সুদানে আরএসএফ বাহিনী কর্তৃক চলমান গণহত্যা ঘিরে আন্তর্জাতিক রসদ ও অর্থায়নের যে জটিল নেটওয়ার্ক নিয়ে এত দিন ধরে নানা অভিযোগ ভেসে আসছিল, তার নতুন ও বিস্তারিত চিত্র সামনে এনেছে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
১৫ জুলাই প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মার্কিন আর্মি স্পেশাল ফোর্সেস সদস্য এবং দীর্ঘদিনের মার্কিন সরকারি ঠিকাদার স্টিভেন শাউলিসের নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যুক্ত অন্তত তিনটি পুরোনো বোয়িং উড়োজাহাজ সুদানের আধাসামরিক বাহিনী Rapid Support Forces বা আরএসএফের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে চলাচল করেছে। ফ্লাইট রেকর্ড, স্যাটেলাইট ছবি, বিমান চলাচলসংক্রান্ত তথ্য, করপোরেট নথি ও একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রয়টার্স বলছে, এই আকাশপথ সংঘাতের তীব্রতম পর্যায়গুলোতে আরএসএফকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে স্টিভেন শাউলিসকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক Central Asia Development Group বা সিএডিজির প্রধান হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার নিয়ন্ত্রণাধীন বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিচালিত বড় বড় সরকারি চুক্তি পেয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ অন্তত ৪১৯ মিলিয়ন ডলার। এসব চুক্তির মধ্যে ছিল আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন বাহিনীর অবকাঠামো নির্মাণ, ইউএসএইডের উন্নয়ন কর্মসূচি এবং আফ্রিকার বিভিন্ন স্থানে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের বিমানঘাঁটি-সংক্রান্ত প্রকল্প। এ কারণেই সুদানের যুদ্ধপথে তার সঙ্গে সম্পর্কিত উড়োজাহাজের উপস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুই নয়, বরং ওয়াশিংটনের ঠিকাদারি ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি বোয়িং ৭৩৭ এবং দুটি বোয়িং ৭২৭ নিয়মিতভাবে চাদের এন’জামেনা, দক্ষিণ-পূর্ব লিবিয়ার কুফরা এবং সোমালিয়ার বসাসো থেকে দক্ষিণ দারফুরের নিয়ালা পর্যন্ত রুটে চলাচল করেছে। নিয়ালাকে রয়টার্স আরএসএফের অন্যতম প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংবাদ সংস্থাটি জানায়, তারা ফ্লাইট রেকর্ড, স্যাটেলাইট চিত্র ও এভিয়েশন ডেটা বিশ্লেষণ করে আরএসএফ-নিয়ন্ত্রিত বা তাদের ব্যবহারকৃত বিমানঘাঁটিতে অন্তত ১৬টি অবতরণের তথ্য শনাক্ত করেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আকাশপথ জ্বালানি, জনবল, অস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল, যা আরএসএফের যুদ্ধ সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
দারফুরের যুদ্ধক্ষেত্রে এই সরবরাহপথের তাৎপর্য বোঝাতে রয়টার্স বিশেষভাবে আল-ফাশিরের প্রসঙ্গ টেনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আরএসএফ প্রায় ১৮ মাস ধরে আল-ফাশির অবরোধ করে রাখে এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের অক্টোবরে শহরটি তাদের নিয়ন্ত্রণে যায়। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এত দীর্ঘ অবরোধ ধরে রাখতে হলে নিয়মিত জ্বালানি, গোলাবারুদ, জনবল ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ প্রয়োজন হয়, আর সেই জায়গায় এই আকাশপথকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ সুদানের ভেতরের যুদ্ধের রেখাচিত্র বুঝতে গেলে কেবল মাটির লড়াই নয়, আকাশপথে কীভাবে রসদ ঢুকেছে, সেটিও সমান গুরুত্ব নিয়ে দেখতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানের সবচেয়ে নাটকীয় অংশটি ২০২৫ সালের মে মাসে নিয়ালা বিমানবন্দরে সংঘটিত একটি বিমান হামলাকে ঘিরে। রয়টার্স বলছে, শাউলিস-সংযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত নিবন্ধিত কোম্পানি Occidental Support Services–এর কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি বোয়িং ৭৩৭ সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। প্রত্যক্ষ জ্ঞাত একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বিমানে প্রায় ৫৪ জন আরোহী ছিলেন, যাদের মধ্যে আনুমানিক ৫১ জনই আরএসএফ যোদ্ধা; অধিকাংশই নিহত হন। রয়টার্স আরও জানায়, বিমানের ক্রুদের মধ্যে একজন দক্ষিণ সুদানি পাইলট এবং একজন পেরুভিয়ান এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, যারা শাউলিস-সংশ্লিষ্ট চুক্তির অধীনে কাজ করছিলেন।
নিয়ালার ওই বিমান হামলাকে অনেক পর্যবেক্ষক সুদানের যুদ্ধের এক মোড়বদলকারী ঘটনা হিসেবে দেখছেন। রয়টার্সের বিবরণ অনুযায়ী, এর পরপরই সংঘাত আরও জটিল ও বিস্তৃত হয়; আরএসএফ পোর্ট সুদানে ড্রোন হামলা চালায় এবং খার্তুম সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এই ধারাবাহিকতা থেকেই বোঝা যায়, নিয়ালার হামলা ছিল কেবল একটি উড়োজাহাজ ধ্বংসের ঘটনা নয়; বরং তা যুদ্ধের আঞ্চলিক মাত্রা, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং বহিরাগত সম্পৃক্ততার বিতর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
রয়টার্স আরও বলছে, ওই ৭৩৭ ধ্বংস হওয়ার পর নেটওয়ার্কে দুটি বোয়িং ৭২৭ যুক্ত হয়। এর একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিমান ঠিকাদার Kalitta Charters থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে অন্তত একটি ৭২৭–কে কুফরায় একাধিকবার উড়তে দেখা গেছে। কুফরাকে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এর আগেই আরএসএফে রসদ পাঠানোর একটি কৌশলগত ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তবে এসব বিমানের কার্গো ম্যানিফেস্ট, ক্রয়ের অর্থায়ন এবং প্রকৃত চূড়ান্ত মালিকানা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অস্পষ্টতাই পুরো নেটওয়ার্কটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে, কারণ উড়োজাহাজগুলো কোন আইনি বা করপোরেট কাঠামোর আড়ালে পরিচালিত হচ্ছিল, তা এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
