ফারাবী ভাইয়ের মুক্তিতে অনেকেই উচ্ছ্বাস জানিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন। আমিও এই ব্যাপারে উচ্ছসিত, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু কারো কি খেয়াল আছে তিনি কারাবন্দী হবার আগে কী করতেন? কেন করতেন? তিনি নাস্তিক ব্লগারদের জবাব দিয়ে লেখালেখি করতেন। সেই সময়ে ব্লগ জগতে যেই কয়জন মুসলিম ব্লগার নাস্তিকদের খণ্ডন করতেন, এর মধ্যে ফারাবী ভাই ছিলেন একজন। সেই সময়ে আমরা অনলাইনে ফারাবী ভাইদের লেখা দেখতাম, অনুপ্রাণিত হতাম, দলিল দিয়ে কিভাবে ইসলামবিরোধীদের খণ্ডন করতে হয় তা শিখতাম। . সেই সময়ে নাস্তিকদের যে তৎপরতা ছিল, বর্তমানে সেই তৎপরতা এতটুকু কমেনি বরং বহুগুণে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সময়ে নাস্তিকরা শুধু ব্লগেই লিখত। এখনও তারা ব্লগে লেগে, তাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট আছে। তারা তাদের লেখাগুলো এখন বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়া শুরু করেছে। তারা ফেসবুক ও ইউটিউবে নিয়মিত লাইভ করে, তারা ইউটিউবে ব্যাপক পরিমাণে কন্টেন্ট বানায়, যেসব কন্টেন্টে লক্ষ লক্ষ ভিউ হয়। বাইরের দেশের নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষীদের সাথেও তারা একযোগে কাজ করে। ২০১৩ সালে নাস্তিকদের যে তৎপরতা ছিল, আজ ২০২৫ সালে তা অন্তত ১০-২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। নাস্তিকরা পরিকল্পনা করে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ধীরে ধীরে নিজেদের কাজের পরিধি বাড়াচ্ছে। . আর আমরা কী করি? আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করি। শুধু প্রতিবাদ করা আর রাস্তায় নামার মধ্যে নিজেদের কাজকে সীমাবদ্ধ রাখি। নাস্তিকদের কেবল ফাঁসি চাওয়া বাদে আমাদের উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ নেই। দীর্ঘমেয়াদী বা স্বল্পমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা নেই। এদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থেকে দলে দলে মানুষের মুর্তাদ হবার সংবাদ আসে। এখন তো রীতিমত মাদ্রাসার আলেম ও ত্বলিবুল ইলমদের মধ্যেও মুর্তাদ হওয়া আরম্ভ হয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে এখন মুর্তাদ মুফতি-মাওলানারাও নিয়মিত লাইভ করছে। তাদের ভিডিও দেখে বা লাইভে গিয়ে আম জনতা ঈমান খোয়াচ্ছে। এই বিষয়টি কি আমাদের রাহবার অর্থাৎ উলামায়ে কিরামদের আদৌ নজরে এসেছে? . গত ১ দশক ধরে আমরা ফেসবুকে ফারাবী ভাইকে নিয়ে অনেক হাহাকার করেছি, কিন্তু তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছি খুব অল্প কয়েকজন। আমরা ফারাবীদের নিয়ে হাহাকার করতে ভালোবাসি, কিন্তু নতুন ফারাবী গড়া নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই, যেই ফারাবীরা নাস্তিকদের জবাবে দলিল দিয়ে লিখতে পারবে। নাস্তিকদের খণ্ডনে বই বের বের করার একটা ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল, এখন আর তা নেই। নাস্তিক ব্লগারদের লেখালেখি বৃদ্ধি পেলেও তাদের খণ্ডন করে এখন আর বাঙালি মুসলিমরা লেখে না। আর কেউ লিখলেও সেটা নিয়ে কারো মধ্যে আগ্রহ কাজ করে না; লেখক, প্রকাশক বা পাঠক কারোই এখন আর এসবে আগ্রহ নেই। কারণ “ট্রেন্ড” নেই। নাস্তিকরা ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক এইচডি কোয়ালিটির ভিডিও বানায়, আর আমরা দেশ ও জাতি উদ্ধার করা নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত হলেও এই দিকে কারো কোনো চিন্তা নেই। . আমরা একটা কাজই পারি আর তা হল – কয়েক দিন পর পর ফারাবী নিয়ে হাহাকার করে পোস্ট দিতে পারি, অমুকের কালো হাত ভেঙে দাও, ফাঁসি দাও বলে চিৎকার করতে পারি, অথচ আমরা বুঝি না স্রেফ এই কাজগুলোই যথেষ্ট না। এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ না করে শুধু চিৎকার আর হাহাকার করে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক মুভমেন্ট দমানো যায় না। না*স্তিকদেরকেও এভাবে দমানো যাবে না, বরং এভাবে চলতে থাকলে তাদের মুভমেন্ট দিনকে দিন বাড়তে থাকবে আর আমাদের হাহাকারও বাড়বে। কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না। আমরা সবাই বুঝদার মানুষ, কিন্তু সমস্যা হল আমরা সবাই সব কিছু অনেক দেরিতে বুঝি। এমন দেরিতে বুঝি, যখন আমরা ইসলামের শত্রুদের থেকে যোজন যোজন ব্যবধানে পিছিয়ে যাই। আর কিছু করার থাকে না। . ফারাবী ভাইয়ের কুরবানী আল্লাহ কবুল করুন। বিনা দোষে জীবনের এতগুলো বছর মাজলুম হবার প্রতিদানে আল্লাহ ওনাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করুন এবং হেফাজত করুন। আমাদের মধ্য থেকে ফারাবী ভাইয়ের মতো অথবা তাঁর থেকেও অনেক গুণে শাণিত দাঈ এবং চিন্তক বের করুন যারা পূর্ববর্তীতের সব ব্যর্থতা পুষিয়ে দিয়ে দ্বীনের জন্য অবদান রাখবে। আমাদের সম্মানিত উলামাদেরকে আল্লাহ এই ফিল্ডের দিকে একটু নজর দেবার তাওফিক দান করুন। কারণ উলামাদের নেতৃত্ব বাদে উম্মতের জন্য কার্যকরভাবে অগ্রসর হওয়া খুব কঠিন।
