Tuesday, November 3, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে ও পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরপাহাড় অস্থিতিশীল করার নীলনকশা

পাহাড় অস্থিতিশীল করার নীলনকশা

পাহাড়ে সংঘাত-সহিংসতা বেড়েই চলেছে। এতে উদ্বেগ বাড়ছে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। বেশ কিছুদিন ধরে রাঙামাটির সাজেক ঘিরে পাহাড়ের দুই আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফের যে ভয়াবহ সংঘাত, গোলাগুলি ও রক্তপাত চলছে, তা কেবল আধিপত্যের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার ছক তৈরি করা হয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ দেশের জাতীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরির ‘ব্লু প্রিন্টের’ অংশ হিসেবেই ভারতের মদতে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করার এ নয়া পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছে ওয়াকিবহাল বিভিন্ন সূত্র।

সম্ভাব্য সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে গুইমারা, মানিকছড়ি, কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপাতত ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে সরকার।

সূত্র জানায়, তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানকে কেন্দ্র করে সক্রিয় দুটি পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন। এগুলো হলো—পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (ইউপিডিএফ)। গত কয়েক বছরে ছোট-বড় আরো কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও বাস্তবে গহিন পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ এ দুটি সংগঠনের হাতেই।

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামকে কেন্দ্র করে তাদের যোগাযোগ ও আশ্রয়ের নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইউপিডিএফের সঙ্গে ত্রিপুরা এবং জেএসএসের সঙ্গে মিজোরামের যোগাযোগের বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

পাহাড়ি জনপদের সশস্ত্র গ্রুপগুলো সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন—এমন নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর থেকে পানছড়ি ও সাজেক এলাকায় জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। গত মাসের শুরুতে ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবস্থান নেয় জেএসএস (সন্তু লারমাপন্থি)। এতে পানছড়ি, নারাইছড়ি ও সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকার চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউপিডিএফের হাতে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে আপাত দৃষ্টিতে দুই সংগঠনের আধিপত্যের লড়াই মনে হলেও এর পেছনে বৃহত্তর পরিকল্পনা রয়েছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্টরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শহীদ উল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ সক্রিয় থাকলেও পার্বত্য অঞ্চলে এর পাশাপাশি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোও (আইবি) সক্রিয়। বর্তমান সংঘাতের ধরন পর্যবেক্ষণ করে এটাই মনে হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটননির্ভর পার্বত্য অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হতে পারে। কারণ, স্থানীয়দের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে তাদের আর দাবার ঘুঁটির মতো পরিচালনা করা যাবে না।

তিনি বলেন, দিঘিনালা থেকে সাজেক পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পানছড়ি, নারাইছড়ি ও জামিনিপাড়া হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ছিল সংগঠনটির সদস্যদের। অন্যদিকে সাজেক, উদয়পুর, থেগামুখ, ভুষণছড়া, জুড়াছড়ি, দিঘিনালা ও রামগড় হয়ে মিজোরামে নিরাপদ ঘাঁটি রয়েছে জেএসএসের।

তার ভাষ্য, এবারের সংঘাতের শুরুতেই জেএসএস ইউপিডিএফের কয়েকটি সীমান্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে নারাইছড়ির কয়েকটি দুর্গম পয়েন্ট ছাড়া অন্য এলাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না ইউপিডিএফ। এরপর সাজেকের দিকে জেএসএসের তৎপরতা বাড়ে। বাইরের বড় শক্তির সহায়তা ছাড়া এমন পরিকল্পিত হামলা চালানোর সুযোগ নেই বলেও মনে করেন শহীদ উল্লাহ চৌধুরী।

এ পরিস্থিতিতে জেএসএসের আক্রমণে হারানো আধিপত্য ফিরে পেতে ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে ইউপিডিএফ। বিভিন্ন দাবিতে দুটি পকেট সংগঠনকে মাঠে নামিয়েছে তারা। এগুলো হলো ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা পরিষদ’। রক্ষা পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাবুধন চাকমা, বিজয় কান্তি চাকমা ও নতুন জয় চাকমা নামের তিন ইউপিডিএফ নেতা।

