মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত লাখো মানুষকে ক্ষুধার আরও কাছাকাছি ঠেলে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি।
সংস্থাটি বলেছে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে অর্থায়ন ঘাটতির কারণে সহায়তা সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
শুক্রবার (৫ জুন) এক বিবৃতিতে ডব্লিউএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে আমেরিকা-ইসরাইলের যৌথ হামলার পর উপসাগর থেকে লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হয়। এতে হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে বিঘ্ন ঘটে। ফলে জাহাজগুলোকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
ডব্লিউএফপি জানায়, গত মার্চে সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছিল, জুন পর্যন্ত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি থাকলে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। সংস্থাটির মতে, সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। কারণ মার্চের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের দাম ওই মাত্রার ওপরে রয়েছে।
আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও শ্রীলঙ্কার পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে। জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যে বিঘ্নের কারণে এসব দেশের পরিবারগুলো ক্রমেই বেশি চাপের মুখে পড়ছে।
ডব্লিউএফপি বলেছে, ২০২৬ সালে সোমালিয়ায় ৬৫ লাখ মানুষ ভয়াবহ ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। একই সময়ে আফগানিস্তানে ১ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সরবরাহ বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এতে আরও ২৫ লাখ সোমালি এবং ২৩ লাখ আফগান খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। আফগানিস্তান ও সোমালিয়া, উভয় দেশই আমদানি করা জ্বালানি ও খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন সহায়তা সংস্থাগুলো গভীর অর্থায়ন ঘাটতির মুখে রয়েছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তারা বিশ্বজুড়ে ১৫ লাখ মানুষকে কম সহায়তা দিতে পারবে বলে ধারণা করছে। আর পরিস্থিতি ছয় মাস ধরে অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা ৯০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
সোমালিয়ায় ৫ বছরের কম বয়সী মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের মজুত জুলাই মাসের শুরুতেই শেষ হয়ে যেতে পারে। কারণ দেশটিতে ডব্লিউএফপি ৮৯ শতাংশ অর্থায়ন ঘাটতির মুখে রয়েছে।
ডব্লিউএফপির খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি বিশ্লেষণ সেবার পরিচালক জাঁ-মার্টিন বাওয়ার বলেন, “আমাদের খাদ্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিতরণের জন্য খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে না। আর এর প্রভাব যাদের ওপর পড়বে, তারা হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শিশু।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যার কারণেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। ভারত মহাসাগরে নৌপরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় কমসংখ্যক জাহাজ সোমালিয়ায় থামছে।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, সংস্থাটির কিছু খাদ্য মজুত ওমানের সালালাহ বন্দরে আটকে আছে। এতে জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে বড় ধরনের বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া জেট জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় জাতিসংঘের মানবিক বিমান সেবার পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। দুর্গম এলাকায় নিরাপদে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় এই বিমান সেবা।
আফগানিস্তানেও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সহায়তা পরিবহনের ব্যয় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ট্রাকগুলোকে বিকল্প করিডর ব্যবহার করতে হওয়ায় সহায়তা পৌঁছানোর সময় ১০ দিন থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ৭৫ দিন পর্যন্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএফপি।
সূত্র: আরিয়ানা নিউজ
