দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর দাবি, গত ২৬ জুন কাঠামোগত সমঝোতা সই হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রায় ৭ হাজার ৭০০ বার ওই সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। এসব লঙ্ঘনের মধ্যে লেবাননের সেনা ও টহল দলের কাছাকাছি গুলি চালানোর ঘটনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে বৈরুত।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে লেবাননের সেনাবাহিনী জানায়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণাঞ্চলের আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে নাবাতিয়েহ জেলার কাফর রেমান এলাকায় হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তারা। সেনাবাহিনীর ভাষ্য, দক্ষিণাঞ্চলে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
সেনাবাহিনী আরও বলেছে, দক্ষিণ লেবাননের জাওতার আল-ঘারবিয়েহসহ সংঘাতপ্রবণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। স্থানীয় অবকাঠামো ও বসতবাড়ির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লেবাননের সামরিক বাহিনীর মতে, এ ধরনের হামলা শুধু যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
২৬ জুনের কাঠামোগত সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ লেবাননে ধাপে ধাপে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, লেবাননের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করা। এর অংশ হিসেবে লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা নির্ধারিত কয়েকটি এলাকায় অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছে। পশ্চিম জাওতার, ফ্রেন ও সারফিনা এলাকায় ছয়টি চেকপোস্ট এবং ১৩টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি পরিত্যক্ত অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।
লেবাননের সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে এখন পর্যন্ত রকেট, ড্রোন ও বিস্ফোরকসহ প্রায় ১ হাজার ৮১৮টি অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সাড়ে ৭ মাইল সড়ক অস্ত্রমুক্ত ও চলাচলের উপযোগী করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সেনাবাহিনী বলছে, দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা কাঠামোগত সমঝোতার শর্ত মেনে কাজ করছে; তবে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় তাদের মোতায়েন ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহ এখনো অস্ত্র সমর্পণ করেনি এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এসব হামলার জবাবেই দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্রের গুদাম, অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ৬ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর আগে নাবাতিয়েহ অঞ্চলেও ধারাবাহিক হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এসব হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে যুদ্ধবিরতি ও সংশ্লিষ্ট সমঝোতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
লেবাননের সেনাবাহিনী বলেছে, ইসরায়েলি হামলা ও লঙ্ঘন বন্ধ হওয়াই দক্ষিণাঞ্চলে তাদের পূর্ণাঙ্গ মোতায়েন এবং কাঠামোগত সমঝোতার দায়িত্ব বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত। তাদের আশঙ্কা, হামলা অব্যাহত থাকলে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত এলাকাগুলো থেকেও নতুন করে মানুষকে সরে যেতে হবে এবং দক্ষিণ লেবাননে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আরও পিছিয়ে পড়বে।
ফলে একদিকে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করে দক্ষিণ লেবাননে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চাপ, অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত সামরিক অভিযান—দুইয়ের মধ্যে আটকে পড়েছে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া। লেবাননের সেনাবাহিনীর ৭ হাজার ৭০০ লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ইসরায়েলের পাল্টা হিজবুল্লাহবিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ যে এখনো অনিশ্চিত, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
