“ডিপ স্টেট” — শব্দটা আজকাল খুব শুনি। কেউ বলে গল্প, কেউ বলে ষড়যন্ত্র। কিন্তু আসল ব্যাপারটা বুঝতে হলে একটা কথা দিয়ে শুরু করি — যেটা কোনো ইউটিউবার বলেনি, বলেছিলেন খোদ আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট।
সাল ১৯৬১।
বিদায়ী ভাষণ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার — যিনি নিজে ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ সেনাপতি। ক্ষমতা ছাড়ার আগে তিনি দেশবাসীকে একটা সতর্কবার্তা দিয়ে গেলেন।
তিনি বললেন — একটা “সামরিক-শিল্প জোট” তৈরি হয়েছে, সেনাবাহিনী আর অস্ত্র-ব্যবসায়ীদের এক বিশাল আঁতাত। এর প্রভাব এখন প্রতিটা শহরে, প্রতিটা সরকারি অফিসে। আর তিনি সাবধান করলেন — “সতর্ক থাকো, যেন এই অন্যায় প্রভাব গণতন্ত্রকে গিলে না ফেলে।”
ভাবুন একবার। যে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ, যিনি নিজে সেনাপ্রধান ছিলেন — তিনিই বলছেন, একটা অদৃশ্য শক্তি ক্ষমতার আসল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে।
এটাই “ডিপ স্টেট”-এর আসল ধারণা।
সহজ করে বলি। আপনি আন্দোলন করেন, অভ্যুত্থান করেন, ভোট দেন, সরকার বদলান। প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট বদলান।
কিন্তু কিছু জিনিস কখনো বদলায় না — আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা, বড় করপোরেশন, অস্ত্র-ব্যবসায়ী, কিছু প্রভাবশালী পরিবার।
নির্বাচিত সরকার আসে-যায়, কিন্তু এই অনির্বাচিত স্থায়ী কাঠামোটা রয়ে যায়। আর অনেক সময় আসল নীতিটা তারাই ঠিক করে — পর্দার আড়াল থেকে।
এটা কোনো কল্পনা না। ইতিহাসে এর প্রমাণ ভরা।
সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ — ইরাক যুদ্ধ।
২০০৩ সালে গোটা বিশ্বকে বলা হলো, সাদ্দাম হোসেনের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে, যা গোটা দুনিয়ার জন্য হুমকি। আমেরিকা যুদ্ধ শুরু করল। একটা আস্ত দেশ গুঁড়িয়ে গেল, লাখো মানুষ মারা গেল, একটা প্রজন্ম এতিম হলো।
তারপর? বছরের পর বছর খুঁজেও একটা অস্ত্রও পাওয়া গেল না। পুরো অজুহাতটাই ছিল মিথ্যা।
এখন আসল প্রশ্ন — এই যুদ্ধে লাভটা কার হলো?
প্রথমত, অস্ত্র-নির্মাতারা। যুদ্ধ মানে বোমা, মিসাইল, ট্যাংক — বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্ডার। যত যুদ্ধ, তত বিক্রি।
দ্বিতীয়ত, তেল কোম্পানিগুলো। ইরাক বিশ্বের অন্যতম বড় তেলভাণ্ডার। যুদ্ধের পর সেই তেলের নিয়ন্ত্রণ গেল পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর হাতে।
তৃতীয়ত, যুদ্ধের ঠিকাদাররা। সৈন্যদের খাবার থেকে শুরু করে ধ্বংস হওয়া শহর পুনর্নির্মাণ — সব কন্ট্রাক্ট গেল নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির কাছে, যাদের সাথে ক্ষমতাসীনদের গভীর সম্পর্ক।
দেখুন প্যাটার্নটা। একটা মিথ্যা অজুহাতে যুদ্ধ হলো, সাধারণ মানুষ মরল, আর মুনাফা গেল ঠিক তাদের পকেটে — অস্ত্র, তেল, ঠিকাদারি। ঠিক যাদের কথা আইজেনহাওয়ার ৪০ বছর আগেই বলে গিয়েছিলেন।
আরেকটা প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ দেই— ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক ধস।
আমেরিকার বড় বড় ব্যাংক লোভে অন্ধ হয়ে মানুষকে এমন ঋণ দিল, যা তারা কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। একসময় পুরো ব্যবস্থাটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। কোটি কোটি সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি হারাল, চাকরি হারাল, সঞ্চয় হারাল।
আর যে ব্যাংকগুলো এই সর্বনাশ ঘটাল? সরকার জনগণের করের টাকা ঢেলে তাদের বাঁচিয়ে দিল। যারা ডোবাল, তারাই বেঁচে গেল, এমনকি বোনাস নিল। আর যারা কিছুই করেনি, সেই সাধারণ মানুষই সব হারাল।
সাধারণ মানুষ রক্ত দিল, ক্ষতিগ্রস্ত হলো আর দিনশেষে লাভবান হলো “কাঠামো”।
এটাই চিরন্তন সূত্র।
এই খেলাটা শুধু বিদেশে না। আমাদের দেশেও দেখতে পাই।
আমরা আন্দোলন করি, জীবন দিই, রক্ত দিই। একজন জালিম শাসককে হটাই। মনে করি, এবার সব বদলে যাবে।
২৪-এর জুলাই আমরা দেখেছি। কত তাজা প্রাণ ঝরে গেল, কত মায়ের কোল খালি হলো। একজন স্বৈরশাসক দেশ ছেড়ে পালাল। আমরা ভাবলাম — এবার মুক্তি।
কিন্তু একটু গভীরে দেখুন। শাসক পালিয়েছে, কিন্তু যে কাঠামোটা তাকে টিকিয়ে রেখেছিল — সেই আমলাতন্ত্র, সেই সুবিধাভোগী শ্রেণি, সেই দুর্নীতির জাল, সেই “সিস্টেম” — সেটা কি বদলেছে?
