সিন্ধু পাকিস্তানের সাতটি প্রদেশের একটি। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। সিন্ধুর ভূ-প্রকৃতি সিন্ধু নদের পার্শ্ববর্তী পলল সমভূমি,ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর প্রদেশের পূর্ব অংশে থর মরুভূমি এবং প্রদেশের পশ্চিম অংশে কির্থর পর্বতমালা নিয়ে গঠিত। সিন্ধুকে বাবুল ইসলাম (ইসলামের প্রবেশদ্বার) হিসেবে উল্লেখ্য করা হয়।
কারণ সিন্ধু ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম অঞ্চল হিসেবে ইসলামী শাসনের অধীনে অন্তর্ভুক্ত হয়।
পাক-ভারত উপমহাদেশের সঙ্গে আরবদের সম্পর্ক অতি পুরনো। ইসলাম-পূর্ব যুগের আরবরা বাণিজ্য সফরে এখানে যাতায়াত করত। ইসলামী যুগে খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলেই (৪০ হিজরির মধ্যেই) পাক-ভারতের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত মুসলিম প্রচারক ও আরব বণিকদের আগমনের বিষয়ে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।
বনি উমাইয়াদের আমলে খলিফা ওয়ালিদের সময় (৮৬-৯৬ হি./৭০৫-১৪ ই.) ৯৩ হি./৭১১ ইং মোহাম্মদ ইবনে কাসিম কর্তৃক নিয়মিতভাবে সিন্ধু বিজিত হয় এবং তা খোরাসান প্রদেশের অংশরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমন্ত এলাকায় পরিণত হয়। মুসলিম যোদ্ধাদের একদল লোক স্থায়ীভাবে সিন্ধুতে বসতি স্থাপন করেন এবং দ্বিন প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তাদের অনেকেই ছিলেন তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ি।
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত সিন্ধু রীতিমতো কেন্দ্রীয় শাসনেরই অধীনে থাকে।
অতঃপর কেন্দ্রীয় শাসনমুক্ত হয়ে তা কতক ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়। পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম দিকে (৪১২ হি.) সুলতান মাহমুদ গজনবী খাইবার গিরিপথে ভারতে প্রবেশ করেন এবং পাঞ্জাব ও সিন্ধু বিজয় করে গজনি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
সাহাবিদের যুগে এ সিন্ধু প্রদেশের কাজি ছিলেন হুকাইম বিন জাবালা আবদি (রহ.)। তিনি রাসুল (সা.)-এর যুগের দেখা পেয়েছেন। তবে রাসুল (সা.)-এর সাক্ষাৎ ও তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করার প্রমাণ মিলে না।
তিনি অত্যন্ত ধর্মভীরু ও সৎ ব্যক্তি ছিলেন। নিজের গোত্রের মর্যাদাবান ও শ্রদ্ধাস্পদ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কবিতাচর্চায়ও তাঁর বিশেষ দখল ছিল। তাঁর রচিত দুটি পঙক্তি হলো এই-
আমাদের দিনার শেষ হয়ে যাওয়াটা কোনো বিপদই নয়।/বরং জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ফুরিয়ে যাওয়াটাই হলো মহাবিপদ। যেসব ব্যক্তি কালের আবর্তনে হারিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে নিষ্কলুষ, দানশীল ও উদার ব্যক্তিই হলো সর্বাধিক মর্যাদাবান।
তাঁকে সর্বপ্রথম ইসলামী পর্যটক ও ভ্রমণকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। উসমান (রা.) হুকাইম বিন জাবালাকে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়ে সিন্ধু প্রেরণ করেছিলেন। পরে তাঁকে সিন্ধুর কাজি বানিয়ে প্রেরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম কাজি; যাকে উসমান (রা.) ভারতবর্ষে নিয়োগ দেন। তিনি ভারতবর্ষ ভ্রমণ করে অত্যন্ত বিস্তারিত ও সুনিপুণ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে এখানকার সরকারি, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। তিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতে বসরায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি উসমান (রা.)-এর পক্ষ থেকে সরে গিয়ে আলী (রা.)-এর সমর্থকদের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যান এবং অত্যন্ত বীরত্ব ও দৃঢ়তার সঙ্গে সেই পথে জীবন উৎসর্গ করে দেন।
তথ্যঋণ : সিয়ারু আলামিন নুবালা/ ইমাম জাহাবি (রহ.), খোলাফায়ে রাশেদিন আওর হিন্দুস্তান/কাজি আতহার মোবারকপুরি (রহ.)
লেখক : শিক্ষক ও অনুবাদক