ছড়িয়ে পড়তে পারে সংঘাত

পরিস্থিতি শান্ত করতে শুরুতে উদ্যোগী হলেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন সামনে আসার পর কৌশল বদলেছে সরকার। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সাজেকের সংঘাতকে কেন্দ্র করে পুরো পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য রামগড়ের যৌথখামার, সোনাইআগা, গরুকাটা, মানিকছড়ির বাটনা ও যোগ্যাছলা, গুইমারা, কাউখালী ও নানিয়ারচরসহ বেশ কয়েকটি এলাকাকে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতেও বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পার্বত্য এলাকায় বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বাঙালি যুবক হত্যার পর খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় এক মারমা কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিন পার্বত্য জেলায় পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আগের অভিজ্ঞতার কারণে এবারও সাজেকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর এলাকায় অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করা বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পর্যটননির্ভর গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা সাজেক অবস্থানগত দিক থেকে রাঙামাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেও যোগাযোগব্যবস্থা খাগড়াছড়ির ওপর নির্ভরশীল। খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের দুই পাশেই দুর্গম পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের নিরাপদ অবস্থান। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতায় ওই এলাকায় সেনাবাহিনীর কোনো ক্যাম্প নেই। বিজিবি সদস্যরা সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে দুই সংগঠনই।

সূত্রের দাবি, রাঙামাটির বাঘাইছড়ির উদয়পুর, শিয়ালদাহ, নিউ লঙ্কর, ওল্ড লঙ্কর, বাবুছড়ার মাইনী নদীর পূর্ব অংশ নারাইছড়ির আংশিক, পানছড়ির দুদুকছড়া, লোগাং, পুজগাং, মরাটিলার একাংশ জেএসএসের দখলে আর রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মাচালং, উজোবাজার, জোড়া ব্রিজ, বাবুছড়ার মাইনী নদীর পশ্চিমাংশ, পানছড়ির কিছু অংশ, সদরের গিরিফুল, হাতিরমাথা, বেলতলিপাড়া, পল্টন জয়পাড়া, মাটিরাঙ্গা ওয়াচু, অভ্যা, লক্ষ্মীছড়া, চিজকমুখ, জামিরছড়া, লাচারীপাড়া, প্রেমতলা, বৈদ্যপাড়া, যৌথ খামার, সোনাইআগা, গরুকাটা, লালছড়ি, গুইমারার বিভিন্ন গ্রাম, মানিকছড়ির বাটনা, যোগ্যাছোলা, কালাপানি, লক্ষ্মীছড়ির দুল্যাতলী, বর্মাছড়ি, কাউখালী, নানিয়ারচর এলাকা ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে আছে।

দীর্ঘদিন ধরে খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ এবং পর্যটনকেন্দ্রিক যোগাযোগ পথে ইউপিডিএফের প্রভাব ছিল। দিঘিনালা থেকে সাজেক, বাঘাইছড়ি ও লংগদু পর্যন্ত চলাচলকারী পণ্যবাহী যানবাহন, পর্যটকবাহী চাঁদের গাড়ি, সিএনজি এবং বিভিন্ন রিসোর্ট থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলত ইউপিডিএফ।

গত অক্টোবরের শুরুতে পানছড়ি ও নারাইছড়ির বিভিন্ন এলাকায় জেএসএসের তৎপরতা বাড়ে। ফলে এ দুই সীমান্তবর্তী এলাকা হয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ইউপিডিএফের। আগে সেনাবাহিনীর অভিযান কিংবা প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর হামলায় কোণঠাসা হয়ে পড়লে পানছড়ি ও নারাইছড়ি এলাকা হয়ে ভারতে ঢুকে পড়ত ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। এখন নারাইছড়ির দুর্গম দু-একটি পয়েন্ট ছাড়া প্রায় পুরো সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তারা। এছাড়া উজোবাজার, বাঘাইহাট, সাচলং, মাচালং, বুয়াছড়ি, কালাবুনিয়া, জামিনিপাড়া এলাকায় দফায় দফায় হামলা চালিয়ে ইউপিডিএফকে বিতাড়িত করে দখলে নেয় জেএসএস। ফলে পুরো সাজেক পর্যটন এলাকায় আগের নিয়ন্ত্রণ হারায় ইউপিডিএফ।

বাঙালি পুনর্বাসনের গুজব

জানা গেছে, সাজেক গণঅধিকার পরিষদের ব্যানারে সাজেককে অস্থির করে তোলার অপচেষ্টা চলছে। গত ১১ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন দাবিতে অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে তারা। এসব কর্মসূচিতে জনসমর্থন বাড়াতে সরকার সাজেক ও উদয়পুরে নতুন করে সাত হাজার বাঙালিকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে—এমন গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেইজে প্রচারিত এসব তথ্যের বড় একটি অংশ ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, সহযোগী পকেট সংগঠনের ব্যানারে নারী-পুরুষ ও শিশুদের জড়ো করে রাজপথে অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও এ কদিনে অসংখ্যবার জেএসএস সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে ইউপিডিএফ। এমনকি পর্যটকদের গাড়িতেও হামলা চালিয়েছে তারা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ২৬ অক্টোবর রাঙামাটির উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন সরকারের প্রতিনিধিরা। সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী ও রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান এবং খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঞা এ উদ্যোগ নেন। বৈঠকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা পরিষদের পক্ষ থেকে বাবুধন চাকমা, বিজয় কান্তি চাকমা, নতুন জয় চাকমা ও উষাতন চাকমা অংশ নেন।

