শুরুটা হয় খুব ছোট্ট একটি অবহেলা দিয়ে।
আজ ক্লান্ত লাগছে—ফজরটা পরে পড়ব।
কালও আর উঠতে পারলাম না।
এরপর একদিন, দু’দিন, কয়েক সপ্তাহ…
একসময় অবহেলাই অভ্যাসে পরিণত হয়। তারপর এমন একটি সময় আসে, যখন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর উঠতে পারি না। শরীর যেন আর সাড়া দেয় না। বিছানাই জিতে যায়, আমরা হেরে যাই।
ঠিক একই ঘটনা ঘটে কুরআনের সঙ্গেও।
আজ পড়লাম না।
কালও পড়া হলো না।
তারপর মনে হলো, “আগামীকাল থেকে শুরু করব।”
কিন্তু সেই আগামীকাল আর আসে না।
ধীরে ধীরে কুরআন তিলাওয়াতের আনন্দ হারিয়ে যায়। যে কুরআন একসময় হৃদয়কে প্রশান্ত করত, সেটিই একসময় দিনের পর দিন স্পর্শ করা হয় না। ব্যস্ততা, অলসতা আর গাফিলতির স্তর জমতে জমতে কুরআন আমাদের জীবন থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
এভাবেই শুধু নফল আমল নয়, একসময় ফরজ আমলও আমাদের হাতছাড়া হতে থাকে।
কিন্তু কেন এমন হয়?
আমরা সাধারণত এর কারণ খুঁজি শরীরে।
ঘুম বেশি হয়েছে…
কাজের চাপ…
রাতে দেরি করে ঘুমিয়েছি…
মোবাইলে অনেক সময় নষ্ট করেছি…
এসব অবশ্যই বাস্তব কারণ। কিন্তু এগুলোই কি পুরো কারণ?
একজন মুমিনের উচিত আরেকটি প্রশ্ন নিজেকে করা—
আমার অন্তরের অবস্থা কেমন?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“কখনোই নয়! বরং তারা যা অর্জন করেছে, তা-ই তাদের অন্তরের ওপর মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।”
(সূরা আল-মুতাফফিফীন: ১৪)
গুনাহ কখনো শুধু একটি কাজের নাম নয়। প্রতিটি গুনাহ অন্তরে একটি কালো দাগ ফেলে। মানুষ যদি তাওবাহ না করে, সেই দাগ বাড়তেই থাকে। একসময় অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তখন ইবাদত আর আগের মতো ভালো লাগে না, কুরআন পড়ে হৃদয় নরম হয় না, দোয়ায় চোখ ভিজে না।
আলেমগণ বলেন, গুনাহ ও ফরজ ইবাদতের প্রতি অবহেলার অন্যতম শাস্তি হলো—আল্লাহ ধীরে ধীরে বান্দার কাছ থেকে নেক আমলের তাওফিক কমিয়ে দেন।
আজ একটি ফরজ সালাত অবহেলা করলাম।
কাল কুরআন পড়া বাদ দিলাম।
পরশু যিকির করা হলো না।
এরপর নফল আমল ছুটে গেল।
এভাবেই এক অবহেলা আরেক অবহেলার জন্ম দেয়।
ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর গ্রন্থে গুনাহের বহু ক্ষতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, গুনাহের শাস্তি হলো—একটি গুনাহ আরেকটি গুনাহকে সহজ করে দেয়, আর নেক আমলের পথকে কঠিন করে তোলে। মানুষ যত গুনাহে ডুবে যায়, ততই ইবাদতের প্রতি তার আগ্রহ কমতে থাকে।
ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন,
“একটি নেক আমলের প্রতিদান হলো তার পরে আরেকটি নেক আমল করার তাওফিক। আর একটি গুনাহের শাস্তি হলো তার পরে আরেকটি গুনাহে পতিত হওয়া।”
এ কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, একজন মানুষ শুধু একটি ইবাদতই হারায় না; ধীরে ধীরে তার পুরো ইবাদতী জীবন দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইমাম আশ-শাফিঈ-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটিও আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে—
“ইলম হলো আল্লাহর নূর, আর আল্লাহর নূর কোনো গুনাহগারকে দান করা হয় না।”
যদি গুনাহ মানুষের অন্তর থেকে ইলমের নূর কেড়ে নিতে পারে, তবে ইবাদতের স্বাদ ও তাওফিক কমিয়ে দেওয়াও যে তার ভয়াবহ প্রভাবের অংশ হতে পারে—এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
আরও ভয়ের বিষয় হলো, অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না যে সে শাস্তির মধ্যে আছে। সে মনে করে—
“আমি তো আগের মতোই আছি।”
কিন্তু বাস্তবে সে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছে।
আগের মতো ফজরে উঠতে পারে না।
কুরআন খুলতে ইচ্ছা করে না।
দোয়ায় মন বসে না।
গুনাহকে গুনাহ মনে হয় না।
ইবাদত ভারী লাগে।
এগুলো কি শুধু অলসতার লক্ষণ?
নাকি এগুলো আমাদের জন্য আল্লাহর একটি সতর্কবার্তা। কারণ সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলোর একটি হলো—আল্লাহর ইবাদত করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
যদি আজ আমাদের হৃদয়ে এই অনুভূতি জাগে যে, “আমি আগের মতো নেই”—তবে এটিকে হতাশার কারণ নয়, বরং ফিরে আসার আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
কারণ যে আল্লাহ আমাদের গুনাহ ক্ষমা করেন, তিনিই আবার মৃতপ্রায় অন্তরকে জীবিত করে দেন, নেক আমলের তাওফিক ফিরিয়ে দেন এবং তাঁর দিকে ফিরে আসা প্রতিটি বান্দাকে সাদরে গ্রহণ করেন।
আল্লাহ আমাদের অন্তরকে গুনাহের মরিচা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের সালাত, কুরআন ও সকল নেক আমলের তাওফিক দান করুন। আমাদের গাফিলদের অন্তর্ভুক্ত না করে তাঁর অনুগত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।
