Wednesday, July 22, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

ইসলামী worldview – ১

আমি প্রচলিত ইংরেজী-বাংলা অভিধানে worldview শব্দটির অর্থ খুঁজতে চেষ্টা করেছি কিন্তু পাইনি। হয়তো এই ধারণাটা বাংলা ভাষায় বা সাহিত্যে খুব প্রচলিত নয়। ‘জীবনদর্শন’ শব্দটি হয়তো, worldview শব্দটির খুব কাছাকাছি একটা ভাব প্রকাশ করে। ‘বিশ্বদর্শন’ – মোটামুটিভাবে সমার্থক আরেকটি শব্দ হতে পারতো।মাইক্রোসফ্টের Encarta-র অভিধানে শব্দটির অর্থ বলা হয়েছে: view of all life: a comprehensive interpretation or image of the universe and humanity। সোজা বাংলায় পৃথিবীকে, এই মহাবিশ্বকে, মানবতাকে ও জীবনকে আপনি যে চোখে দেখেন সেটাই হচ্ছে আপনার worldview।ইসলামকে কেবল একটা worldview বলা যাবে না, কারণ, ইসলাম তার চেয়ে আরো অনেক বেশী বিস্তৃত ও ব্যাপ্ত একটা বিষয় – কেবল ধারণা বা দর্শনের ব্যাপার নয়, বরং স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ এক জীবন ব্যবস্থার নাম ইসলাম – দুনিয়াকেন্দ্রিক হলেও, যে জীবনব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে আখেরাতে ‘সফল’ মানুষ হবার মর্যাদা লাভ করা। ইসলামের জীবনব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ মনে করা ঈমানের এক মৌলিক দাবী। ইসলাম, জাহিলী আরবদের, আর সেই সঙ্গে অনাগত কালের সকল মানুষকেও – এক সম্পূর্ণ নতুন worldview উপহার দিয়েছিল, যা নবুয়তের ২৩ বছরে একটু একটু করে বিকশিত হয়ে রাসূল(সা.)-এঁর মৃত্যুর পূর্বেই পূর্ণতা লাভ করেছিল।

