ট্রানজিটের নামে বাংলাদেশের বন্দর, নদী ও স্থলপথ ব্যবহারের সুযোগ নিতে আওয়ামী লীগ আমলে তিনটি চুক্তি করে ভারত। এসব চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, অভ্যন্তরীণ নৌরুট ও স্থলপথ ব্যবহারের নামে চট্টগ্রাম-মোংলা-পায়রা বন্দর একরকম নিজেদের কবজায় নিয়ে নেয় দিল্লি। বিপরীতে বাংলাদেশের আয়, বাণিজ্যিক সুবিধা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে—তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চুক্তিগুলো সমন্বিতভাবে কার্যকর হলে বাংলাদেশের নৌ ও বন্দর অবকাঠামোয় ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরো গভীর হতে পারে।
আওয়ামী লীগ আমলে করা চুক্তিগুলো হলো—অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্য ইউস অব চট্টগ্রাম অ্যান্ড মোংলা পোর্টস ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু অ্যান্ড ফ্রম ইন্ডিয়া (এসিএমপি), কোস্টাল শিপিং অ্যাগ্রিমেন্ট (সিএসএ) এবং প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি)। এর মধ্যে পিআইডব্লিউটিটিতে পুরোনো চুক্তি নবায়ন করা হলেও অন্য দুটি চুক্তি একেবারেই নতুন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়ন করা চুক্তিতেও নতুন যেসব শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। আর নতুন চুক্তি দুটি পুরোটাই ভারতের স্বার্থে তৈরি করা।
সিএসএ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা এবং ঢাকার কাছে পানগাঁওকেও উপকূলীয় বন্দর হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। এসিএমপির মাধ্যমে বাংলাদেশের নৌ-সীমা ও স্থলভাগ ব্যবহার করে নামমাত্র মাশুল দিয়ে ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য পরিবহনের সুবিধা পাবে দিল্লি। এ চুক্তির বলেই বহুল আলোচিত ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভোগ করে ভারত। আর পিআইডব্লিউটিটির আওতায় ভারতের জাহাজ চলাচলের নির্ধারিত নৌরুটগুলোর নাব্য রক্ষার দায়ও বাংলাদেশের ওপর পড়ে। চুক্তিটি ৫ বছর পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে ভারত দেশবিরোধী এসব চুক্তি আদায় করে নেয়। ২০১৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ ও ভারত চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে। ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর এসিএমপি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারতের পক্ষে আনুষ্ঠানিক আন্তঃসরকারি কাঠামো তৈরি হয়। ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর কাস্টমস, পণ্য, যানবাহন, জাহাজ, রুট, নিরাপত্তা ও নথিপত্রসহ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নির্ধারণ করে এসওপি সই হয়। ২০২০ সালে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় প্রথম পরীক্ষামূলক কনটেইনার চালান পাঠানো হয়।
তিন চুক্তিতে পৃথক রুট নির্ধারণ করা হলেও সমন্বিতভাবে এগুলো বাংলাদেশের নৌ ও স্থলবাণিজ্যে ভারতের ব্যাপক প্রবেশাধিকার তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবগুলো বন্দর ও বাণিজ্যিক ঘাট ভারতের ব্যবহারের আওতায় এলেও বাংলাদেশ ভারতীয় ভূখণ্ডে সমপর্যায়ের সুবিধা পায়নি। পিআইডব্লিউটিটি চুক্তিতে ৮টি রুটে বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক পয়েন্ট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ আহবাবুল ইউসুফ খান জানান, চট্টগ্রাম-মোংলা বন্দর ব্যবহার, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি ও পিআইডব্লিউটিটি—এ তিনটি চুক্তিকে আলাদাভাবে নয়, বরং সমন্বিতভাবে দেখা উচিত। কারণ, আঞ্চলিক যোগাযোগ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করলেও এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ জড়িত।
তার মতে, পিআইডব্লিউটিটির ৫০:৫০ কার্গো শেয়ারিংয়ের পাশাপাশি ‘as far as practicable’ এবং ‘expeditious transportation’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ৫০:৫০ থেকে কখন বিচ্যুতি গ্রহণযোগ্য হবে, কে সিদ্ধান্ত নেবে এবং কী মানদণ্ডে তা নির্ধারিত হবে—চুক্তিতে তার স্বচ্ছ কোনো কাঠামো নেই।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্য ও গবেষণার ঘাটতি। চুক্তিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এবং এগুলোর অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণাও সহজলভ্য নয়। তবে প্রকাশিত অংশ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারত বাংলাদেশের নদী, সড়ক ও বন্দর ব্যবহারের বিস্তৃত সুযোগ পেলেও বাংলাদেশ কী পরিমাণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পাবেÑতা স্পষ্ট নয়। এসব চুক্তিতে মোটাদাগে সব মানদণ্ডেই ‘আনুপাতিক বিচারে ভারসাম্যহীন’ সম্পর্কে জড়িত দুটি দেশের পারস্পরিক সুবিধা, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও কৌশলগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা হয়নি।
