ইন্দো-পাক-এর কুরআন কি রসমে উসমানী অনুযায়ী নয়?
কিছুদিন আগে আমাকে একজন ফোন করে প্রশ্ন করে যে, ‘আমরা তো ইন্দো-পাকের মুসহাফে কুরআন পড়ি। এখন কারো কারো মুখে শুনছি, ইন্দো-পাকে প্রচলিত মুসহাফ উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক সংকলিত কুরআন অনুযায়ী নয়। তাই এই মুসহাফে কুরআন পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।’
বিষয়টি নিয়ে আমি যতদূর পড়াশোনা করেছি, তার আলোকে আমরা বক্ষমাণ প্রবন্ধে বিষয়টির মূল রহস্য জানার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে ওহী আসলো তিনি ওহীলেখক সাহাবীদেরকে দিয়ে তা লিখিয়ে নিতেন। এ কাজে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন যাইদ ইবন সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু। কুরআন লেখার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি পরিভাষা হচ্ছে ‘রসমুল কুরআন আল-কারীম’।
‘রসমুল কুরআন আল-কারীম’-এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে,
هو الرسم المخصوص الذي كتبت به حروف القرآن وكلماته أثناء كتابة القرآن الكريم بين يدي النبي صلى الله عليه وسلم.
এমন নির্দিষ্ট পদ্ধতি, যে পদ্ধতিতে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে কুরআনের বর্ণ ও শব্দ লিখা হয়েছে।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দুই পদ্ধতিতে কুরআন লিখা হয়েছে : ক. আর-রসমুল কিয়াসী বা আর-রসমুল ইমলায়ী, খ. আর-রসমুল ইসতিলাহী বা আর-রসমুত তাওফীকী।
ক. ‘আর-রসমুল কিয়াসী বা আর-রসমুল ইমলায়ী’ বলতে বোঝায়, সাধারণ প্রচলিত নিয়মে যে আরবী বর্ণ ও শব্দ লিখা হয়।
খ. ‘আর-রসমুল ইসতিলাহী বা আর-রসমুত তাওফীকী’ বলতে বোঝায়, সাধারণ প্রচলিত নিয়মের বাইরে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে লিখতে বলেছিলেন।
বিষয়টির উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে : যেমন, সাধারণ নিয়মে হওয়ার কথা ছিলো لنسفع কিন্তু সূরা ইকরাতে লিখা আছে لنسفعا। এখানে আইন বর্ণের পর আলিফ দেওয়া হয়েছে প্রচলিত নিয়মের বাইরে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লিখতে বলেছিলেন বলে। একইভাবে সাধারণ নিয়ে হওয়ার কথা ছিলোব لشيء ;বিভিন্ন সূরাতে এভাবেই লিখা আছে। কিন্তু সূরা কাহফে এসেছে لشأيء । এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘শীন’ এর পর হামযা বর্ণ রয়েছে। এখানে ‘শীন’ এর পর হামযা বর্ণ দেওয়া হয়েছে প্রচলিত নিয়মের বাইরে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লিখতে বলেছিলেন বলে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কুরআনের প্রায় সকল বর্ণ ও শব্দ ‘আর-রসমুল কিয়াসী বা আর-রসমুল ইমলায়ী’ তথা প্রচলিত নিয়মে লিখিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মের বাইরে ‘আর-রসমুল ইসতিলাহী বা আর-রসমুত তাওফীকী’ তথা প্রচলিত নিয়মের বাইরে লিখা হয়েছে। এর কারণ, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেভাবে লিখতে বলেছিলেন। এ কারণে অধিকাংশ আলিমের মতে কুরআনের বর্ণ ও শব্দ ‘তাওফীকী’ তথা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত ও লিখিত। তাই কুরআনের রসমে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা যাবে না।
আর উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু মূলত সেই রসম বা পদ্ধতিতে কুরআন সংকলন করেছিলেন, যে রসম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করেছিলেন ও লিখিয়েছিলেন।
কুরআন লেখার সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পরিভাষা হচ্ছে, ‘যবতুল কুরআন আল-কারীম’।
‘যবতুল কুরআন আল-কারীম’-এর পরিচয় এভাবে দেওয়া হয়েছে,
تحسينات للرسم العثماني تتمثل بقواعد تساعد على القراءة الصحيحة كالحركات، وتنقيط الحروف، وعلامات الوقف، والأحروف الصغيرة، وعلامات المد وغيرها.