জাহিলি আরবরা নারীর সৌন্দর্য বা পূর্ব পুরুষদের মাহাত্ম্য বা নিজেদের বংশের গর্ব ভরা কাহিনী নিয়ে, আরবী ভাষার ঐতিহ্যবাহী সুনিপুণ কারুকাজ ব্যবহার করে কবিতা, কাসিদা বা গান রচনা করতো – অথচ, ইসলামী জীবনব্যবস্থা যখন evolve করছিলো, সেই ২৩ বছরের অধ্যায়ে পর্যায়ক্রমিক ভাবে তাদের বুঝিয়ে দেয়া হলো যে, ঐ সব বন্দনা কেবলই অর্থহীন কিছু প্রলাপ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে সাফল্যের কোন মাপকাঠিও নয়। আরো সহজে বললে, একদিকে ইসলাম বোঝালো যে সকল প্রশংসা কেবল আল্লাহরই – আমাদের যাকে তিনি যে নিয়ামত দিয়েছেন, তা একান্তভাবেই তাঁর করুণাপ্রসূত, এতে আমাদের অহংকার বোধ করার কোন কারণ নেই এবং আল্লাহর সামনে কারো কোন মাহাত্ম্য বা greatness থাকতে পারে না, তেমনি অপরদিকে ইসলাম এও বোঝালো যে, আপনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কবি হয়েও ঈমানবিহীন জীবনযাপন করে যদি মৃত্যুবরণ করেন, তবে আপনার চেয়ে ব্যর্থ ও দুর্ভাগা আর কেউ নেই – কারণ আপনার পরিণতি প্রায় নিশ্চিতভাবেই জাহান্নাম। আবার দেখুন, ইসলামপূর্বক আরবভূমিতে প্রবীণ বা বয়োজ্যেষ্ঠদের এক ধরনের অন্ধ সম্মান দেয়া হতো – ইসলামের worldview বিকশিত হতে হতে বোঝা গেল যে, সাধারণভাবে যেমন সকল মুসলিমকেই সম্মানের চোখে দেখতে হবে, এবং সেই হিসেবে সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে treat করা যাবে না সত্য (যেমনটা পশ্চিমারা করে থাকে) – বরং সদয় ব্যবহার করতে হবে – কিন্তু যে কোন অবস্থায় বয়স ব্যাপারটাই একটা যোগ্যতার মাপকাঠি হবে এমন কোন কথা নেই। সেজন্যই রাসূল(সা.)-এঁর আদেশে হযরত আবু বকর বা ওমর (রা.)-এঁর মত সাহাবীরা, ২০ বছর বয়স্ক সেনাপতি উসামা বিন জায়েদ (রা.)-এর অধীনে সেনা অভিযানে যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগে আগে। এরপর আসুন নেতৃত্বের প্রশ্নে – পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ বিশ্বাস হচ্ছে, পশুকুলের মতই, যার ভিতর ঔদ্ধত্য যত বেশী এবং যে যত বেশী মারমুখী বা aggressive, সে ব্যক্তিই নেতৃত্বের জন্য তত বেশী যোগ্য। ইতিহাসে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ অধিপতিরাই এগিয়ে গেছেন মতা দখল করতে – রোম সাম্রাজ্যের সিজারগণ বা মংগল তস্কর চেংগিজ খান ও হালাকু খান – যে কারো নেতৃত্বের বেলায়ই যোগ্যতার এই মাপকাঠিই প্রযোজ্য ছিল। ইসলামের বিকাশমান worldview এই ধারণাটাই বদলে দিল – রাসূল (সা.) বললেন যে, ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব এগিয়ে এসে যে চাইবে, সে তা পাবার যোগ্য নয় – ব্যস্ as simple as that। আরও বিবেচনা করুন: সম্মানিত কেউ ঘরে ঢুকলে, আমরা যে সমীহভরে ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যাই রাসূল (সা.) নিষেধ করলেন সাহাবীদের দাঁড়াতে – ব্যস্, বিলুপ্ত হলো আরেকটি জাহিলী আচার। এভাবে আমি উদাহরণের পর উদাহরণ দিয়ে যেতে পারবো এবং আপনি দেখবেন যে, কিভাবে ২৩ বছর যাবত জীবন ব্যবস্থা হিসেবে, দ্বীন হিসেবে, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতে করতে একটা অভূতপূর্ব worldview-এর জন্ম হলো – বলা যায় এক সম্পূর্ণ নতুন worldview আকৃতি ও প্রকৃতি লাভ করলো – অনেকেই যাকে পরবর্তীতে কুর’আনিক worldview হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকেন।