কুরআনে ফিরআউনের কথা বারবার এসেছে। কিন্তু খেয়াল করেছেন কি? ফিরআউন একা ছিল না। তার সাথে ছিল হামান — তার ক্ষমতার কাঠামো, তার প্রশাসন। আর ছিল কারূন — সম্পদের প্রতীক, যে টাকার জোরে অহংকারী হয়েছিল।
ক্ষমতা, প্রশাসন, আর সম্পদ — এই তিনটা মিলে একটা জালিম কাঠামো তৈরি করেছিল, যারা একজন আরেকজনকে টিকিয়ে রাখত। আল্লাহ এই তিনজনের নাম আলাদা করে বলেছেন, কারণ এটাই জুলুমের চিরন্তন প্যাটার্ন।
মুখ বদলায়। চেয়ারের মানুষটা বদলায়। কিন্তু চেয়ারের নিচের কাঠামোটা প্রায়ই একই থেকে যায়।
এটাই সবচেয়ে কঠিন সত্য। একজন জালিমকে সরানো তুলনামূলক সহজ। কিন্তু যে কাঠামোটা জালিম তৈরি করে, বারবার তৈরি করে — সেটা বদলানোই আসল লড়াই।
তাহলে আমরা কী করব? হাত গুটিয়ে বসে থাকব?
না। প্রথম কাজটা আইজেনহাওয়ার নিজেই বলে গেছেন — সচেতনতা। তিনি বলেছিলেন, একমাত্র সজাগ ও জ্ঞানী নাগরিকরাই এই অন্যায় প্রভাবকে ঠেকাতে পারে।
তাই প্রশ্ন করতে শিখুন। যে খবর দেখানো হয় — কার লাভ? যে যুদ্ধের ঢাক পেটানো হয় — কে অস্ত্র বেচছে? যে “সংকট” তৈরি হয় — কে সমাধান বেচে লাভ তুলছে? কিন্তু এত কিছুর পরেও এখানে একটা গভীর প্রশ্ন থেকে যায়।
থামুন, একটু ভাবুন।
আমরা তো বারবার সচেতন হয়েছি। বারবার আন্দোলন করেছি, শাসক বদলেছি, বিপ্লব করেছি। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, আমাদের নিজেদের জুলাই অভ্যুত্থান।
এতকিছুর পরেও তবু কেন প্রতিবার ঘুরেফিরে সেই একই কাঠামো ফিরে আসে? সেই ক্ষমতার লোভ, সেই সম্পদের কেন্দ্রীকরণ, সেই জনগণের ঘাড়ে জুলুম?
কারণটা কি শুধু খারাপ মানুষ? নাকি সমস্যাটা আরও গভীরে — খোদ ব্যবস্থাটার ভেতরে?
একটু ভাবুন। যে ব্যবস্থায় টাকাই সর্বোচ্চ, ক্ষমতাই শেষ কথা, আর জবাবদিহি শুধু মানুষের বানানো আইনের কাছে — সেই আইন যাদের হাতে, তারাই তো নিজেদের সুবিধায় বদলে ফেলতে পারে।
মানুষের বানানো ব্যবস্থায় মানুষই আইন বানায়, আর ক্ষমতাবানরাই সেই আইন কেনে। এটাই তো চক্রটা।
তাহলে এমন কোনো ব্যবস্থা কি আছে, যেখানে আইনের উৎসটাই মানুষের ঊর্ধ্বে? যেখানে শাসক আর প্রজা, ধনী আর গরিব — সবাই একই আইনের অধীন, আর সেই আইন কেউ টাকা দিয়ে কিনতে পারে না?
যেখানে সম্পদ গুটিকয়েকের হাতে জমতে পারে না, কারণ যাকাত-উত্তরাধিকারের বিধান দিয়ে তা বণ্টন বাধ্যতামূলক? যেখানে শাসকও জবাবদিহি করে এমন একজনের কাছে, যাঁকে ঘুষ দেওয়া যায় না, ফাঁকি দেওয়া যায় না — স্বয়ং আল্লাহর কাছে?
আমি উত্তরটা চাপিয়ে দিচ্ছি না। শুধু প্রশ্নটা রেখে যাচ্ছি।
চৌদ্দশ বছর আগে একটা ব্যবস্থা এসেছিল, যেখানে খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাধারণ একজন মানুষ ভরা মজলিসে প্রশ্ন করতে পারত — “তোমার চাদরটা বাকিদের চেয়ে বড় কেন?” আর খলিফাকে জবাব দিতে হতো।
যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে একজন সাধারণ ইহুদি নাগরিক আদালতে মামলা করে জিততে পারত।
এটা কোনো রূপকথা না, এটা ইতিহাস সত্য ঘটনা।
সেই জবাবদিহি, সেই ন্যায়, সেই ক্ষমতার লাগাম — এগুলো কোথা থেকে এসেছিল? মানুষের বানানো সিস্টেম থেকে, নাকি এমন এক বিধান থেকে, যা মানুষের লোভের ঊর্ধ্বে?
ভেবে দেখার দায়িত্ব আপনার।
আল্লাহ আমাদের চোখ খোলা রাখার, প্রশ্ন করার সাহস, আর সত্যকে সত্য বলে চেনার তাওফিক দিন।
কারণ অন্ধ মানুষকে যেদিকে খুশি চালানো যায়। আর সচেতন মানুষকে ঠকানো সবচেয়ে কঠিন।
আমীন
© Abu MuHammad Rafiuzzaman
