে ক্রোধান্বিত হন এবং তা নিতে অস্বীকার করেন। অতঃপর এক পর্যায়ে তাঁরা বিষয়টা নিয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যান এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম উক্ত মহিলাকে এ মর্মে খবর দেন যে, ‘তাঁর জন্য ভরণপোষণের কোন খরচ নেই এবং নেই কোন আবাসন ব্যবস্থা’।[1] কেননা তিনি [ফাতিমার স্বামী] তাঁর স্ত্রীকে ‘বায়েন ত্বালাক’[2] দিয়ে দিয়েছেন। আর বায়েন ত্বালাকপ্রাপ্তার ভরণপোষণ ও আবাসনের দায়িত্ব তার স্বামীর উপর থাকে না। তবে যদি ঐ মহিলা গর্ভবতী হয়, [তাহলে খোরপোষ ও আবাসন দুটোই দিতে হবে]।
এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের জন্য ব্যয় করবে’।[3]ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও জ্ঞানের কথা বলার অবকাশ নেই। অথচ তাঁর মত মানুষের এই সুন্নাতটা অজানা ছিল। সেজন্য ঐ মহিলার খোরপোষ ও আবাসনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন এবং ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা ভুলে গেছেন-এই সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তাঁর হাদীছ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মহিলার কথার উপর ভিত্তি করে আমরা কি আমাদের প্রতিপালকের কথা পরিত্যাগ করব- অথচ আমরা জানি না যে, তার মনে আছে নাকি ভুলে গেছে?’ আর একথার অর্থ এই যে, আমীরুল মুমিনীন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই দলীলের প্রতি আস্থাশীল হতে পারেন নি। এমন ঘটনা যেমন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু, অন্যান্য ছাহাবীবর্গ রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং তাবেঈন রহেমাহুমুল্লাহ-এর ক্ষেত্রে ঘটেছে, তেমনিভাবে তাবে‘ তাবেঈন রাযিয়াল্লাহু আনহুম-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এমনিভাবে আমাদের যুগেও অনুরূপ ঘটছে; বরং ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষ কোন কোন দলীলের বিশুদ্ধতার উপর এভাবে অনাস্থাশীল হতে থাকবে। বিদ্বানগণের কত অভিমতের পক্ষেই তো আমরা হাদীছ দেখতে পাই। কিন্তু কেউ কেউ সেই হাদীছকে ছহীহ জেনে ঐ অভমত গ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম থেকে ঐ হাদীছের বর্ণনার প্রতি আস্থাশীল না হয়ে উহাকে দুর্বল মনে করতঃ ঐ অভিমত গ্রহণ করেন না।
[1] . মুসলিম, ‘তালাক্ব’ অধ্যায়, হা/১৪৮০।
[2] ‘তালাক্ব বায়েন’ طلاق بائن দুই প্রকারঃ ১- ‘ছোট বায়েন তালাক্ব’ طلاق بائن بينونة صغرى: যে তালাক্বের পরে স্বামী তার স্ত্রীকে তার স্ত্রীর সম্মতিতে নতুন বিয়ে ও মোহরের মাধ্যমে আবার ফেরৎ নিতে পারে এবং অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে তালাক্বপ্রাপ্তা হওয়ার শর্ত না থাকে, তাকে ‘ছোট বায়েন তালাক’ طلاق بائن بينونة صغرى বলে। যেমনঃ এক বা দুই তালাক্ব দেওয়ার পর স্ত্রী ইদ্দত থেকে বের হয়ে গেলে। ২- ‘বড় বায়েন তালাক্ব’ طلاق بائن بينونة كبرى: যে তালাক্বের পরে স্বামী তার স্ত্রীর সম্মতি এবং নতুন বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে তাকে স্ত্রীকে ফেরৎ নিতে পারে না; বরং স্ত্রীর অন্য জায়গায় স্বাভাবিক বিয়ে হিল্লা বিয়ে নয় এবং উভয়ের সহবাস হতে হয়। অতঃপর বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটতে হয় এবং স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হয়, তাকে ‘বড় বায়েন তালাক্ব’ طلاق بائن بينونة كبرى বলে।–অনুবাদক।
[3]. সূরা আত-তালাক্ব ৬।
কারণ ৩: তাঁর কাছে হাদীছ পৌঁছেছে, কিন্তু তিনি তা ভুলে গেছেন। আর যিনি ভুলেন না তিনি তো মহান [আল্লাহ]।
কত মানুষ আছেন- যিনি হাদীছ ভুলে যান; এমনকি কখনও আয়াতও ভুলে যান। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম একদিন ছাহাবীগণ রাযিয়াল্লাহু আনহুম-কে নিয়ে নামায পড়েন এবং নামাযে তিনি ভুলক্রমে একটা আয়াত ছেড়ে দেন। তাঁর সাথে ছিলেন উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু। নামায শেষে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তুমি কি আমাকে আয়াতটা স্মরণ করিয়ে দিতে পারনি!’[1] অথচ তাঁর উপর অহী নাযিল হয়েছে এবং তাঁকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘অচিরেই আমি তোমাকে পাঠ করাবো। ফলে তুমি ভুলবে না। তবে আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন, তা ব্যতীত। নিশ্চয়ই তিনি প্রকাশ্য ও গুপ্ত বিষয় পরিজ্ঞাত আছেন’।[2]
