দেশে এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ আহরণ বাড়ার পর হঠাৎ কমে গেছে। গত দুই বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। একই সঙ্গে দেশে ধরা পড়া ইলিশের আকারও আগের তুলনায় ছোট হয়েছে। এ বিষয়ে মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশের আকার ছোট হওয়ার পেছনে সরাসরি কোনো বাস্তুতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন আহরণ এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের ক্ষতিই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ইলিশ ডিম ছাড়ার পর মার্চ-এপ্রিলে জাটকা ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরের দিকে যায়। এ সময় নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং উপকূলীয় সাগরে আর্টিসানাল ট্রলারের মাধ্যমে ব্যাপক হারে জাটকা ধরা হয়। ফলে ইলিশ পূর্ণ আকারে বড় হওয়ার সুযোগ পায় না। পাশাপাশি দখল ও দূষণের কারণে নদীর বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হওয়া এবং নাব্যতা সংকটের প্রভাবেও ইলিশের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে জেলে, ব্যবসায়ী ও মৎস্যবিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না নিলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন আরও ঝুঁকিতে পড়বে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমেছে ৪২ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, যা পরের বছর কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও ২৯ হাজার টন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ টনে। ফলে দুই বছরে মোট ৭১ হাজার টন ইলিশ কম আহরিত হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাত বছর আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ গ্রামে নেমেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চি হয়েছে।
ইলিশ সাধারণত এক থেকে দুই বছরে দ্রুত বড় হয়। একটি জাটকা এক বছর বাঁচলে এর দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৮১ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। আর পাঁচ থেকে সাত বছর বাঁচলে একটি ইলিশ ২২ দশমিক ৬৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হতে পারে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, নদীতে পলি জমা, নাব্যতা সংকট ও চর সৃষ্টি ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করছে। পাশাপাশি বৃষ্টির অনিয়ম ও পানিদূষণ প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
অনিয়ন্ত্রিত আহরণকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আবদুল ওহাব। তিনি বলেন, জাটকা নিধন ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সংকট আরও বাড়বে। উপকূলীয় জেলেদের অভিজ্ঞতাতেও একই চিত্র দেখা যায়। বরগুনার তালতলীর জেলে দুলাল হোসেন বলেন, ইলিশের বাচ্চা বের হওয়ার পরই সূক্ষ্ম জাল দিয়ে তা ধরা হচ্ছে। তিনি জানান, জাটকা তিন ধাপে ধরা হয়—প্রথমে ছোট বাচ্চা, পরে বড় ফাঁসের জালে এবং শেষে ট্রলিং ট্রলারের নিষিদ্ধ জালে।
মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, দেশে ২৮ হাজার আর্টিসানাল ট্রলার ও ২৬৮টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরে। গভীর সমুদ্রে মাছ না পেলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো অগভীর পানিতে গিয়ে জাটকা ধরে। অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা যায়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম উপকূলে কাঠের ট্রলারকে ট্রলিং ট্রলারে রূপান্তর করে ছোট ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা হচ্ছে, যা মৎস্যসম্পদের ওপর প্রভাব ফেলছে।
মৎস্যবিশেষজ্ঞরা জানান, অনুকূল পরিবেশ না থাকলে মাছের উৎপাদন কমে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশের খাদ্য প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে ৬৮ শতাংশ কমেছে, যার বড় কারণ দূষণ। গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, খাদ্যের ঘাটতি ইলিশের আকারেও প্রভাব ফেলছে। এছাড়া মেঘনার মোহনায় ডুবোচর বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বড় ইলিশ উপকূল ও নদীতে কম আসছে।
‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, নাব্যতা সংকটে ইলিশের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অনেক মাছ পূর্ণ আকারে বড় হতে পারছে না। তিনি জানান, ছোট আকারের ইলিশের মধ্যেই ডিম তৈরি হচ্ছে। সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা নতুন অভয়াশ্রম গঠন, নদীর মোহনায় চর অপসারণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নদীব্যবস্থার সার্বিক জরিপ ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা।
