আওয়ামী আমলে আমাদের পক্ষে অনেক কিছুই বলা ও লেখা সম্ভব ছিল না। এমনকি আমরা অনেক সময় পরিচিত জনের সাথেও অনেক কিছু শেয়ার করতে পারতাম না। সেই তুলনায় এখনও আমরা ঢের ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ। আগে আমরা হয়তো একটু বেশিই ধর্মের দিকে ঝোঁকা ছিলাম। তবে এখন যেহেতু স্বাধীনতা আছে সেহেতু আমরা সব বিষয়েই নিজস্ব মত প্রকাশ করছি। এটা অনেক ক্ষেত্রেই ভালো। মত প্রকাশের ফলে অনেক সমস্যারই সমাধান মিলছে। তবে সমস্যা হচ্ছে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সচেতনতা ও এক্টিভিটি আমাদের রুহানিয়াতকে নষ্ট করে ফেলছে।
ফলে আমরা দেখছি লোকেরা দ্বীনি ইলম অর্জনের চেয়ে অন্যান্য যে কোনো ইস্যুতে সম্পৃক্ত হতে অধিক পছন্দ করছে। দ্বীনি পড়াশোনা যে এখন কোন তলানিতে ঠেকেছে তা কেবল আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
দেখতে শুনতে ধার্মিক ধরণের মানুষের মুখের ভাষা আজ কহতব্য নয়। অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ ও গালি দেয়া পর্যন্ত ট্রেন্ডি বিষয় হয়ে গিয়েছে। এর মাধ্যমে অনেকেই জাতে উঠতে চেষ্টা করছে! অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে মু’মিন কথায় ও কাজে অশ্লীল হয় না (وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ)। [১]
মানুষের মাঝে হালাল হারাম বোধ অনেক দিক দিয়েই লোপ পেয়েছে। এমনিতেই তো সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কোনো ধরণের অশ্লীল বিষয় সামনে চলে আসে অনায়াসে। এর ওপর দেখা যাচ্ছে দেখতে শুনতে ধার্মিক লোকজন অনেক ক্ষেত্রে একটা অশালীন বিষয়কেও শেয়ার করছে। তাদের খেয়াল নেই অথবা তারা এই বোধ হারিয়ে ফেলেছে যে তাদের শেয়ারের ফলে যারা এসব দেখছে তাদের পাপের দায়ভারও নিজেদের ওপর আসবে। অথচ মু’মিনদের মাঝে অশ্লীলতার প্রচারের ফল হিসেবে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক সাজার (عَذَابٌ أَلِیمࣱ) ধমকি দেয়া হয়েছে খোদ কুরআনে। [২]
ধরুন আপনি একটা পাপকর্মের বিপক্ষে লিখবেন, এজন্য তো আসলে জরুরি নয় যে আপনি সেটা শেয়ার করে লিখবেন। মূল বিষয়টা উল্লেখ করেও তো খণ্ডন করা যায়। অথচ এতটুকু কষ্ট সইতে আমরা চাই না। মাঝে থেকে পাপ বাড়ে। এটা আনাস [রা.] এর ঐ কথাটাই মনে করিয়ে দেয়, “তোমরা এমন সব কাজ করে থাক, যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও চিকন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময়ে আমরা এগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম”। [৩]
আর একে অপরের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ও গীবতের কথা আর কি-ই বা বলব। এগুলো সম্পর্কে আসলে নতুন করে বলার তেমন কিছু নাই।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে হকের ওপর অটল থাকার প্রতি মানুষের আত্ম উৎসর্গী মনোভাবও আজ দূর হবার পথে। রাজনৈতিক সম্পর্কের ফলে কিংবা অন্য কোনো কারণে মানুষ একে তো যে কোনো বাতিল শক্তির সাথে আপোষে লিপ্ত হয়েছে, উপরন্তু এগুলোকে কোনো বিষয়ই মনে করছে না। অথচ ইমাম আবু উসমান আস সাবূনী [রাহ.] আহলুস সুন্নাহর আক্বীদাহ উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, “তারা তাদের কথা শোনে না, তাদের সঙ্গে বসে না, দ্বীনের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে বিতর্ক বা তর্ক করে না”। [৪]
মনে হচ্ছে সকল ধরণের আত্মীক রোগই আজ আমাদের মাঝে জেঁকে বসেছে। আমলের কমতির ব্যাপারে এটুকু তো বলাই যায় যে, আজ ইলম আমাদের পক্ষে নয়; বরং বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবার পর্যায়ে পৌঁছেছে। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই এ অবস্থা থেকে।
সর্বোপরি, এ রকম অবস্থাতে আমরা উচ্চাশা নিয়ে বসে আছি! ভাবছি দ্বীনের বিজয় তো দরজায় দাঁড়িয়ে। আসলে, দ্বীনের বিজয় সুদূর পরাহত। আমার কেবল মনে হয় যে আমরা এক পা আগাচ্ছি আর ১০ পা পেছাচ্ছি।
এক্ষেত্রে একটা কথাই বলতে পারি যে, আমাদের অন্তর, জবান আর কাজেকর্মে মিল থাকা খুব জরুরি। যদি আমরা আসলেই দ্বীনের ব্যাপারে, দ্বীনের বিজয়ের ব্যাপারে, দ্বীন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সত্যবাদী হই, তাহলে নিজেদের আমলেও এর প্রমাণ থাকা আবশ্যক। নিজের কাজেকর্মে ঐ দৃঢ়তা থাকা আবশ্যক। যেমন কবি আবু তাম্মাম আত তাঈ বলেছিলেন, “যখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা মহান হয়, তখন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেহ ক্লান্ত হয়”। [৫]
অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সচেতনতা আমাদের রূহানিয়াতকে যেন শেষ করে না দেয়। তাহলে আমাদের কেবল খোলসটাই বাকি থাকবে। ভেতরে সব শেষ হয়ে যাবে।
[১) ইমাম বুখারী (রাহ.), আল আদাবুল মুফরাদ, হা: ৩১২, শাইখ আলবানীর (রাহ.) মতে সহীহ;
২) সূরা নূর: ১৯;
৩) ইমাম বুখারী (রাহ.), আস সহীহ, হা: ৬৪৯২;
৪) শাইখ আব্দুল আযীয আর রাজিহী, শারহু আক্বীদাতিস সালাফ ওয়া আসহাবিল হাদীস: ১৪/১৫;
৫) ইমাম আল মাওয়ার্দী (রাহ.), আদাবুদ দুনইয়া ওয়াদ দ্বীন, পৃ: ৩১৮]
