আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যেমন গতিশীল ও সহজ করেছে, তেমন তা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও নানা সংকট তৈরি করছে। বিশেষত শিশুদের ভিডিও গেমস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। তাঁরা বলছেন, ভিডিও গেমস আসক্তি কোমলমতি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমনকি কিছু কিছু ভিডিও গেমস তাদের ভেতর আত্মহত্যা ও অপরাধ প্রবণতা তৈরি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্লু হোয়েল, পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের নাম বহুল আলোচিত।
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি ছাড়াও শিশুরা নৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষতিরও মুখোমুখি হচ্ছে। নিম্নে এমন কিছু নৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষতির দিক তুলে ধরা হলো—
১. বিশ্বাস নষ্ট : বিভিন্ন ভিডিও গেমসে দেখা যায় উদ্ভট ও বিকৃত আকৃতির ‘প্রকৃতি’কে ধর্মীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন—স্রষ্টা, নবী-রাসুল ও সাহাবিদের চরিত্র অন্তর্ভুক্ত করা। অথচ এ বিষয়ে ইসলামের কঠোর বিধি-নিষেধ রয়েছে। কেননা সাধারণভাবে ইসলামে জীবের চিত্রায়ণ নিষিদ্ধ। আর নবী-রাসুলদের চিত্রায়ণ করা আরো গুরুতর পাপ। এ ছাড়া কোনো কিছুকে স্রষ্টা, দেবতা ও উপাস্য হিসেবে উপস্থাপন করা শিরক। আর আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরক করার পাপ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে সে এক মহাপাপ করে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৪৮)
২. শালীনতাবোধ লোপ : বেশির ভাগ ভিডিও গেমসে অশালীন ও খোলামেলা পোশাকের নারীদের ছবি ও আকৃতি ব্যবহার করা হয়, শৈশব থেকে শিশুরা যা থেকে অভ্যস্ত হলে তাদের ভেতর শালীনতা ও রুচিবোধ নষ্ট হবে। ধীরে ধীরে তারা আরো বেশি চরিত্রবিধ্বংসী কিছুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘লজ্জা-শালীনতা ঈমানের অঙ্গ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, আয়াত : ৫৮)
৩. সহনশীলতা লোপ : শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। তারা যা দেখে তাই অনুকরণ করে এবং নিজ জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করে। জনপ্রিয় ভিডিও গেমগুলোর বেশির ভাগ সহিংস। সেখানে হত্যা ও আঘাতের মতো বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার দেখানো হয়। আর ইসলাম মানুষকে সহনশীল হওয়ার নির্দেশ দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘দয়াময়ের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তারা বলে, সালাম’ (সুরা ফোরকান, আয়াত : ৬৩)
৪. শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা : ভিডিও গেমস ও ইন্টারনেটে আসক্ত শিশুরা অবসর সময়ে ঘরে অবস্থান করে এবং শারীরিক বিকাশে সহায়ক খেলাধুলা থেকে দূরে থাকে, যা তাদের শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ইসলাম শিশুর শারীরিক সুস্থতার জন্য সহায়ক খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করে। আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আবদুল্লাহ, উবায়দুল্লাহ ও বনু আব্বাসের অন্য শিশুদের কাতারবদ্ধ করে বলতেন, যে আমার কাছে আগে পৌঁছাবে তার জন্য এই এই পুরস্কার আছে। তারা পরস্পর প্রতিযোগিতা করে তাঁর দিকে ছুটে আসত, তাঁর বুকে ও পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তিনি তাদের আদর করতেন এবং জড়িয়ে ধরতেন।’ (মুসনাদে আহমদ : ৩/৩৩৫)
৫. শৃঙ্খলা নষ্ট : ভিডিও গেমসের প্রতি আসক্তি শিশুদের সময় ও শৃঙ্খলার ব্যাপারে উদাসীন করে তোলে। তাদের জীবনে লেখাপড়া, খাওয়া ও ঘুম কোনো কিছুর শৃঙ্খলা থাকে না। শৃঙ্খলাহীন জীবন তাদের লেখাপড়াকেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং শরীর ও মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ইসলাম মানুষ সময়ানুবর্তী হওয়ার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দা সামনে পা বাড়াতে পারবে না যতক্ষণ না তাকে জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে যে তা কোথায় ব্যয় করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৭)
৬. অর্থের অপচয় : দিন দিন ভিডিও গেমসে অর্থের বিনিময় বাড়ছে। শিশুরা অর্থ দিয়ে ‘গোল্ড’ ও ‘ডায়মন্ড’ কিনে গেমস খেলছে। আবার অর্থ বাজি রেখেও খেলছে কেউ কেউ। যা অর্থ অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জুয়ার প্রতি আসক্ত করে তুলতে পারে। আর আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। ইরশাদ হয়েছে, ‘অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)
আল্লাহ তাআলা আগামী প্রজন্মকে সব ধরনের ক্ষতিকর আসক্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