এসিএমপি : চট্টগ্রাম-মোংলা দিয়ে ভারতের ট্রানজিট
এসিএমপির মূল উদ্দেশ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্যকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্রুত ও কম খরচে পরিবহনের সুযোগ দেওয়া। এর মাধ্যমে ভারতের পণ্য বাংলাদেশ হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম বা মোংলা হয়ে ভারতের অন্য অংশে যেতে পারে।
চুক্তিতে ৪টি রুট নির্ধারিত হয়েছেÑ১. চট্টগ্রাম/মোংলা-আগরতলা, ত্রিপুরা-আখাউড়া; ২. চট্টগ্রাম/মোংলা-ডাউকি, মেঘালয়-তামাবিল; ৩. চট্টগ্রাম/মোংলা-সুতারকান্দি, আসাম-শেওলা এবং চট্টগ্রাম/মোংলা-শ্রীমন্তপুর, ত্রিপুরা-বিবিরবাজার। প্রতিটি রুটে যাওয়া ও একই পথে ফেরার ব্যবস্থা রয়েছে।
২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবরের চুক্তিতে ১৪টি আর্টিকেল রয়েছে। এর অন্তত ৯টিতেই ভারতের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়েছে। আর্টিকেল-২ অনুযায়ী দুদেশের শিপিং কোম্পানি নিজস্ব বা চার্টার্ড জাহাজে সমুদ্র ও নদীপথে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। তবে তৃতীয় পতাকাবাহী জাহাজকে এ সুবিধায় অংশ নিতে দেওয়া হবে না। একইভাবে চুক্তিবদ্ধ দেশের কোনো শিপিং কোম্পানির জাহাজ তৃতীয় দেশের বন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ বা বহির্মুখী কার্গো পরিবহনে অংশ নিতে পারবে না।
ফলে ভারত বাংলাদেশের বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজ দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য নিতে পারলেও বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সমপর্যায়ের সুবিধা পায় না। আবার তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের সুযোগও সীমিত। তাই এ চুক্তির কোনো সুফল বাংলাদেশ ভোগ করতে পারবে না।
চুক্তিতে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের মতোই ভারতীয় জাহাজের ক্ষেত্রে বন্দরের বকেয়া ও চার্জ জাতীয় বিধি অনুযায়ী নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ভারতীয় জাহাজকে বিদেশি জাহাজের হারে অতিরিক্ত মাশুল দিতে হবে না।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, চুক্তির অধীনে পরিবহন করা পণ্য নিয়মিত ফিজিক্যাল কাস্টমস পরিদর্শনের আওতায় থাকবে না। ফলে এ দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারত কী ধরনের পণ্য তার এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছে, তার কোনো তথ্য বাংলাদেশ যাচাই-বাছাই করতে পারবে না।
আর্টিকেল-৫ অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ভারতীয় পণ্যকে বাংলাদেশি আমদানি-রপ্তানি পণ্যের মতো সুবিধা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জায়গা দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। একই সময় ভারতীয় ও অন্য বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এলে ভারতীয় জাহাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দেওয়ার বিধান রয়েছে।
আর্টিকেল-৮ অনুযায়ী সীমা শুল্ক, প্রশাসনিক ও পরিচালন মাশুল এবং অন্যান্য নির্ধারিত চার্জ ছাড়া অতিরিক্ত করারোপ করা যাবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যবহার করার পরও ভারতীয় পণ্যের ওপর বাড়তি চার্জ আরোপের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) এম শাহজাহান বলেন, চুক্তি তৈরির সময় বাংলাদেশের পক্ষে কমিটিতে তিনিও ছিলেন। তার দাবি, তৎকালীন সরকারের দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার চাপ এত বেশি ছিল যে, দেশের স্বার্থে দরকষাকষির সুযোগ ছিল না। ভারতের চাহিদা অনুযায়ীই চুক্তি করা হয়।
