শাপলার অর্থ কী? শাপলাকে দু’ ভাবে দেখা যায়। শাপলাকে শাহবাগের বিরুদ্ধে হেফাযতে ইসলাম কিংবা বাংলাদেশের ‘রক্ষণশীল’ জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। এটা একটা দৃষ্টিভঙ্গি। তবে শাপলাকে আমি নিছক হেফাজতে ইসলাম বা ১৩ দফার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করি না। আমার কাছে শাপলা কোনো একক ঘটনা নয়, কোনো সংগঠনের নির্দিষ্ট কর্মসূচি না।
শাপলা এক চেতনার নাম, এক আকাঙ্ক্ষার নাম, এক সভ্যতা নির্মাণের স্বপ্ন। শাপলা হল কুফরি নিযামের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মুসলিম কওমের প্রতিরোধের ঐতিহাসিক এবং আদর্শিক বহিঃপ্রকাশ। শাপলা হল আল্লাহর হাবীব, আমাদের সাইয়্যিদ, রাহমাতুললিল আলামীন (ﷺ)-এর শানের জন্য নিজেকে কুরবানী করার জুনুন। শাপলার শেকড় মদীনায়, বাস্তবায়নের ক্ষেত্র বাঙ্গালাহ। শাপলার আকাঙ্ক্ষা ইসলামী হুকুমাত, আল্লাহর যমীনে আল্লাহর বিধান কায়েম। শাপলা হল তাওহিদি ভিত্তিতে সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণের সংকল্প।
এই কওম ও যমীনের ইতিহাসে বারবার এই চেতনার উত্থান ঘটেছে, বারবার তা আত্মপ্রকাশ করেছে নানা রূপে। কখনো শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তার জাগরণে, কখনো তরীকায়ে মুহাম্মাদিয়ার দ্রোহ আর বিপ্লবে, কখনো তিতুমীরের বাশেরকেল্লায়, কখনো হাজী শরীয়াতুল্লাহর সামাজিক আন্দোলন। এই চেতনা মূর্ত হয়েছে ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধে সাদিকপুরী উলামার নেতৃত্বে চলা দশকব্যাপী লড়াই-সংগ্রাম-কুরবানীতে, ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহে, উলামায়ে দেওবন্দের আন্দোলনে। এই চেতনা প্রকাশিত হয়েছে মাওলানা মওদুদী, ডা ইসরার আহমেদ এবং মাওলানা আব্দুররহীমদের প্রকল্পে। এই চেতনা আলোকিত করেছে শাইখুল হাদীস, মুফতি আমিনী, আর আল্লামা শফির বিক্ষোভ ও প্রতিবাদকে। রাহিমাহুমুল্লাহু আজমাইন।
এই চেতনা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে, কখনো শক্তি নিয়ে, কখনো খণ্ডিত হয়ে, কখনো সীমাবদ্ধতা ও ভুলত্রুটি নিয়ে, কখনো আহত, মূমুর্ষু হয়ে। কিন্তু শত শত বছরের উত্থানপতনে এই চেতনা কখনো মরেনি। হাজারো প্রতিকূলতা পাড় হয়ে, শত পাহাড় ঠেলে, বদর, উহুদ, হিত্তিন, আইন যালুত পেড়িয়ে মতিঝিলে এসে শাপলার এই চেতনা ঘোষণা দিয়ে গেছে: লাব্বাইক! ইয়া আল্লাহ, লাব্বাইক!
শাপলা কেবল শাহবাগের অ্যান্টিথিসিস না। কেবল রিয়্যাকশানারি আন্দোলন না। শাপলা হল ফিরিঙ্গিদের চাপিয়ে দেয়া সেক্যুলার শৃঙ্খল ভেঙ্গে তাওহিদি সভ্যতা নির্মানের ডাক—যেখানে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—প্রতিটি স্তর তাওহিদের ভিত্তিতে বিন্যস্ত হবে। যেখানে সমাজের ভিত্তি হবে নৈতিকতা, শাসনের ভিত্তি হবে ওয়াহী, আইনের উৎস হবে আল্লাহর বিধান, যেখানে সমাজ তার মূল্যবোধ নির্ধারণ করবে ইসলামের আলোকে।
শাপলা কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের প্রকল্প নয়, কোনো একদিনের আন্দোলনও নয়। যতোদিন এই কওমের মধ্যে তাওহিদি চেতনা থাকবে, যতোদিন ঈমানের সম্পদ এই বঙ্গের মানুষ বুকে আকড়ে রাখবে, ততোদিন শাপলা ফিরে ফিরে আসবে। কখনো মক্তব-মাদ্রাসা থেকে, কখনো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, কখনো গ্রামের ভেজা মাটি থেকে, কখনো কংক্রিটের জঙ্গলের ভেতর থেকে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাত থেকে হাতে মশাল বদলাবে, শাপলা টিকে থাকবে। আর তাওহিদের অনুসারীরা বঙ্গের বুকে খুঁটি গেড়ে বলে যাবে:
লাব্বাইক! ইয়া আল্লাহ লাব্বাইক।
শাপলার সংগ্রাম চলবে, যতদিন না আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম হয়। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহর ওয়াদা সত্য।
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا ۚ وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে আর সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফাত দান করবেন যেমন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে তিনি খিলাফাত দান করেছিলেন এবং তাদের জন্য তিনি সেই দীনকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা দান করবেন, যে দীনকে তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তারা যে ভয়-ভীতির মধ্যে আছে, তার পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে। আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। এরপরও যারা অকৃতজ্ঞতা করবে, তারাই অবাধ্য সাব্যস্ত হবে। [সূরা আন-নূর, ৫৫]
