বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘ দিন ধরে কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়ে আছে। তবে শ্রমিকের চাহিদা পূরণে বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে ফেডারেল গভর্নমেন্টের (ইউএই) মৌখিক অনুমতিতে দুবাই কর্তৃপক্ষ ভিজিট ভিসায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিচ্ছে। তবে এ ব্যবস্থাপনায় দুবাই যাওয়ার পর বিভিন্ন সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি অনেককে লিবিয়ায় পাচার করে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ফেডারেল গভর্নমেন্টের (ইউএই) মৌখিক অনুমতি পাওয়ার পর প্রতিদিন দেশটিতে যাওয়ার জন্য বহির্গমন ছাড়পত্র নিতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বহির্গমন শাখায় রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের প্রতিনিধিরা লাইন ধরে ফাইল জমা দিচ্ছেন। যাচাই-বাছাই শেষে পরিচালক (বহির্গমন) কোনো এজেন্সির ফাইলে অনুমোদন দিচ্ছেন, আবার কোনো এজেন্সির ফাইলে পুনরায় তথ্য চেয়ে ফেরত পাঠাচ্ছেন। বর্তমানে ভিজিট ভিসায় দুবাইগামী ১০ সহস্রাধিক কর্মীর আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
আল ইসলাম ওভারসিসের স্বত্বাধিকারী ও অভিবাসন বিশ্লেষক জয়নাল আবেদিন জাফর গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, নিয়ম হচ্ছে দুবাইগামী কর্মীদের নামে দুবাই কনসাল জেনারেল অফিস থেকে কোম্পানিতে চাকরি, বেতন থাকা-খাওয়াসহ সব সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা আছে কি না সেটি নিশ্চিত হয়ে সত্যায়ন করা। এখন আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যে কোম্পানির নামে কর্মীর চাহিদা আনছে, সেই কোম্পানির নামে কনসাল জেনারেল অফিসের সত্যায়ন আছে কি না সেটি দেখার দায়িত্ব জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোর সংশ্লিষ্ট দফতরের। এই নিয়ম মেনে না পাঠালে সেটি অবৈধ।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মূলত বাংলাদেশ থেকে যে প্রক্রিয়ায় দুবাইতে কর্মী যাচ্ছে তাতে কিন্তু ইউএই সরকারের (সাতটি প্রদেশ মিলিয়ে ফেডারেল সরকার) লিখিত অনুমোদন নেই। এটা শুধু দুবাইয়ের স্টেট ল গভর্নমেন্টের সিদ্ধান্তে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এভাবে কর্মী পাঠানো আসলে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে সেটি সময়ই বলে দেবে। এ অবস্থায় যারা দেশটিতে যাচ্ছে তারা চুক্তি মোতাবেক চাকরি পাচ্ছে কি না সেটি দুবাইয়ের বাংলাদেশ কনসাল জেনারেল অফিস থেকে মনিটরিং হওয়া উচিত।
অপর একজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নাম না প্রকাশের শর্তে গতকাল দুপুরে নয়া দিগন্তকে বলেন, ভিজিট ভিসায় বিমানবন্দর দিয়ে বডি কন্ট্রাকেও কিন্তু অনেকে দুবাইয়ে পাড়ি জমাচ্ছে। তারা ভিজিট ভিসার নামে দুবাই গিয়ে আসলে চাকরি করছে, নাকি সেখান থেকে দালালের খপ্পরে পড়ে অন্য কোনো দেশে চলে যাচ্ছে সেটিও সুষ্ঠু অভিবাসনের স্বার্থে আমাদের ইউএইর বাংলাদেশ দূতাবাস এবং দুবাইয়ের কনসাল জেনারেল অফিসের শ্রম কাউন্সেলর দফতরের নজরে থাকা উচিত।