তিনি আরো বলেন, নন-ডিসক্লোজার অবলিগেশনের একটি ধারায় ভারতের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়া কনটেইনারের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়লে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী বাংলাদেশে এসে কনটেইনারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এমন বিধানও ছিল। অথচ এটি যে কোনো স্বাধীন দেশের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সিএসএ : চার প্রধান বন্দরই ‘কোস্টাল পোর্ট’
এ চুক্তিতে চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও পানগাঁওকে উপকূলীয় বন্দর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্লজ-৩(৩)-এ পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালের জন্য জাহাজের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ৭৫ মিটার, প্রস্থ সাড়ে ১৩ মিটার এবং ড্রাফট ৪ মিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে বাংলাদেশের ইনল্যান্ড টার্মিনালের মাপ উল্লেখ থাকলেও ভারতের ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল ব্যবহার করার বিষয়টি উল্লেখ নেই।
এসওপির ক্লজ-২৪-এ ৫০:৫০ কার্গো শেয়ারের কথা বলা হলেও কোন কার্গোতে এটি প্রযোজ্য, ভলিউম কীভাবে হিসাব হবে, কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশ ৫০ শতাংশ না পেলে কী হবে—তার স্পষ্ট রূপরেখা নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, পণ্য পরিবহনের সক্ষমতায় ভারত এগিয়ে থাকায় এই শর্তেও ভারতই লাভবান হবে।
ক্লজ-১৭(৩) অনুযায়ী চুক্তির আওতায় চলাচলকারী জাহাজে পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল (পিএসসি) কার্যকর হবে না। সাধারণত বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ বাংলাদেশের নৌ-সীমায় প্রবেশ করলে নিরাপত্তা, সমুদ্রযাত্রার উপযোগিতা, সনদপত্র ও দূষণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যাচাই করা হয়। এ চুক্তিতে ভারতীয় জাহাজের ক্ষেত্রে সে ব্যবস্থা সীমিত করা হয়েছে।
ক্লজ-১৭/১৭তে এক দেশের সার্টিফিকেট অন্য দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, দুদেশের জাহাজের মান ও বিধিবিধান এক না হওয়ায় এটি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চুক্তিতে বাংলাদেশের সব প্রধান বন্দরকে কোস্টাল পোর্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সঙ্গে পিএসসি সীমিত হওয়ায় ঝুঁকি আরো বাড়ে।
ক্লজ-৭ অনুযায়ী চুক্তির আওতায় চলাচলকারী জাহাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং দিতে হবে। এতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে জাহাজ জট এবং টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্লজ-৩২ অনুযায়ী জাহাজ মালিক বা অপারেটর প্রতিষ্ঠান দুদেশেই অফিস খুলতে পারবে এবং স্থানীয় শিপিং এজেন্টের সহযোগিতা বাধ্যতামূলক নয়। শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, প্রচলিত নিয়মে বিদেশি শিপিং লাইনকে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাতে এ দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হয় এবং ৫১ শতাংশ মালিকানা বাংলাদেশি ও ৪৯ শতাংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের থাকে। ২০২৫ সালের আগে এই অনুপাত ছিল ৬০:৪০। সিএসএ এই কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এতে ভারত বেশি সুবিধা পাবে।
বন্দর বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম জানান, চুক্তি তৈরির সময় প্রধান বন্দরগুলোকে কোস্টাল পোর্ট ঘোষণার প্রতিবাদ করেছিলেন তারা। বলেছিলেন, চুক্তির আওতায় ৬ হাজার টনের বেশি বড় জাহাজ চলাচল করতে পারবে না; ছোট জাহাজ চট্টগ্রাম বা মোংলার জেটিতে ভিড়লে জেটির নিচে অবস্থান করায় অপারেশনে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু তৎকালীন সরকারের নতজানু মনোভাবের কারণে তাদের আপত্তি গুরুত্ব পায়নি। নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী বন্দরকেও চুক্তির আওতায় আনার চেষ্টা করেছিল ভারত; তবে কয়েকজনের তীব্র আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
পিআইডব্লিউটিটি : বাংলাদেশের নদীপথ, ব্যয়ও বাংলাদেশের
ভারতের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নৌপথে বাণিজ্যবিষয়ক মূল চুক্তি প্রথম হয় ১৯৭২ সালের ১ নভেম্বর। ২০১৫ সালের ৬ জুন এতে নতুন ধারা-উপধারা যুক্ত করে ৫ বছর পরপর স্বয়ংক্রিয় নবায়নের শর্ত রাখা হয়। এর ফলে ২০২০ ও ২০২৫ সালে কোনো নতুন আলোচনা ছাড়াই চুক্তিটি নবায়ন হয়ে গেছে।
