জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সদ্যসমাপ্ত বাংলাদেশ সফর অত্যন্ত সময়োপযোগী, আশাজাগানিয়া। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য অনেকটা পথের দিশা দিয়েছে তার সফর। গুতেরেস পর্তুগালের দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। জাতিসংঘেরও তিনি মহাসচিব দুই মেয়াদে। ফলে তিনি একজন ঝানু কূটনীতিকও। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং রোহিঙ্গা সংকট-দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি প্রকারান্তরে ব্যাপকভিত্তিক সমাধানের কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের উদারভাবে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তাই সফরটি অত্যন্ত ইতিবাচক।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে জাতিসংঘ মহাসচিব এই সফর করেছেন। ১৩ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত সফরকালে তিনি কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাজার হাজার রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেছেন। ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সিভিল সোসাইটি ও তরুণ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনেও বক্তৃতা করেন। চার দিনের সফর পর্যবেক্ষণ করলে এ কথা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের জনগণের অন্তর্নিহিত প্রত্যাশার প্রতিধ্বনিই তিনি করেছেন।
অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সফরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অবশ্যই অভ্যন্তরীণ অংশীদাররাই নিয়ামক। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব কয়েকটা বিষয়ের প্রতি জোর দিয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা টেকসই গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং সুন্দর একটি দেশ। জনগণের এই প্রত্যাশা খুবই ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই উত্তরণে সহায়তায় প্রস্তুত। এক্ষেত্রে সংলাপ এবং জনগণের ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায়ও জাতিসংঘ পাশে থাকতে প্রস্তুত। এসবের উদ্দেশ্য হলো, একটা টেকসই এবং বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব এটাও মনে করেন যে, বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও বাংলাদেশের পাশে থাকার বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব জোর দিয়েছেন। ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, আমাদের দায়িত্ব হলো ন্যায়ভিত্তিক, টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করা। ডায়ালগের মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া সম্পাদনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জাতিসংঘ মহাসচিব আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন। তার এই কার্যক্রম যুক্তিসঙ্গত এবং ইতিবাচক।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে এম হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা সংকটের দিকটিও সামনে নিয়ে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর রোহিঙ্গাদের খাদ্য সংকট প্রকট হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বিষয়টি খুবই ইতিবাচক। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোকেও তিনি সমর্থন করেছেন। মিয়ানমারকেও এই বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করার প্রতি তিনি জোর দিয়েছেন।
তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের এবারের সফরকে সময়োপযোগী এবং আশা জাগানিয়া হিসাবে অভিহিত করেছেন।
আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান যুগান্তরকে বলেছেন, জাতিসংঘ মহাসচিব ভালো বার্তা দিয়ে গেলেন। রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন। তাদের ফেরানোর ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় চেষ্টায় কোনো ফল পাওয়ার আশা নেই। এখন জাতিসংঘই শেষ ভরসা। রোহিঙ্গা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে। সেখান থেকেও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। এটা একটা ভালো দিক। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি স্বীকৃতি হিসাবেও এই সফরকে দেখা যায়। যদিও গুতেরেস ২০২৬ সালে অবসরে যাবেন। তবুও এই সফরটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি কূটনৈতিক সফলতা।
মাহবুব উজ জামান আরও বলেন, বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণে জাতিসংঘ সহায়তা করবে। এটাও ইতিবাচক তবে এই উত্তরণের সব আয়োজন বাংলাদেশ সরকারকেই করতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট দৃষ্টির বাইরে চলে গিয়েছিল। মানবিক সাহায্য সিংহভাগ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ইউএসএআইডি সহায়তা বন্ধে বিপন্ন মানবতা সংকটে পড়বে। শরণার্থীদের স্বাগতিক দেশ পড়বে মহাবিপদে। এই বার্তাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বকে দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। দ্বিতীয় বার্তা হলো, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে জাতিসংঘ সহায়তা দিতে প্রস্তুত। দুটি বার্তাই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।
এদিকে চার দিনের সফর শেষে রোববার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা ত্যাগ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান। ঢাকা ত্যাগের আগে জাতিসংঘ মহাসচিব প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং বিদায়ি শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