দুবাইয়ের নামকরা কোম্পানিতে ভিজিট ভিসায় কর্মী পাঠানোর সাথে সম্পৃক্ত ঢাকার দৈনিক বাংলা মোড়ের একজন জনশক্তি ব্যবসায়ী গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, দুবাইয়ে আমরা যেসব কর্মী পাঠাচ্ছি তাদের প্রত্যেকের জন্য দুবাই কনসাল জেনারেল অফিস থেকে সত্যায়ন নিয়ে তারপরই পাঠাচ্ছি। সত্যায়িত করার আগে নারী শ্রম কাউন্সেলরের দফতরের লোকজন গিয়ে কোম্পানি ভিজিট করে চাকরি, বেতন, থাকা-খাওয়াসহ সবকিছু নিশ্চিত হচ্ছেন। ওই সব কোম্পানিতে যাওয়ার তিন দিনের মধ্যে সেটি কর্মসংস্থান ভিসায় রিপ্লেস হয়ে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ এবং দুবাইয়ে একশ্রেণীর লোক আছে তারা সিন্ডিকেট করে সেখানে নামমাত্র কোম্পানি খুলে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিচ্ছে। এদের মাধ্যমে যাওয়া কর্মীরাই বেশি প্রতারিত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। এসব বিষয় আমাদের মন্ত্রণালয় থেকেই মনিটরিং হওয়া উচিত।
এয়ারপোর্ট দিয়ে যারা ভিজিট ভিসায় যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় যারা যাচ্ছে তারা তো আরো বেশি সমস্যায় পড়ছে। তাদের না আছে কোনো বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স, না আছে দুবাই কোম্পানির কোনো অনুমতি। আমাদের দুবাই কাউন্সিল অফিসেও তাদের রেকর্ড নেই। এই পথে না যাওয়াই উত্তম বলে তিনি মনে করেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ইউএই সরকার কর্মসংস্থান ভিসা বন্ধ করে রেখেছে অনেক দিন ধরে। এতে দুবাইয়ের স্টেট (প্রাদেশিক) সরকার অনেকটা বিপাকে পড়ে যায়। দুবাইয়ের বড় বড় কোম্পানি কর্মী সঙ্কটের কারণে বন্ধ হওয়ার পথে। ফেডারেল গভর্নমেন্টকে তারা এ সমস্যার কথা লিখিত আকারে জানালে ওই কর্তৃপক্ষ তাদেরকে কিছুদিনের জন্য ভিজিট ভিসায় কর্মী নেয়ার জন্য মৌখিক অনুমতি প্রদান করে। এর পর থেকেই ভিজিট ভিসায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়। এটি ইদানীং বেড়েছে। লক্ষাধিক শ্রমিক এই প্রক্রিয়ায় চলে গেছে। বর্তমানে দুবাই যেতে একজন কর্মীর জন্য দুই লাখ টাকার বেশি নিচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা।
গত সোমবার সন্ধ্যার পর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো: শহিদুল আলমের সাথে যোগাযোগ করে দুবাইয়ের ভিজিট ভিসায় ব্যুরো থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়া ও কর্মী যাওয়ার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি একটি মিটিংয়ে রয়েছেন বলে জানান। তবে এ ব্যাপারে অপর একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিএমইটির ডিজি বলেছেন, ভিজিট ভিসায় যারা বিএমইটি’র অনুমোদন নিয়ে যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সির একটা দায়বদ্ধতা থাকছে। দুবাই গিয়ে চাকরি না পেলে টাকা ফেরত দিতে তারা চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
এর আগে লিবিয়া থেকে দিদারুল আলম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ভিজিট ভিসায় যেসব কর্মী দুবাই আসছে তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে দুবাই থেকে লিবিয়ার বেনগাজির উদ্দেশে অন্য ফ্লাইটে উঠছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়া। সিন্ডিকেটের দেয়া প্রলোভনে এই পথে পা দিয়ে এখন অনেকেই সাগরপথে পাড়ি দেয়ার সময় লিবিয়ার যৌথবাহিনীর হাতে আটক হয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক থেকে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এসব সিন্ডিকেটের আস্তানা গড়ে উঠেছে ঢাকার ফকিরাপুল, নয়াপল্টন, দৈনিক বাংলা, পল্টন, মতিঝিল, গুলশান-১ ও ২, বনানী, উত্তরা ও ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উল্টো পাশের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে। তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
