Monday, June 1, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়ারামাযানে একজন মুমিনের মৌলিক কর্মসূচি

রামাযানে একজন মুমিনের মৌলিক কর্মসূচি

সূচনা : হাজারো কল্যাণ ও মুক্তির সওগাত নিয়ে বছর ঘুরে আবারও আমাদের অতি নিকটে চলে এসেছে মাহে রামাযান। শা‘বানের শেষ প্রহরে এসে আমরা এই দু‘আ করছি, ‘দয়াময়! আমাদেরকে সুস্থভাবে রামাযানের কল্যাণ লাভের তাওফীক্ব দাও’। প্রকৃতপক্ষে রামাযান মাস পাওয়া একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষ দয়া ও নেয়ামত। আলোচ্য প্রবন্ধে রামাযানে একজন মুমিনের কী কর্মসূচি হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে কিছু আলোকপাত করা হলো।

(১) দিনে ছিয়ামপালনকরা : রামাযানের প্রথম ও প্রধান কর্মসূচি হলো ছিয়াম পালন করা। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও মুক্বীম মুসলিম নর-নারীকে ফরয ছিয়াম রাখতেই হবে। মহান আল্লাহ বলেন,﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বন কর’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৩)। আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘যে ব্যক্তি ঈমানসহ ছওয়াবের আশায় রামাযানে ছিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে’।[1]

(২) রাতে ক্বিয়ামকরাতথাতারাবীহপড়া : রামাযান মাসে রাতে তারাবীহ পড়ার মাধ্যমে আমরা বহু নেকীর অধিকারী হতে পারি। আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, مَنْ قَامَهُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘যে ব্যক্তি ঈমানসহ ছওয়াবের আশায় রামাযানে তারাবীহ পড়বে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে’।[2]

(৩) দান-ছাদাক্বাকরা : রামাযান মাসে বেশি বেশি দান-ছাদাক্বা করা উচিত। রাসূলুল্লাহ a রামাযান মাসে বেশি বেশি দান করতেন। হাদীছে এসেছে, ইবনু আব্বাস c বলেন,أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ ‘নবী করীম a ধনসম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। আর রামাযানে জিবরীল e যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তিনি আরও অধিক দান করতেন’।[3]

(৪) কুরআন পড়া : রামাযান কুরআনের মাস। আল্লাহ বলেন,﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ﴾ ‘রামাযান মাস, যে মাসে বিশ্বমানবের জন্য পথ-প্রদর্শন এবং সুপথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং হক্ব ও বাতিলের প্রভেদকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৪)। তাই আসুন! কুরআনের মাসে বেশি বেশি কুরআন পড়ি। ইবনু উমার h বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,الصِّيَامُ وَالْقُرْاٰنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ، يَقُوْلُ الصِّيَامُ : أَيْ رَبِّ! إِنِّىْ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ، فَشَفِّعْنِىْ فِيهِ، وَيَقُولُ الْقُرْاٰنُ : مَنَعْتُهُ النُّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِىْ فِيهِ، فَيُشَفَّعَانِ ‘ছিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য শাফাআত করবে। ছিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা দিয়েছি। অতএব, তার ব্যাপারে এখন আমার শাফাআত কবুল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব, তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে’।[4]

(৫) আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা : রামাযান ক্ষমার মাস। তাই রামাযান মাসে একজন মুমিনের অন্যতম কর্মসূচি হবে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করার মাধ্যমে পাপমুক্ত হওয়া। আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ دَخَلَ عَلَيْهِ رَمَضَانُ ثُمَّ انْسَلَخَ قَبْلَ أَنْ يُغْفَرَ لَهُ ‘ভূলুষ্ঠিত হোক তার নাক, যার নিকট রামাযান মাস এলো অথচ তার গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার পূর্বেই তা পার হয়ে গেল’।[5]

(৬) বেশি বেশিনেকআমলকরা : রামাযানে বেশি বেশি নেক আমল করা উচিত। কেননা রামাযানে আমলের ছওয়াব অগণিত। আমরা অনেকেই বলি, রামাযানে একটি সুন্নাত একটি ফরযের সমান আর একটি ফরয ৭০টি ফরযের সমান। আসলে এটি ভুল ধারণা। এই মর্মে হাদীছটি মুনকার/বাতিল।[6] প্রকৃতপক্ষে রামাযান মাসে আমলের ছওয়াব এত বেশি যে, ফেরেশতারা নয়; বরং এর প্রতিদান আল্লাহ নিজেই দেন।[7]

(৭) পাপ কাজথেকেবিরতথাকা : রামাযান মাসে আমাদের সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। হাদীছে এসেছে, আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকতে পারল না, তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করাতে আল্লাহর কিছু আসে যায় না’।[8]

