পদ্মা সেতু দিয়ে শিগগিরই নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হবে। তবে বাণিজ্যিকভাবে চলাচলের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সেতুর টোল নিয়ে জটিলতা না কাটায় ট্রেনের ভাড়াও নির্ধারিত হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল মঙ্গলবার মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্ত থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশেষ উদ্বোধনী ট্রেনে চড়ে এই পথে চলাচল উদ্বোধন করবেন।
ট্রেনটি প্রধানমন্ত্রীসহ যাত্রীদের নিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা জংশন পর্যন্ত যাবে।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অধীন ঢাকার কমলাপুর থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত আপাতত ট্রেন চলবে। প্রকল্পের এই পথের দৈর্ঘ্য ৮২ কিলোমিটার। ঢাকার এই ট্রেন পরে ভাঙ্গা থেকে রাজবাড়ী হয়ে রাজশাহী ও খুলনায় যাবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্র বলছে, বর্তমানে ঢাকা-খুলনা পথে চলাচলকারী সুন্দরবন এক্সপ্রেস নিয়মিত পথ থেকে সরিয়ে এনে পদ্মা সেতু দিয়ে চালানো হবে। একইভাবে ঢাকা-বেনাপোল পথে চলাচলকারী বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের পথও পরিবর্তন করা হচ্ছে। অর্থাৎ রাজশাহী, বেনাপোল ও খুলনার পথে তিনটি ট্রেন চলবে পদ্মা সেতু হয়ে। পথ নতুন হলেও তিনটি ট্রেনই পুরনো।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসান বলেন, ট্রেন তিনটি পুরনো হলেও এতে নতুন কোচ (বগি) যুক্ত করা হচ্ছে। সুন্দরবন এক্সপ্রেসের প্রায় সব কোচই নতুন। চাহিদা বুঝে এবং প্রকল্পের পুরো পথ চালু হলে নতুন ট্রেনও যুক্ত করা হবে।
রাজশাহী থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করত মধুমতী এক্সপ্রেস। ট্রেনটি ভাঙ্গা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় আসবে।
এতে ঢাকা-রাজশাহী পথে পুরনো ট্রেন নতুন করে যুক্ত হবে।
২০০৩ সালে সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু হয়। এখন নিয়মিত সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে কমলাপুর থেকে ট্রেনটি ছেড়ে যায়। খুলনায় পৌঁছে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে। বুধবার সপ্তাহিক ছুটি। এটি কমলাপুর থেকে ছেড়ে ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন হয়ে জয়দেবপুর-মৌচাক-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব প্রান্ত হয়ে খুলনায় যায়।
ঢাকা থেকে যশোর হয়ে বেনাপোল পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করে বেনাপোল এক্সপ্রেস। এটি প্রতিদিন রাত ১১টা ১৫ মিনিটে কমলাপুর থেকে ছেড়ে যায়। বৃহস্পতিবার এটি বন্ধ থাকে। এই ট্রেনও পদ্মা সেতু হয়ে চলাচল করবে। তবে নতুন পথে ভাঙ্গার পর পুরনো ট্রেন দুটি কোন কোন স্টেশনে বিরতি নেবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
রাজশাহী থেকে ফরিদপুরের গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত চলাচল করে মধুমতী এক্সপ্রেস ট্রেন। পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু হলে ভাঙ্গা হয়ে ঢাকা পর্যন্ত আসবে মধুমতী এক্সপ্রেস। বৃহস্পতিবার এই ট্রেনে যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকে। ফরিদপুর থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ট্রেনটি চলাচল করে। নতুন পথে এর পুরনো স্টেশনগুলোই থাকবে। শুধু ঢাকার কমলাপুর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত নতুন করে যুক্ত হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সরদার শাহাদাত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো ট্রেনের সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ঢাকার সঙ্গে আগে থেকে চলাচলকারী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচি একই থাকতে পারে। আবার পরিবর্তনও হতে পারে। কমলাপুর রেলস্টেশন সূত্র বলছে, আগামী ১ নভেম্বর তিন ট্রেনের নতুন সময়সূচি তারা হাতে পাবে।
যুক্ত হবে আরো পথ
পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রেলপথ শেষ পর্যন্ত আরো ছয়টি রেলপথের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রাথমিক ভাবনায় রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, যশোরের বেনাপোল, খুলনা, রাজশাহীর ট্রেন এই পথে চালানোর চিন্তা আছে। ভবিষ্যতে ভারতে যাওয়ার মৈত্রী ট্রেনও এই পথ ব্যবহার করবে।
রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চালালে রেলকে লোকসান গুনতে হবে। তাই এই রেলপথ ব্যবহার করে অন্তত রাজবাড়ীর সঙ্গে ঢাকাকে যুক্ত করা হবে। বর্তমানে খুলনা, দর্শনা, বেনাপোল ও রাজশাহীর সঙ্গে ঢাকার সরাসরি রেল যোগাযোগ রয়েছে। পদ্মা সেতু ব্যবহার করে এসব অঞ্চলে নতুন ট্রেন গেলে বিদ্যমান পথে মাঝের স্টেশনগুলোর যাত্রীরা রেলের সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এমন একটি আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, হুট করে সব ট্রেন সরিয়ে দেওয়া হবে না। প্রথম দিকে বিদ্যমান রুটেও ট্রেন চলবে। হয়তো সংখ্যা কমিয়ে নিয়ে নতুন রুটে যুক্ত করা হবে। এতে বিদ্যমান রুটে চাপ কমবে। ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখতে সুবিধা হবে। নতুন পথে নতুন রেলযাত্রী তৈরি হবে।
টোলের কারণে ভাড়া নির্ধারণে জটিলতা
এই পথে ট্রেনের বাণিজ্যিক চলাচলে সময় লাগবে অন্তত দুই সপ্তাহ। কিন্তু সেতুর টোল নিয়ে জটিলতার কারণে এখনই ভাড়া চূড়ান্ত করতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে তিন ধরনের ভাড়ার প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে।
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের অধীন মূল সেতুতে রেলের অবকাঠামো নির্মাণে ছয় হাজার ২৫২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ট্যারিফ (টোল) হিসেবে এই টাকা আগামী ৩৫ বছরে তুলে আনতে চায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। সেতুর প্রস্তাব অনুযায়ী, ধাপে ধাপে প্রতিবছর টোলের পরিমাণ বাড়বে। প্রথম বছর টোল দিতে হবে ১০৬ কোটি টাকা। এক বছরে সর্বোচ্চ দিতে হবে প্রায় ২৫১ কোটি টাকা।
রেলের মহাপরিচালক কামরুল আহসান জানান, টোলের বিষয়ে বিবিএর সঙ্গে আলোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অবকাঠামো ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক মনে করেন, টোলের অঙ্ক ট্রেনের টিকিটের দামে প্রভাব ফেলবে। প্রথম কয়েক বছর টোলে ছাড় দেওয়া গেলে ভালো হয়। শুরু থেকে বিশাল অঙ্কের টোল দিতে হলে রেলের লোকসানের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে।
৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মীয়মাণ পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৮ হাজার ২১০ কোটি ১১ লাখ টাকা দিচ্ছে সরকার। বাকি ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