আর হাদীছ পৌঁছার পর তা ভুলে যাওয়ার এই কারণটার উদাহরণসমূহের মধ্যে আম্মার ইবন ইয়াসির রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘটনা অন্যতম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁদের দু’জনকে কোন এক প্রয়োজনে পাঠালে তাঁরা উভয়েই নাপাক হয়ে যান। এরপর আম্মার গবেষণা করে দেখেন যে, মাটি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের মতই। ফলে তিনি মাটিতে গড়াগড়ি দেন- যেমনিভাবে পশু গড়াগড়ি দেয়। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল, সারা দেহে মাটি মাখিয়ে দেওয়া- যেমনিভাবে পানি মাখাতে হয়। এরপর তিনি নামায আদায় করেন। অপরদিকে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নামাযই আদায় করলেন না।…
অতঃপর তাঁরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসলে তিনি তাঁদেরকে সঠিক নিয়ম বলে দেন। আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তিনি বলেন, ‘দুই হাত দিয়ে এরকম করলেই তোমার জন্য যথেষ্ট হত’। [একথা বলে] তিনি তাঁর দুই হাত একবার মাটিতে মারলেন। অতঃপর বাম হাতকে ডান হাতের উপর বুলিয়ে উভয় হাতের তালু এবং মুখমণ্ডল মাসাহ করলেন। আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফতকালে এবং তারও আগে এই হাদীছটা বর্ণনা করতেন। ইতিমধ্যে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে একদিন ডেকে পাঠান এবং তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি এটা কি ধরনের হাদীছ বর্ণনা করছ? অতঃপর আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আপনার কি মনে পড়ে- রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে কোন এক প্রয়োজনে পাঠালে আমরা নাপাক হয়ে যাই। ফলে আপনি নামায আদায় করেছিলেন না; কিন্তু আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিয়েছিলাম।
এরপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, ‘দুই হাত দিয়ে এরকম করলেই তোমার জন্য যথেষ্ট ছিল’। কিন্তু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘটনাটা স্মরণ করতে পারলেন না; বরং বললেন, আল্লাহকে ভয় কর হে আম্মার! অতঃপর আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, আমার উপর আপনার অনুসরণ করা যেহেতু আল্লাহ আবশ্যক করে দিয়েছেন, সেহেতু আপনি যদি চান যে, এই হাদীছটা আমি আর বর্ণনা করব না, তাহলে তাই করব। তখন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, আমি যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছি, তোমাকেও সে দায়িত্ব অর্পণ করলাম’[3]। -অর্থাৎ তুমি এই হাদীছ মানুষকে বর্ণনা কর-। তাহলে দেখা গেল, ছোট অপবিত্র অবস্থায় যে তায়াম্মুম রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করেছেন, ঠিক ঐ একই তায়াম্মুম বীর্যস্খলন জনিত কারণে অপবিত্র অবস্থায়ও নির্ধারণ করেছেন- একথাটা ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভুলে গেছেন এবং তিনি এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষেই ছিলেন।
আর আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ও আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাঝে এ বিষয়ে বিতর্কও হয়েছে। বিতর্কে আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উদ্দেশ্যে বলা আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উক্তিটা পেশ করেন। তখন ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তুমি কি দেখনি যে, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কথায় পরিতুষ্ট হতে পারেননি? অতঃপর আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ঠিক আছে আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু এই আয়াত সম্পর্কে তুমি কি বলবে?-অর্থাৎ সূরা আল–মায়েদার আয়াত-।
জবাবে ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছুই বললেন না। যাহোক, নিঃসন্দেহে এখানে অধিকাংশ বিদ্বানের কথাই সঠিক-যারা বলছেন, বীর্যপাত জনিত কারণে অপবিত্র ব্যক্তি তায়াম্মুম করতে পারে-যেমনিভাবে ছোট নাপাকীর কারণে অপবিত্র ব্যক্তি তায়াম্মুম করতে পারে।এ ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ ভুলে যেতে পারে এবং শার‘ঈ কোন হুকুম তার কাছে অজানা থেকে যেতে পারে। ফলে সে যদি কিছু [ভুল] বলে, তাহলে সে ওযরগ্রস্ত হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি দলীল জানবে, সে তো ওযরগ্রস্ত হিসাবে পরিগণিত হবে না।
>
[1] . আবু দাঊদ, ‘ছালাত’ অধ্যায়, হা/৯০৭।
[2]. সূরা আল-আ’লা ৬-৭।
[3]. বুখারী, ‘তায়াম্মুম’ অধ্যায়, হা/৩৩৮, ৩৪৫, ৩৪৬; মুসলিম, ‘ঋতুস্রাব’ অধ্যায়, হা/৩৬৮।
