ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও হুথিদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় ২৫৭টি হামলা চালানোর দাবি করেছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী। তাদের দাবি, এসব হামলায় অন্তত ৭০০ হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে হুথিদের ১৭০টি যুদ্ধযান ও ভারী সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে।
ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি শনিবার এসব তথ্য জানান। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, হুথিদের অবস্থান, চলাচল ও সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে ‘২৫৭টি সুনির্দিষ্ট হামলা’ চালানো হয়েছে।
তিনি জানান, এসব অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ৭০০ হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এসব হামলায় কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাসহ ১৭০টি যুদ্ধযান ও ভারী সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে এসব অভিযানে সরকারি বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত হয়েছেন কি না, তা জানাননি আল-নাজিলি।
ইয়েমেনি বাহিনীর এই মুখপাত্রের দাবি, হামলাগুলো হুথিদের যুদ্ধ সক্ষমতায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে নিজেদের বাড়ি ও গ্রামে বেসামরিক মানুষদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতাও হুথিদের কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।
শনিবার সানা, মিদি, বাকিম এবং আল-জাওফ, মারিব, আল-বায়দা ও লাহিজের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে এসব অভিযান চালানো হয়। তবে সবচেয়ে বেশি সামরিক তৎপরতা ছিল তাইজের আশপাশে বলে জানান আল-নাজিলি।
এর আগে শুক্রবার তিনি জানিয়েছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী প্রায় ৫০০টি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে ১ হাজার ৫৪০ হুথি যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন তিনি।
তাইজে তীব্র লড়াই
নতুন করে সংঘাত বাড়ায় সরকারি নিয়ন্ত্রিত তাইজ শহর ও এর আশপাশের এলাকা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদক মাহা আলি শনিবার তাইজ থেকে জানান, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্র লড়াই চলছে। বিশেষ করে শহরের পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ হচ্ছে।
তিনি জানান, হামলায় হুথিরা ব্যাপক গোলাবর্ষণ করছে। পশ্চিমাঞ্চল লক্ষ্য করে হুথিদের গোলাবর্ষণের শব্দও শোনা যাচ্ছে। সংঘর্ষের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন।
মাহা আলি জানান, লড়াইয়ে বেসামরিক মানুষও হতাহত হয়েছেন। ধুবাব এলাকায় একটি আবাসিক এলাকায় গোলা আঘাত করলে ছররা বিদ্ধ হয়ে একটি শিশু মারা যায়।
সামা ফ্রন্টেও তীব্র লড়াই চলছে। শুক্রবার ওই পার্বত্য এলাকায় হুথিরা অগ্রসর হয়েছিল বলে জানান আল-জাজিরার প্রতিবেদক। তার ভাষ্য, সামা এলাকার বিপুলসংখ্যক বাসিন্দা সেখান থেকে চলে গেছেন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এত বড় পরিসরে মানুষকে ওই এলাকা ছাড়তে দেখা যায়নি।
এরপর তাইজ শহরের দক্ষিণ-পূর্বে সামা দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী।
সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবা এ খবর জানিয়েছে।
সাবাকে এক সামরিক সূত্র জানায়, স্থানীয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের সহায়তায় সরকারি বাহিনী তীব্র লড়াইয়ের পর দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে অসংখ্য হুথি যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। অন্যরা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ বন্ধ
শনিবার ইয়েমেনি বাহিনীর গণমাধ্যম কর্মকর্তা আম্মার আল-সামিই আল-জাজিরাকে জানান, তাইজের আল-হুবান ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।
এই পথটি আগে ৯ বছর বন্ধ ছিল। পরে ২০২৪ সালে ‘মানবিক কারণে’ বেসামরিক মানুষের জন্য তা আবার খুলে দেওয়া হয়। ইয়েমেনের দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রিত এলাকাকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথগুলোর একটি এটি। এর একদিকে হুথি নিয়ন্ত্রিত আল-হুবান, অন্যদিকে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত তাইজ শহর।
আল-সামিই বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে পথটি বন্ধ করা হয়েছে। ওই সড়ক ব্যবহার করে তাইজে হুথিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা, আশপাশে হামলা এবং সামরিক তৎপরতা বাড়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত
সরকার ও হুথিদের মধ্যে ২০২২ সালে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে সেটি ভেঙে যাওয়ার পর ইয়েমেনে লড়াই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হুথিরা পশ্চিম ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে মুকা বন্দরনগরী এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপ দখল করে নেয়।
এরপর হুথিবিরোধী বাহিনী বিভিন্ন রণক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান অনেকটা স্থিতিশীল করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইয়েমেনে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই ইয়েমেন গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে আছে। এর পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী ছেড়ে এডেনে সরে যায়।
