সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মে বড় পরিবর্তন আসছে । নবম জাতীয় বেতনকাঠামোয় সব গ্রেডে প্রায় সমান হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার পদ্ধতি থেকে সরে আসছে সরকার । এবার বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণে গ্রেডের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে আয় , জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্তরভেদে চাকরিজীবীদের বাস্তব চাহিদা । এ কারণে নতুন কাঠামোয় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা – কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেতে যাচ্ছেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় – সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে । এদিকে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের
নতুন বেতনকাঠামো
» প্রথম গ্রেডের বেতন কমতে পারে ১০,০০০ টাকা । » সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ব্যবধান কমানোর ভাবনা ।
জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় তোলার ব্যবস্থা নিতে অর্থ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । বর্তমান নিয়মে সরকারি কর্মচারীদের
» প্রথম ধাপে মিলবে মূল বেতন , কার্যকর ১ জুলাই থেকে । » ভাতা – সুবিধা কার্যকর হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে ।
বেতনকাঠামোর সব গ্রেডেই গড়ে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয় । তবে নতুন বেতনকাঠামোর খসড়ায় শুধু ৬ ষ্ঠ থেকে ২০ তম গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক
সরকারি চাকরিতে ইনক্রিমেন্ট হার সমান থাকছে না
বেতন বৃদ্ধি মূল বেতনের ৫ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে । পঞ্চম গ্রেডে এ হার ৪ শতাংশ , তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ রয়েছে । আর প্রথম গ্রেডের বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হবে । আলাদাভাবে । দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে , বেতন বৃদ্ধির নিয়মে এ পরিবর্তনের উদ্যোগের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের এ বিষয়ক একটি বিস্তৃত জরিপ । এতে অংশ নেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকরিজীবী , ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩ টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান । জরিপে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বর্তমান বেতন বৃদ্ধির পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন । বিপরীতে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির হার সমন্বয়ের পক্ষে মত দেন । ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভিত্তি করে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের সুপারিশ করেন । একই সঙ্গে আবার ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ ১১ তম থেকে ২০ তম গ্রেডের বেতন আরও বেশি বাড়ানোর পক্ষে । পৃথক আরেকটি অনলাইন জরিপেও বর্তমান বেতনকাঠামো নিয়ে অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে । এতে অংশ নেন ৪ হাজার ১৪৩ জন । তাঁদের মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ১৮ শতাংশ মনে করেন , বর্তমান বেতন প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট । প্রায় ৯৯ শতাংশই বলেছেন , বিদ্যমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন । ৮৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বেতন বাড়ানোর পক্ষে মত দেন । ১০ শতাংশ বেতন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির
প্রস্তাব করেন । অনেকেই ১৮ তম থেকে ২০ তম গ্রেড পুনর্গঠন এবং সর্বোচ্চ – সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান আরও কমানোর সুপারিশ করেন । গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান , বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট কয়েকটি কারিগরি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য ওই অতিরিক্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করা হয় । অর্থমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পরই প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে । বিবিএসের জরিপও বিবেচনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে , নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ( বিবিএস ) ‘ লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’- এর তথ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে । বিবিএসের এই জরিপ অনুযায়ী , দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা । সিটি করপোরেশন এলাকায় তা ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা । ছয় সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা । নতুন বেতনকাঠামোয় প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে বেতন কমিশন । এতে ২০ তম গ্রেডের বেতন ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে । সুপারিশ বিবেচনার দায়িত্বে থাকা সচিব কমিটি প্রথম গ্রেডের মূল বেতন দেড় লাখ টাকা নির্ধারণের কথা ভাবছে । একই সঙ্গে সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনও কিছুটা কমানো হতে পারে । বেতন কমিশন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের
অনুপাত ১ : ৮ করার সুপারিশ করেছে । সচিব কমিটি তা আরেকটু কমিয়ে ১ : ৭ দশমিক ৫ করার প্রস্তাব করেছে । বর্তমানে এ অনুপাত ১ : ৯ দশমিক ৪ । বর্তমানে ২০ তম গ্রেডের একজন কর্মচারী বেতন – ভাতা মিলিয়ে ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান । নতুন কাঠামো কার্যকর হলে তা বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় উঠতে পারে । ১৯ তম থেকে প্রথম গ্রেড পর্যন্তও বিভিন্ন ভাতা বাড়বে । তবে যাতায়াত , টিফিন , ধোলাই ও ঝুঁকিভাতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে । তবে সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর করা হচ্ছে না । বেতন কমিশন চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার সুপারিশ করলেও তা ৩ হাজার টাকা করার চিন্তা চলছে । সন্তানদের মাসিক শিক্ষা ভাতা ২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে । অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান , কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কিছু ভাতা কমানো হলেও বর্তমানের তুলনায় তা বেশি থাকবে । প্রথম ধাপে চলতি অর্থবছরে মূল বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে । আর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে । বেতনকাঠামো পর্যালোচনা – সংক্রান্ত সচিব কমিটি ও অর্থ মন্ত্রণালয় খসড়া চূড়ান্ত করতে কাজ করছে । শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে । সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী , নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হবে । রাজস্ব আহরণের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করেই এটি দুই ধাপে কার্যকর করার সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি ।