একটা worldview-এর জন্ম হয় একটা belief system-ঘিরে। একটা belief system- এ থাকে একগুচ্ছ বিশ্বাস – যার উপর ভিত্তি করে সেই belief system-এ বিশ্বাসীদের জীবনের ধরন এবং জীবনযাত্রা বাস্তবতা লাভ করে। ইসলামের যেমন রয়েছে সুনির্দিষ্ট একগুচ্ছ বিশ্বাস বা ‘আকীদা – যাকে আমরা দ্বীন ইসলামের belief system পারি – এবং সে সব বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই মুসলিমদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন এবং হ্যাঁ, অতি অবশ্যই এক ইসলামী worldview গড়ে উঠেছিল সপ্তম শতাব্দীর সেই সোনালী যুগে – ঠিক তেমনি কাফির, নাস্তিক বা মূর্তিপূজকদেরও রয়েছে সুনির্দিষ্ট belief system – যার উপর ভিত্তি করে তাদের worldview গঠিত হয়। এদিক থেকে বিচার করলে worldview-কে belief system-এর সরাসরি variable বা function বলা যায় – অর্থাৎ, সহজ কথায়, আপনার worldview কি হবে, তা সরাসরি নির্ভর করবে আপনি কি কি বিশ্বাস করেন তার উপর। আরেকভাবে বলতে গেলে – আপনি সত্যিই কি বিশ্বাস করেন, তার প্রতিফলন ঘটবে আপনার worldview-তে। উদাহরণস্বরূপ আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে, পরকাল সত্যি, শেষ বিচারের দিন সত্যি এবং আখেরাতের অনন্ত কালের তুলনায় পৃথিবীতে আপনার অবস্থান অস্থায়ী ও অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী – তাহলে আপনার সেই বিশ্বাস প্রতিফলিত হবে আপনার worldview-এ। আপনার worldview-তে যে কোন উপায়ে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার কোন কল্পচিত্র থাকবে না। কিন্তু আপনি যদি একজন অবিশ্বাসী কাফির হন – তবে আর যাই হোক, পরকালের ভয়ে আপনি যেমন কোন অন্যায় উপার্জন থেকে বিরত থাকবেন না, তেমনি আপনার বিশ্বাস মতে এই পৃথিবীর ‘এই একমাত্র’ জীবনের ‘ভোগ-সুখের’ পাত্র থেকে আকন্ঠ ও সম্ভাব্য সর্বাধিক পান করতে চেয়ে আপনার সম্পদের চাহিদারও অন্ত থাকবে না। আমার পেশাগত জীবন থেকে আমি আরেকটা সহজ উদাহরণ দিই। আমরা সমুদ্রগামী নাবিকরা যদি মনে করি যে, আমরা জাহাজ নিয়ে যুক্তরাজ্যের উপকূলে যাবো, তাহলে আমরা হাতের কাছে যুক্তরাজ্যের উপকূলের চার্ট* রাখবো – আবার যদি মনে করি যে, আমরা আলাস্কার উপকূলে যাবো তবে নিশ্চয়ই আলাস্কা উপকূলের চার্ট রাখবো! কিন্তু এমন যদি হয় যে, আমি আলাস্কা উপকূলের চার্ট সংগ্রহ করেছি, অথচ মুখে বলছি যে, আমি আসলে যুক্তরাজ্যে যেতে চাই – তাহলে ব্যাপারটা কি অসঙ্গত মনে হবে তাই না? এখানে যেমন আপনি যে গন্তব্যে যেতে চাইবেন সেই গন্তব্যেরই চার্ট যোগাড় করাটাই সুস্থ মস্তিষ্কের পরিচায়ক, জীবনের বেলায়ও আপনার belief system অনুযায়ীই আপনার worldview হবে সেটাই স্বাভাবিক – তা না হলে বুঝতে হবে কোথাও মারাত্মক কোন সমস্যা রয়েছে।

এই রচনার প্রস্তাবনায় আমরা তাহলে বলতে চাইছি যে, (জনমিতির তথ্য অনুযায়ী) পৃথিবীর ১৩০ কোটিরও বেশী মুসলিমের অত্যন্ত ক্ষুদ্র যে অংশটি আমরা আজ ইসলামের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখি, তারা যদি মনে করি যে, ইসলামী belief system বা আকীদাহর সাথে পশ্চিমা তথা বস্তুবাদী কাফিরদের worldview গ্রহণযোগ্য বা compatible, তাহলে আমাদের স্বপ্ন-সাধও উপর্যুক্ত উদাহরণের মতই হাস্যকর ও অসঙ্গত বলতে হবে। এখানেই ইসলামের পুনর্জাগরণকামী অনেক বিশ্বমানের চিন্তাবিদদের চিন্তা শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়েছে। জলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে আমরা এখানে কয়েকজন চিন্তাবিদের চিন্তার করুণ পরিণতির উদাহরণ উপস্থাপন করবো – যাদের প্রত্যেকের চিন্তার বিশ্বস্ততা বা ইখলাস নিয়ে আমার অন্তত ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোন সন্দেহ বা সংশয় নেই।

Footnote*:জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত এক বিশেষ ধরনের মানচিত্র।

SourceICD

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eleven − 9 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য