রাজধানীতে বাড়ছে কুকুরের কামড় বা আঁচড়ে আহত হওয়ার ঘটনা। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণে চিকিৎসা নেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জন। ২০২৫ সালে সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জনে। ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগী বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা। শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অনেকেই দেরিতে আসেন। কেউ প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে পরে আসেন। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, সব কুকুর নয়, র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুরের কামড় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। টিকা না দেওয়া কুকুরের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। তারা বলেন, লক্ষণ প্রকাশ পেলে জলাতঙ্কে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে, তাই প্রতিরোধই প্রধান উপায়।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে মৃত্যু হয় ৪২ জনের, ২০২৪ সালে ৫৮ জনের এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন মৃত্যুহার কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা বেড়েছে। কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদান জোরদার করা প্রয়োজন।
২০১০ সাল থেকে দেশে জলাতঙ্ক নির্মূলে কুকুর টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসার সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির আওতায় ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ৬৪ জেলায় প্রথম, ৪৬ জেলায় দ্বিতীয় এবং ৮ জেলায় তৃতীয় রাউন্ড টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, টানা তিন বছর কোনো এলাকায় অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দিলে সেটি কার্যত জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই কর্মসূচি কার্যত বন্ধ রয়েছে। অর্থের অভাবে টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না।
তবে রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং সিটি করপোরেশনগুলোর কোনো কার্যকর নিয়মিত কর্মসূচি বর্তমানে নেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, অভিযোগ পেলে নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগে বছরে ৫০০টির বেশি কুকুর বন্ধ্যাকরণ করা হলেও গত প্রায় ২০ মাসে হয়েছে প্রায় ১৫০টি।
এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা শরণ কুমার সাহা বলেন, ‘টিকা সরবরাহ নেই, সমন্বয়ের অভাব আছে। তাই নিয়মিত কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, তাদের সক্ষমতা সীমিত। কুকুরের সংখ্যা বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই।
ডিএনসিসির জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, ‘জনবল ও কাঠামো না থাকায় কুকুর নিয়ন্ত্রণে কাজ করা যাচ্ছে না।’
গণমাধ্যমকর্মী মাহফুজা হক বলেন, ‘কুকুরকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।’ তিনি বলেন, ‘কুকুর কথা বলতে পারে না। তাই তাদের ভাষা বোঝারও কেউ নেই। কুকুর কাউকে কামড় বা আক্রমণ করলে ওই কুকুরের ওপর ক্ষোভ ঝাড়া সহজ। কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়। দরকার নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা দেওয়া।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন করে একটি পরিকল্পনা করছি। তবে এর আওতায় শুধু মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। কুকুরকে টিকা দেওয়া বা কুকুর নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই।’ তিনি আরও বলেন, কুকুর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হওয়া উচিত। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এ ধরনের কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষের চিফ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, পথকুকুর নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি।