এই অনুসন্ধানটি একা নয়; বরং সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সুদানের সংঘাতকে ঘিরে বহুজাতিক আর্থিক ও লজিস্টিক সমর্থনের একটি বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়। রয়টার্সের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে দ্য সেন্ট্রির এক তদন্তে দুবাইয়ে আরএসএফের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ২৪ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি নেটওয়ার্কের তথ্য উঠে আসে। সেখানে ২০টিরও বেশি বিলাসবহুল ভিলা, অ্যাপার্টমেন্ট ও অফিসের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলো আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালো, যিনি হেমেদতি নামেও পরিচিত, এবং তার ভাইদের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবার-পরিজন, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের আওতায় ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য আরএসএফ শুধু অস্ত্র নয়, সম্পদ সুরক্ষা ও বিদেশে আর্থিক অবস্থান তৈরির কাজও একযোগে চালিয়ে গেছে।
মে মাসে প্রকাশিত Human Rights Watch–এর একটি প্রতিবেদনও রয়টার্সের অনুসন্ধানে গুরুত্ব পেয়েছে। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তায় কলম্বিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধাদের আরএসএফের পক্ষে মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ৮৩ পৃষ্ঠার সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, আবুধাবিভিত্তিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিকিউরিটি সার্ভিসেস গ্রুপের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত যোদ্ধারা আমিরাতের সামরিক স্থাপনা হয়ে সুদানে পৌঁছায়। মানবাধিকার সংস্থাটি উপসংহারে মন্তব্য করে, তাদের হাতে থাকা প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে আমিরাত আরএসএফের যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। যদিও আবুধাবি বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবু বিভিন্ন অনুসন্ধান একসঙ্গে বিবেচনা করলে সুদানের সংঘাতের পেছনে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকাকে আর হালকাভাবে দেখার সুযোগ থাকছে না।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত রয়টার্সের আরেকটি তদন্তেও অভিযোগ করা হয়েছিল যে Ethiopia আরএসএফ-সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ শিবিরের আশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করছে। প্রকাশকাল পর্যন্ত এ অভিযোগের বিষয়ে ইথিওপিয়ার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে নতুন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জুনের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনি সংস্থার একটি জোট International Criminal Court–এর কাছে কয়েকটি দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের আহ্বানও জানিয়েছে; অভিযোগ, তারা দারফুরে সংঘটিত নৃশংস অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন। ফলে সুদানের যুদ্ধ আর কেবল খার্তুম বনাম আরএসএফের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই বহু-দেশীয় সহায়তা, প্রভাব ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে রূপ নিচ্ছে।
আরএসএফ এবং এর বেশ কয়েকজন কমান্ডার ও সমর্থক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন, যার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে সংঘটিত অভিযোগ, যার মধ্যে গণহত্যার অভিযোগ এবং আরএসএফকে অস্ত্র, কর্মী ও সরবরাহ সহায়তা প্রদান অন্তর্ভুক্ত। গত জুন মাসের শেষে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনি সংগঠনগুলোর একটি জোট আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ইথিওপিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুদানের দারফুরে সংঘটিত নৃশংসতার অভিযোগ তদন্তের আবেদন জানিয়েছিল। রয়টার্স সতর্ক করে দিয়েছে যে, আরএসএফকে সামগ্রী সহায়তা প্রদান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত তদন্তের মুখে ফেলতে পারে, তবে সংবাদ সংস্থাটি কোনো প্রমাণ পায়নি যে শাউলিস বা তাঁর কোনো কোম্পানিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে অথবা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ বা কোনো অনিয়মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। শাউলিস নিজে রয়টার্সের বিস্তারিত প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করেছেন এবং কিছু বিষয়ে একজন ব্যবসায়িক সহযোগীর কাছে রেফার করেছেন। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত বারবার অস্বীকার করেছে যে তারা আরএসএফকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে এবং দাবি করেছে যে সুদানে তাদের সম্পৃক্ততা শুধুমাত্র মানবিক। চাদের কর্তৃপক্ষও রয়টার্সকে জানিয়েছে যে তারা এই ফ্লাইটগুলো অনুমোদন করেনি বা কথিত বিমান সেতুতে অংশ নেয়নি এবং তাদের সম্পৃক্ততা শুধু সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ ছিল।
