ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরেই সম্ভাব্য স্থল আক্রমণের পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যে দশ হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, কয়েক হজর মার্কিন নৌ ও মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর তথ্য মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক পোস্টে নিশ্চিত করেছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য স্থল আক্রমণের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্ব আরও এক জটিল সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ইসরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের বিপরীতে ইরানের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে লক্ষ্য করে ইয়েমেন থেকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের পক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করা এ গোষ্ঠী। এছাড়া ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে, ইরানের মতো সামরিক সক্ষমতায় হিজবুল্লাহ এবং হুথি গোষ্ঠী শক্তিশালী না হলেও তাদের কৌশলগত অবস্থান বিপাকে ফেলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে। একইসাথে ইরান, হুথি, হিজবুল্লাহ- তিন ফ্রন্ট থেকে ধেয়ে আসা মিসাইল ঠেকাতে আর কতদিন কার্যকর থাকবে ইসরায়েলের আয়রন ডোম, তা নিয়ে শঙ্কায় বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কার্যত বন্ধ রয়েছে ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালি, যা দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এবার হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব-এল-মান্দের নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে অবস্থিত এই নৌপথটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। ফলে হরমুজ প্রণালির মত বাব-এল-মান্দের যদি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে বিশ্বে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে তেলের দাম, যার আঁচ লাগছে ইউরোপ আমেরিকা সহ গোটা বিশ্বে।
প্রায় এক মাস ধরে চলা ইরান বনাম ইসরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধে কোন পক্ষ এগিয়ে রয়েছে, তা নিয়ে এখনও দ্বিধায় রয়েছে বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের সস্তা ড্রোন ও মিসাইল ঠেকাতে ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে ইসরায়েল-মার্কিন বাহিনী। ফলে খুব দ্রুত যদি ইন্টারসেপ্টর শেষ হয়ে যায়, তাহলে ইরানের হামলা ঠেকানোর মতো কোনো প্রযুক্তি হাতে থাকবে না। একইসাথে ইরানের পক্ষে হুথি বিদ্রোহীরা ছাড়াও লেবাননে হিজবুল্লাহ ও গাজায় হামাসের যুদ্ধে অংশগ্রহণ যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানকে এগিয়ে রাখছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এদিকে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে শত শত কোটি ডলার ক্ষতির মুখে যুক্তরাষ্ট্র। রণক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধকালীন বিশেষ ভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় হিসাব করলে যুদ্ধের ১৯ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক খরচ ২৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। একইসাথে ইরানে স্থল আক্রমণের পর যদি মার্কিন বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়, তাহলে বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাবে। ইতিমধ্যে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণে মার্কিনিদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে ক্রমশই ধোঁয়াশা তৈরি করে রেখেছে ইসরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের হামলার কারণে মার্কিনিদের ক্ষয়ক্ষতি মূলধারার মিডিয়াতে আসছে না। ফলে সামরিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের পাশাপাশি এক ধরণের তথ্যযুদ্ধ ও চলছে। তবে, যুদ্ধে জয়-পরাজয় ছাড়িয়ে প্রধান হয়ে উঠছে বিশ্বে জ্বালানি সংকট এবং তৃতীয় বিশ্বে এর প্রভাব। এদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এ সংঘাত মূলত ভূরাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের একটি প্রক্রিয়া। ফলে এ যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব হারাবে এবং নতুন কোনো শক্তির আবির্ভাব হবে।