কুরআন শুদ্ধভাবে পড়ার জন্য মূলনীতিভিত্তিক রসমে উসমানীকে সজ্জিতকরণ, যেমন-হরকতপ্রদান করা, বর্ণে নুকতাপ্রদান করা, ওয়াকফের চিহ্ন সংযোজন করা, ছোটো ছোটো বর্ণ যুক্ত করা, মদ্দের চিহ্ন যোগ করা বা অন্যান্য চিহ্ন যুক্ত করা।
‘যবতুল কুরআন আল-কারীম’-এর পরিচয় থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, ‘রসমুল কুরআন’ এর মতো এটি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত নয়। বরং মানুষের বোঝার ও সঠিকভাবে পড়ার সুবিধার্থে এসব যুক্ত করা হয়। আমরা যদি কুরআন সংকলন এবং যুগ-পরম্পরায় এর উৎকর্ষসাধন দেখি, তাহলে দেখতে পায়, প্রতিটি যুগে ‘যবতুল কুরআন’ কুরআনে যুক্ত করা হয়েছে। এখানো এ ধারা চালু আছে। আমরা নতুন-নতুন প্রকাশিত কুরআনে দেখতে পায়, বিভিন্ন প্রকাশনী কুরআনকে শুদ্ধভাবে পড়ার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং বিভিন্ন বিরাম চিহ্ন ও অন্যান্য চিহ্ন যুক্ত করে।
আমরা ‘যবতুল কুরআন’-এর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পায়, তিনজনের মাধ্যমে সবচেয়ে বিরাট ‘যবতুল কুরআন’ সংযোজন করা হয়। প্রথমজন হলেন বিখ্যাত মুখাযরাম তাবিয়ী আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালী। তার আগ-পর্যন্ত কুরআনে কোনো প্রকার হরকত ছিলো না। তিনি সর্বপ্রথম শব্দের শেষবর্ণে নুকতা আকারে হরকত যুক্ত করেন। এরপর আসেন নাসর ইবন আসিম আল-লাইসী। তার আগ-পর্যন্ত কুরআনের বর্ণে কোনো নুকতা ছিলো না। তিনি সর্বপ্রথম লম্বালম্বিভাবে নুকতা যুক্ত করেন। এরপর আসেন খালীল ইবন আহমাদ আল-ফারাহীদী। তার আগ-পর্যন্ত আমাদের মাঝে প্রচলিত নুকতা ও হরকত কুরআনে ছিলো না। তিনি সর্বপ্রথম আমাদের মাঝে প্রচলিত নুকতা ও হরকত কুরআনে সংযোজন করেন।
আমরা জানি কুরআন সাত-পদ্ধতি অবতীর্ণ হয়। আমরা এই জানি যে, উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআন সংকলন করে বিভিন্ন দেশে প্রেরণ করেন। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু সাত-পদ্ধতির এক-পদ্ধতিতে কুরআন জমা করলেও কিরআত পদ্ধতি সাতটি বা দশটি ছিলো। যার ফলে পদ্ধতি একটি হলেও কিরআত পদ্ধতি ভিন্ন-ভিন্ন ছিলো। তবে ইমাম সুয়ূতী এর বিপরীতে বলেছেন, উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু সাত-আহরুফ বা অবতীর্ণ সাত পদ্ধতিতে কুরআন সংকলন করেন। এছাড়া ইমাম জাযারী এ মতটি অনেক সালাফ ও খালাফের মত বলে উল্লেখ করেছেন।
১০ জন কারী রয়েছে যাদের দিকে ১০টি কিরআন সম্পৃক্ত করা হয়। তারা হলেন, ১. নাফি ইবন আবী নুয়াঈম, ২. আবু আমর, ৩. হামযা ইবন হাবীব আয-যাইইয়াত আল-কূফী, ৪. আবদুল্লাহ ইবন আমির, ৫. ইবন কাসীর মাক্কী, ৬. আসিম ইবন আবুন নাজূম আসাদী, ৭. আলী ইবন হামাযা কাসাঈ, ৮. আবু জাফর মাদানী, ৯. ইয়াকুব ইবন ইসহাক, ১০. খালফ ইবন হিশাম।
এছাড়া কুরআনের প্রসিদ্ধ অনেক রিওয়ায়াত বা বর্ণনা রয়েছে। যেমন, ১. ঈসা ইবন মুসীনা মাদানী ওরফে কালুন, ২. উসমান ইবন সাঈদ মিসরী ওরফে ওয়ারশ, ৩. আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ বাযযাহ মাক্কী ওরফে কুম্বাল, ৪. হাফস ইবন আমর, ৫. হিশাম ইবন আম্মার কুরাশী। এ রকম প্রায় ২০ টি বর্ণনা রয়েছে।
কিরাআত ও রিওয়ায়াতের মাঝে পার্থক্য হলো, কিরাআত বলতে বোঝায়, যে-পদ্ধতিতে কুরআনের শব্দ ও বর্ণ উচ্চারণ করা হয়। অবশ্য এ পদ্ধতিগুলো সহীহ সনদে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত প্রমাণিত। আর রিওয়ায়াত বলতে বোঝায়, উক্ত কিরাআত পদ্ধতি বর্ণনা করা।
