পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও বাণিজ্য সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হওয়া ঝুঁকি মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো। জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিভিন্ন উৎস থেকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন নেতারা। শনিবার ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়। ১০ সেপ্টেম্বর ব্রেন্টের দাম ১০৭ দশমিক ৬৩ ডলারে লেনদেন শেষ হয়। এর আগে একই দিনে দাম ১০৮ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।
ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় রাখা, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা এবং আন্তঃদেশীয়সহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর সুরক্ষা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
সম্মেলন শেষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব সুধাকর দালেলা বলেন, ব্রিকস নেতাদের আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, ব্রিকসের ভেতরে জ্বালানি সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
দালেলা বলেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে বৈশ্বিক বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে সদস্য দেশগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ব্রিকসের ঘোষণাতেও বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলো নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব ঘিরেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর সউদী আরব হামলার পর তার ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়। পাইপলাইনটি প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রাখে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। মোদি-পুতিন বৈঠকে জ্বালানি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে মোদি-শি বৈঠকে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সরবরাহ শৃঙ্খল জোরদারের বিষয় গুরুত্ব পায়।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এবারের ব্রিকস সম্মেলনে জ্বালানি ও বাণিজ্যের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, একতরফা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসে।
