রাস্তা বা পথ হলো একটুকরা ভূমিবিশেষ, যা দুই বা ততোধিক স্থানের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে। সাধারণত রাস্তায় সহজে মালামাল পরিবহন, লোক চলাচল বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। গাছ, নালা-নর্দমা, পাহাড়-পর্বত যথাক্রমে কর্তন, ভরাট, সুড়ঙ্গ তৈরি বা মধ্যস্থল আরো সমান্তরাল করে রাস্তার উপযোগী করা হয়।
রাস্তা-ঘাট মানব সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাস্তা আল্লাহর অমূল্য নিয়ামত। এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য বিচরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, তোমরা জমিনে ভ্রমণ করে অতঃপর প্রত্যক্ষ করো, কিভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন! তারপর আল্লাহ সৃষ্টি করবেন পরবর্তী সৃষ্টি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২০)
ইতিহাস থেকে জানা যায়, হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ যাতায়াতের জন্য পাকা রাস্তা তৈরি করেছিল। মিসরে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ পাকা রাস্তা নির্মিত হয়েছে, যা খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ২২০০ সালের মধ্যে। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে মধ্যপ্রাচ্যের উর শহরে পাথর সহযোগে নির্মিত পাকা রাজপথের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রাচীন ভারতবর্ষে ইটের তৈরি রাস্তা বানানো হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালে।
প্রথম দারিয়াস কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালে ব্যয়বহুল রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল, যা পারস্য (ইরান) দেশে অবস্থিত। এ রাস্তার নামকরণ হয়েছিল ‘রয়েল রোড’ নামে, যা ওই সময়ের সবচেয়ে সুন্দর মহাসড়কের মর্যাদা পেয়েছিল। রোমান সাম্রাজ্য পরবর্তীকালেও রাস্তাটির ব্যবহার হয়েছিল।
রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা আছে। তিনি রাস্তার সর্বনিম্ন প্রস্থ সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছেন। বর্তমান যুগেও সেই নির্দেশনা অনুসরণ করা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রাস্তা সাত হাত পরিমাণ চওড়া করো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৩৮)
এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে রাস্তা তৈরি করতে গেলে তার প্রস্থ সাত হাত নির্ধারণ করা ফরজ। যৌথ রাস্তা করার ক্ষেত্রে শরিকদের সিদ্ধান্তক্রমে এর প্রস্থ কম-বেশিও হতে পারে। কিন্তু শরিকদের মধ্যে কোনো খালি জায়গায় এর প্রস্থ নির্ধারণে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয় এবং কোনো শরিক যদি সেখানে বাড়ি তৈরি করতে চায়, তাহলে তার উচিত, সাত হাত রাস্তা হিসাব করে রাস্তার জন্য তার অংশের জমি রেখে বাড়ি করা। রাসুল (সা.)-এর যুগেও এভাবে ফায়সালা করা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, যখন মালিকরা রাস্তার ব্যাপারে পরস্পরে বিবাদ করল, তখন নবী (সা.) রাস্তার জন্য সাত হাত জমি ছেড়ে দেওয়ার ফয়সালা দেন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৭৩)
ওই হাদিসে রাসুল (সা.) একটি আধুনিক রাস্তার সর্বনিম্ন প্রস্থ সাত হাত নির্ধারণ করেছেন, যা ফুটের হিসাবে চিন্তা করলে ১০ ফুট ৬ ইঞ্চি হয়। বর্তমান যুগে একটি গ্রামীণ রাস্তার সর্বনিম্ন প্রস্থ ১০ ফুট পাকা হিসাব করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের এলজিইডি বিভাগের ‘রোড ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডস ২০০৪’-এর ৬.১ ধারা অনুযায়ী ইউনিয়ন সড়কগুলো সর্বনিম্ন ৩ মিটার বা ১০ ফুট প্রশস্ত হয়।
১০ ফুট পিচ ঢালাইয়ের দুই পাশে আবার ৩ ইঞ্চি করে মোট ৬ ইঞ্চি ইটের এইজিং দেওয়া হয়, যা রাস্তার পাকা অংশের সঙ্গে হিসাব করলে ১০ ফুট ৬ ইঞ্জিই দাঁড়ায়। সুবহানাল্লাহ! যানবাহনের উন্নতির পাশাপাশি একসময় হয়তো গ্রামীণ রাস্তার এই মানদণ্ড পরিবর্তনও করা লাগতে পারে; কিন্তু মানুষের বাড়ির রাস্তার জন্য সর্বনিম্ন সাত হাত জায়গা নির্ধারণ একটি আদর্শ মানদণ্ড। বাড়িতে ব্যক্তিগত বা অতিথির গাড়ির যাতায়াত, জানাজার খাটিয়া বহনসহ আরো বিষয় সহজে সমাধান করার জন্য কমপক্ষে সাত হাত চওড়া রাস্তা হওয়া সব সময়ের দাবি, যা মহানবী (সা.) দেড় হাজার বছর আগেই আমাদের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