ক্লজ-২(১) অনুযায়ী প্রত্যেক দেশকে নিজস্ব এলাকার নদীপথ জাহাজ চলাচলের উপযোগী রাখতে হবে এবং রাতের বেলায় জাহাজ ভেড়ার ব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। এ খাতে ভারত বাংলাদেশকে এককালীন ১০ কোটি টাকা দেবে; বাকি ব্যয় বাংলাদেশকে বহন করতে হবে।
ক্লজ-৩(৪)-এ সিরাজগঞ্জ-দাইকাওয়া ও শেরপুর-জকিগঞ্জ রুটকে মূলত ভারতীয় ট্রানজিট ট্রাফিকের জন্য রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নদী অবকাঠামো ও অর্থ ভারতের ট্রানজিটের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ক্লজ-২০-এ ট্রানজিটের জন্য কাস্টমস ডকুমেন্টেশন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা কমানোর কথা বলা হয়েছে। ক্লজ-২৩(১) ও ২৩(২)-এ বাংলাদেশি ট্রাক/ট্রেইলারকে শেরপুর ও আশুগঞ্জ থেকে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত কার্গো নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ভারত থেকে গভীর ড্রাফটের জাহাজে আসা কার্গো বাংলাদেশের নির্ধারিত নৌসীমায় এনে অগভীর জাহাজে ট্রান্সশিপমেন্ট করে ভারতে নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, চুক্তিগুলো ভারতকে বাংলাদেশের নৌপথ ও স্থলপথ—দুই ব্যবস্থাই ব্যবহারের সুযোগ দেয়। ভারত সহজেই বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করে সেভেন সিস্টার্সে কার্গো নিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে কার্গো পাঠাতে চাইলে ভারতের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন হবে। ফলে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের সমান সুযোগ কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হওয়ার ঝুঁকি
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক সালেহ শাহরিয়ার বলেন, এসব চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভারতের ‘ক্লায়েন্ট স্টেটে’ পরিণত করা হয়েছে। কারণ, চুক্তিগুলোর কারণে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষকে ভারতীয় পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক ও যানবাহনকে নিয়মিত কাস্টমস পরিদর্শনের বাইরে রাখতে হবেÑযা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
বিশেষ করে ভারতের নিরাপত্তার দিক থেকে সংবেদনশীল সেভেন সিস্টার্সে কী ধরনের পণ্য যাচ্ছেÑতার ওপর বাংলাদেশ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। পক্ষান্তরে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস ও নিরাপত্তা বাহিনীকে অধস্তন সংস্থায় পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার মতে, এসব চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশ শুল্ক ও কর আরোপের সুযোগও হারিয়েছে।
অধ্যাপক সালেহ শাহরিয়ার আরো বলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ তিনটি চুক্তির কোনোটিই জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়নি। ফলে জনপরিসরে এ নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও জবাবদিহি তৈরি হয়নি। হাসিনা সরকারের পতনের পরও চুক্তিগুলোর একটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান বিএনপি সরকারও এগুলো বাতিলের উদ্যোগ নেয়নি।
পতনের দুবছর পরও বহাল
জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুবছর পার হলেও দেশের স্বার্থবিরোধী বলে সমালোচিত এসব চুক্তি এখনো বহাল রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আমলে দিল্লি কার্যক্রমে অনেকটা ধীরগতির নীতি নেওয়া হলেও এখন আবার চুক্তিগুলোর আলোকে কার্যক্রম আরম্ভের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ভারত।
এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যানেলে ভারত সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। সফর নিশ্চিত হলে অন্যান্য ইস্যুর পাশাপাশি এই তিন চুক্তির ভিত্তিতে নতুন করে কার্যক্রম শুরুর সম্মতি আদায়ের জোরদার চেষ্টা থাকবে ভারতের।
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, শেখ হাসিনার আমলে করা তিনটি চুক্তিই বিতর্কিত এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম হাসিনার পতনের পর সরকার এই চুক্তিগুলো প্রকাশ্যে এনে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করবে। কিন্তু দুবছরেও তেমন কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি। আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচিত সরকার চুক্তিগুলো সংসদে তুলে আলোচনা করে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।
