Sunday, October 4, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে ও পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াআওয়াজযে রাষ্ট্র শিশুকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ - রাষ্ট্র হিসেবে তার মোরাল অথরিটি...

যে রাষ্ট্র শিশুকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ – রাষ্ট্র হিসেবে তার মোরাল অথরিটি কোথায় টিকে থাকে?

স্কুল বা মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়া শিশুটি যখন আর ফিরে আসে না, তখন শুধু একটি পরিবারই নিঃস্ব হয় না, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো কাঠগড়ায় দাঁড়ায়। যে বয়সে শিশুদের হাতে খাতা-কলম থাকার কথা এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই আজকে শিশু-কিশোরদের হাতে দেখা যাচ্ছে মাদক, অস্ত্রসহ ভয়ংকর সব উপকরণ। আর এভাবেই শিশু কিশোররা অপরাধ জগতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কোনো যুদ্ধ বা প্রকাশ্য সংঘাতের মুখোমুখি না হয়েও একটি সমাজ কীভাবে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে, তার এক নির্মম ও রক্তাক্ত দলিল আজকের বাংলাদেশ।

রামিসার রক্তাক্ত স্মৃতি মুছতে না মুছতেই আরও দেশজুড়ে একের পর এক শিশু নিখোঁজের ঘটনা আমাদের সামনে আসতে থাকে। যেমন, ১০ বছরের তানভীর, ৯ বছরের আলি হোসেন আর কুমিল্লার লালমাই পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের ঘটনাটিও রয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-আগস্টের মধ্যে ৭০৯টি শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে, আর প্রাণ হারিয়েছে ২৫৪টি শিশু। আল্লাহর দরবারে এই শিশুদের প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব কী জবাব দেবে রাষ্ট্র? যে শিশুটির দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল সমাজের ও রাষ্ট্রের, সে আমানতের খেয়ানত দেখে আজ বারবার মনে পড়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই বাণী — প্রত্যেকেই তোমরা দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একটি শিশু ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে মায়ের কোলে ফিরে আসবে, এই সামান্য নিশ্চয়তাটুকুও কি এই রাষ্ট্র দিতে পারে না?

যে ঘরগুলো একদিন শিশুর হাসিতে মুখর ছিল, আজ সেসব ঘরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। অপেক্ষা শুধু একটি ফোনকলের, দরজায় একটি কড়া নাড়ার শব্দের। শোকাতুর বাবা-মা প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন সেই চিরচেনা ডাক, “মা…” কিংবা “বাবা…” শোনার। আর পুলিশের হিসাব বলছে, এমন অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সংখ্যা এখনো দুই হাজারের বেশি।

একেকটি নিখোঁজ শিশু যেন আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একেকটি প্রশ্ন। নিখোঁজের ডায়েরিতে জমতে থাকা অসংখ্য নাম শুধু কিছু সংখ্যা নয়। প্রতিটি নামের পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি মায়ের ঘুমহীন রাত, একটি বাবার অসহায় ছুটে চলা, আর একটি ঘরের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া হাসি। যে রাষ্ট্রে একটি শিশু নিরাপদে স্কুলে গিয়ে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা পায় না, সে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কেবলই অর্থহীন। আর এখানেই সবচেয়ে নির্মম প্রশ্নটি ফিরে আসে! রাষ্ট্র যখন তার সবথেকে দুর্বল নাগরিকের নিরাপত্তায় বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে তখন সে রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও অস্তিত্বের নৈতিক ভিত্তিটাই বা কোথায়?

একের পর এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার পেছনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সর্বগ্রাসী মাদক আর বেপরোয়া কিশোর গ্যাং কালচার। কিন্তু জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা প্রশাসন দাড়ি-টুপি ওয়ালা সাধারণ মুসলমানদের ব্যপারে কঠোর হলেও কিশোর গ্যাং কালচারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রমতে, সারা দেশে কিশোর গ্যাং বর্তমানে ২৩৭টি। এসব গ্যাংয়ের মোট সদস্য অন্তত ৫০ হাজার। এরা এক প্রকার নির্ভয়েই রাজধানীসহ সারা দেশে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে কোমল নাগরিকের জীবন নিয়ে খেলা করা অপরাধীরা দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। অথচ এই দায়হীনতার সুযোগ পরোক্ষভাবে তৈরি করে দেয় আমাদেরই বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ শিশু আইন ২০১৩-এর ৩২ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, শিশু-আদালতে শিশুর প্রথম উপস্থিতির তারিখ থেকে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও আদালতে অভিযোগপত্রই জমা পড়ে না, বিচার সম্পন্ন হওয়া তো দূরের কথা! যেখানে অপরাধীর সর্বোচ্চ ও কঠোর শাস্তির (যেমন—জনসম্মুখে বা তাৎক্ষণিক বিচার) দাবি যখন সাধারণ মানুষ করেন, তখন প্রচলিত বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার কর্মী কিংবা রাষ্ট্রের উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে প্রায়ই এই কথাটি বলা হয় যে “আমরা মধ্যযুগীয় বর্বরতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছি, অপরাধীরও আইনি অধিকার ও বিচার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।” তখন প্রশ্ন জাগে, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তাটুকুও নিশ্চিত করতে ব্যর্থ সেখানে এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে আমরা কিসের আশায় ট্যাক্স দেই?

কাগজকলমে প্রণীত কথিত “শিশু আইন” কিংবা বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা আজ এক নির্মম তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়, যা অপরাধীদের অভয় দিয়ে যাচ্ছে আর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ঠেলে দিচ্ছে হতাশা আর অনিশ্চয়তার দিকে। একটি সমাজ কতটা পচে গেলে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এভাবে হারিয়ে ফেলে? আর কত মায়ের বুক খালি হলে, কতটি শিশুর নিথর দেহ এভাবে ঝরে পড়লে আমাদের নীতিনির্ধারক ও সমাজের ঘোর ভাঙবে? সময় ফুরিয়ে আসছে; আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত উদাসীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবিলম্বে ভাঙতে না পারলে, এই ধ্বংসের দায় কোনো দিনই এড়াতে পারবে না এই সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 2 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য