বৈঠকে বিনা উসকানিতে অবরোধকারীদের ওপর হামলার বিচার, সংশ্লিষ্ট দুই সেনা কর্মকর্তার শাস্তি, আহতদের চিকিৎসা এবং সাজেক থেকে জেএসএসের (সন্তু লারমা) সদস্যদের সরিয়ে দেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে প্রধান দাবি ছিল জেএসএসকে সাজেক থেকে সরিয়ে দেওয়া।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে আন্দোলনকারীরা নিজেদের নিরপেক্ষ সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু জেএসএসকে সরিয়ে দেওয়ার দাবির বিপরীতে একজন সংসদ সদস্য সাজেক থেকে জেএসএস ও ইউপিডিএফ—উভয় সংগঠনের সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তারা আপত্তি জানান। এতেই প্রমাণিত হয়, মুখে সামাজিক সংগঠনের কথা বললেও মূলত তারাও ইউপিডিএফের পকেট সংগঠনের প্রতিনিধি।

সরকারের পক্ষে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমন্বয়কারী খাগড়াছড়ির এমপি বলেন, সাজেকের ঘটনা মূলত জেএসএস ও ইউপিডিএফের আধিপত্যের বিরোধ। শুরুতে স্থানীয় সাধারণ মানুষের একাংশ বিভ্রান্ত হলেও ধীরে ধীরে অবরোধকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে ধস

সাজেকের সংঘাত ও অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেখানকার পর্যটননির্ভর অর্থনীতি। গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে পানছড়ি ও সাজেক এলাকায় জেএসএস-ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের গোলাগুলিতে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ১১ অক্টোবর থেকে সাজেক থেকে জেএসএসকে সরিয়ে দেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে লাগাতার অবরোধ শুরু করে ইউপিডিএফ মদতপুষ্ট সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে ছয় দিন কর্মসূচি স্থগিত থাকলেও পরে আবার অবরোধ শুরু হয়। গত ২২ অক্টোবর সাজেকে আটকেপড়া পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার সময় উজোবাজারে সেনাবাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে দিঘিনালা-সাজেক, বাঘাইছড়ি ও লংগদু এলাকার যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে পুরো এলাকার পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে মারাত্মক ধস নেমেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আইয়ুশ চাকমা জানান, খাগড়াছড়ি-সাজেক রুট বন্ধ থাকায় শুধু যানবাহন খাতেই দৈনিক প্রায় ২৫ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। অন্য চারটি রুটের ক্ষতি যোগ করলে অঙ্কটি ৪০ লাখ টাকায় দাঁড়াবে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য শহরে পাঠানো যাচ্ছে না। সাজেকের শতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট বন্ধ থাকায় সব মিলিয়ে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দেড় কোটি টাকার বেশি।

তার ভাষ্য, এসব এলাকার বাসিন্দার বড় একটি অংশ পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, সাজেক গণঅধিকার রক্ষা পরিষদ উত্থাপিত পাঁচ দাবির মধ্যে চারটি মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে জেএসএস সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিটি প্রশাসনের একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠী একে অন্যকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করতে প্রশাসনের সহায়তা চাইছে—যা বাস্তবসম্মত নয়। বিষয়টি আন্দোলনকারীদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে। সংঘাত যাতে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। দ্রুত সংকটের সমাধান হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

দীর্ঘদিন পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করা নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল হক বলেন, সাজেকের ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সম্প্রতি জেএসএস কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। পানছড়ি, নারাইছড়ি ও মাচালংয়ের মতো দুর্গম এলাকায় কয়েক মাস ধরেই দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলছে। ইউপিডিএফের ধারণা, প্রশাসনের একটি অংশের সহায়তায় জেএসএস তাদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করতে চাইছে।

তার মতে, সরকার বর্তমানে ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি ক্ষয় হচ্ছে না এবং প্রশাসনকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচারের সুযোগও কমছে। তবে দীর্ঘদিন কোনো এলাকায় অস্থিরতা চলতে থাকলে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। একইসঙ্গে এক এলাকার সংঘাত অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি প্রতিনিধি]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

12 + 6 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য