আমরা যদি কিরাআত ও রিওয়ায়াতের দিকে দেখি, তাহলে দেখতে পাই, অনেক জায়গায় পরস্পরের কিরাআত ও রিওয়ায়াতের মাঝে ভিন্নতা রয়েছে। এ ভিন্নতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ওয়ারশ ও হাফসের রিওয়ায়াত। এর একটি উদাহরণ হলো :
১. সূরা হাদীদের ২৪ নম্বর আয়াত। আয়াতটি ওয়ারশের রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে :
وَمَنْ يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ
কিন্তু হাফসের রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে :
وَمَنْ يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ
অর্থাৎ হাফসের রিওয়ায়াতে ‘হুওয়া’ আছে কিন্তু ওয়ারশের রিওয়ায়াতে তা নেই।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, এসব ভিন্নতা সবগুলোই রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত। কারো পক্ষ থেকে ভুল নয়।
আমরা দেখলাম কুরআনের অনেক প্রসিদ্ধ কিরাআত ও রিওয়ায়াত আছে। তাই প্রতিটি যুগে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কিরাআত ও রিওয়ায়াত অনুসরণ করা হয়েছে। আজও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কিরাআত ও রিওয়ায়াতের প্রচলন আছে।
আমরা যদি ইন্দো-পাক ও সৌদি কুরআন দেখি, তাহলে যে-পার্থক্য বেশি নজরে আসে, তা হলো, ইন্দো-পাকের কুরআনে হামযা ওয়াসলী-এর ওপর হামযা দেওয়া থাকে না এবং তাতে কোনো হরকত থাকে না; শুধু হামযা কতঈর ওপর হরকত দেওয়া থাকে। এর বিপরীতে সৌদি কুরআনে হামযা ওয়াসলী-এর ওপর সবসময় পেশ দেওয়া থাকে আর হামযা কতঈর ওপর হামযা দেওয়া থাকে এবং হরকত দেওয়া দেওয়া। এছাড়া অনেক বিরাম চিহ্নের পার্থক্য দেখা যায়। আরেকটি পার্থক্য দেখা যায়, সৌদি কুরআনে এক আলিফ মদ্দকে বর্ণের ওপর দেওয়া থাকে আর ইন্দোপাকের কুরআনের এক আলিফ মদ্দকে অনেক সময় বর্ণের পাশে দেওয়া থাকে। আমরা নিচে ইন্দোপাক ও সৌদি কুরআনের দুটি ছবি দিয়ে দিচ্ছি। হামযা ওয়াসলী ও হামযা কতঈর মাঝে পার্থক্যের জন্য নিচে ডাবল আন্ডার লাইন করছি এবং এক আলিম মদ্দের মাঝে পার্থক্যের জন্য নিচে সিংগেল আন্ডার লাইন করছি।
আমরা যবতুল কুরআন ও রসমুল কুরআনের পরিচয়ের সময় দেখেছি, বিরাম চিহ্ন, হামযা ওয়াসলী ও কতঈ এবং মদ্দ মূলত যবতুল কুরআনের অন্তর্ভুক্ত। আর যবতুল কুরআন ইজতিহাদী বিষয়। একজনের সাথে আরেকজনের না মিললে কোনো সমস্যা নেই। কারণ, এর মাধ্যমে কুরআনের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এগুলো সংযোজন করা হয়েছে পড়তে সুবিধার জন্য। অতএব, ইন্দোপাক ও সৌদির কুরআনের মাঝে এসব না মিললেও কোনো সমস্যা নেই। উভয়টি সঠিক।
সৌদি সরকারি কুরআন প্রকাশনা সংস্থার গবেষক ড.মুহাম্মাদ শাফাআত রব্বানী ইন্দোপাকের কুরআন নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি গবেষণা করে সিদ্ধান্ত দেন, রসমের ক্ষেত্রে ইমাম দানী ও শাতিবীর রিওয়ায়াত অনুসরণ করা হয়েছে ইন্দোপাকের কুরআনে। আর এটি বিশুদ্ধ রসম। এর বিপরীতে সৌদি কুরআনে ইমাম দানীর ছাত্র ইবনুল নাজাহ-এর রিওয়ায়াত অনুসরণ করা হয়েছে। এ লিঙ্কে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে :
https://islamqa.info/amp/ar/answers/281234
আর দানী, শাতিবী ও নাজাহ সবার রসম উসমানী রসম অনুসারী। তাই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ইন্দোপাকের মুসহাফ ও তার রসম উসমানী রসম অনুযায়ী। তাই এই রসম অনুসরণ করতে এবং পড়তে কোনো সমস্যা নেই।
আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, রসমে উসমানীর সাথে ফন্টের কোনো সম্পর্ক নেই।