(৮) বেশি বেশিদু‘আকরা : রামাযানে বেশি বেশি দু‘আ করা উচিত। আমাদের অনেকে শুধু ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে দু‘আ করে, অন্য সময় দু‘আ করে না। আসলে ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে দু‘আ কবুল করা হয় এই মর্মে হাদীছটি দুর্বল।[9] তাই শুধু ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে নই, বরং ছিয়াম অবস্থায় সারা দিন দু‘আ কবুল করা হয়। আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَات لَا شَكَّ فِيهِنَّ: دَعْوَةُ الصَّائِمِ، وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ ‘তিন ব্যক্তির দু‘আ কবুল করা হয়— ১. ছওম পালনকারী ব্যক্তির, ২. মুসাফির ব্যক্তির এবং ৩. মাযলূম ব্যক্তির’।[10]

(৯) ইফতারকরানো : রামাযানের কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম কর্মসূচি হলো অন্যজনকে ইফতার করানো। হাদীছে এসেছে, যায়েদ ইবনু খালেদ আল-জুহানী c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لاَ يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا ‘কোনো ছিয়াম পালনকারীকে যে লোক ইফতার করায় সে লোকের জন্যও ছিয়াম পালনকারীর সমপরিমাণ ছওয়াব রয়েছে। কিন্তু এর ফলে ছিয়াম পালনকারীর ছওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না’।[11]

(১০)শেষদশরাতে বেশি বেশি ইবাদত করা : রামাযানের সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হলো শেষ দশ রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা। আয়েশা g বলেন,كَانَ رَسُولُ اللَّهِ  يَجْتَهِدُ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِي غَيْرِهَا ‘রামাযানের শেষ দশ দিন রাসূলুল্লাহ a (ইবাদতে) এত বেশি সাধনা করতেন যে, অন্য কোনো সময়ে এরকম সাধনা করতেন না’।[12] এর উদ্দেশ্য হলো যাতে করে ক্বদরের রাত্রিটি ছুটে না যায়। কেননা রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,إِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الْخَيْرَ كُلَّهُ وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا مَحْرُومٌ ‘তোমাদের নিকট এ মাস সমুপস্থিত। এতে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হলো, সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। কেবল বঞ্চিত ব্যক্তিরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়’।[13] তাই আমাদের প্রত্যেককে শেষ দশ রাতে বেশি বেশি ইবাদতে জোর দিতে হবে, যাতে করে কোনোভাবেই ক্বদরের রাতটি ছুটে না যায়। আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘যে ব্যক্তি লায়লাতুল ক্বদরে ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে’।[14]

উপসংহার : পরিশেষে আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে রামাযান মাসের মর্যাদা রক্ষা করে তার যথাযথ হক্ব আদায় করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮, ১৮০২, ১৯১০, ২০১৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৬০; মিশকাত, হা/১৯৫৮।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০৮।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯০২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩০৮; মিশকাত, হা/২০৯৮।

[4]. মুসতাদরাক হাকেম, হা/২০৩৬; শুআবুল ঈমান, হা/১৮৩৯; মিশকাত, হা/১৯৬৩।

[5]. তিরমিযী, হা/৩৫৪৫, হদীছ হাসান ছহীহ; মিশকাত, হা/৯২৭।

[6]. যঈফ আত-তারগীব, হা/৫৮৯; ইবনু খুযায়মা, হা/১৮৮৭; শুআবুল ঈমান, হা/৩৩৩৬, আলবানী p বলেন, হাদীছটি মুনকার বা বাতিল। কারণ এর সনদে আলী ইবনু যায়েদ ইবনু জাদআন একজন দুর্বল রাবী; মিশকাত, হা/১৯৬৫।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫১; নাসাঈ, হা/২২১৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৬৩৮; মিশকাত, হা/১৯৫৯।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৩; ইবনু মাজাহ, হা/১৬৮৯; আবূ দাঊদ, হা/২৩৬২।

[9]. যঈফ ইবনু মাজাহ, হা/১৭৫৩।

[10]. আবুল ঈমান, হা/৩৩২৩; সিলসিলা ছহীহা, হা/১৭৯৭।

[11]. ইবনু মাজাহ, হা/১৭৪৬; তিরমিযী, হা/৮০৭, হাদীছ ছহীহ।

[12].ছহীহ মুসলিম, হা/১১৭৫; তিরমিযী, হা/৭৯৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৬৭; মিশকাত, হা/২০৮৯।

[13]. ইবনু মাজাহ, হা/১৬৪৪, হাদীছ হাসান; মিশকাত, হা/১৯৬৪।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮, ১৮০২, ১৯১০, ২০১৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৬০; মিশকাত, হা/১৯৫৮।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 − five =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য