এক পাকিস্তানী টেইলারের মোবাইলে কিছু প্রোগ্রাম ডাউনলোড করে দিচ্ছিলাম ৷ এমন সময় মাঝ বয়সী এক সৌদি মহিলা একটা কাগজে মাপ আর একটা ব্যাগে কাপড় দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, জামাটা কবে শেষ হবে? টেইলার বলল, পনেরো দিন পর ৷ ভদ্রমহিলা তার পাশে দাঁড়ানো মাঝ বয়সী লোকটাকে দেখিয়ে বললেন, আগামী সপ্তাহে আমার স্বামীর বিয়ে, টাকা পয়সা কোন সমস্যা না আমাকে এই সপ্তাহের মাঝেই জামাটা দিতে হবে ৷
নেকাবে মুখ ঢাকা থাকলেও বোঝতে পারছিলাম স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে ভদ্র মহিলা খুবই উৎফুল্ল ৷ জীবনে প্রথম এমন ঘটনা চোখে দেখে অনেকটা তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম ৷ পরে আরো কিছু এমন ঘটনা দেখেছি ৷ আরবের লোকেরা সাধারণত যখন কোন ব্যক্তির কাজে খুশি হয় তখন এই বলে দোয়া করে, আল্লাহ আপনাকে বিয়ে করার তৌফিক দান করুক ৷ অনেক সময় ছেলে বাবাকে, বাবা ছেলেকে আরেকটা বিয়ে করার তৌফিক দান করার দোয়া করে ৷
আরব দেশগুলোতে আপনি পঁচিশ বছরের যুবকের যেমন একাধিক স্ত্রী দেখবেন, তেমন পঞ্চাশ বছরের অবিবাহিত লোকও দেখবেন ৷ পনেরো বছরের মেয়ের কোলে সন্তান দেখবেন আবার চল্লিশ বছরের অবিবাহিত মহিলার কথাও জানতে পারবেন ৷ একজন এ্যারাবিয়ান পুরুষ চাইলেই বিবাহ করতে পারে না ৷ বিবাহের জন্য তাকে গাড়ি, বাড়ির মালিক হতে হবে ৷ মেয়ের বাবাকে উপযুক্ত দেনমোহর প্রদান করতে হবে ৷ যার বিবাহের যোগ্যতা আছে সে এক বা একাধিক বিবাহ করছে, যার যোগ্যতা নেই সে অর্জনের চেষ্টা করছে ৷
আমাদের দেশে যারা আর্লি ম্যারেজ বা একাধিক বিবাহের ক্যাম্পেেইন করেন তাদের অধিকাংশ বিবাহ নিয়ে সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিতে ভোগেন ৷ এমন অনেক ব্যক্তি পাবেন যারা দাদা-নানা হয়েছেন, যদি জিজ্ঞেস করেন স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করেছেন কি না, তারা এমন একটা ভাব ধরবে যেনো আপনি ভিন গ্রহের বা ভিন্ন ধর্মের লোক ৷ যদি জিজ্ঞেস করা হয় স্ত্রীর সাথে একান্ত সময়ে কি দোয়া পড়তে হয়, তারা হা করে তাকিয়ে থাকবে ৷ কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ে করতে হবে, চারজন স্ত্রী রাখতে হবে এটা ঠিকই জানে ৷
আরবের লোকেরা সাধারণত মধু, মাখন, গাওয়া, যইতুন, আপেল, আঙ্গুর সহ বিভিন্ন প্রকার ফলমূল খেয়ে থাকে যা পুষ্টিকর এবং শক্তিবর্ধক ৷ জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর (ডাব্লিউএফপি) গবেষণা মতে, বাংলাদেশে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষের পুষ্টিকর খাবার জোগাড়ের ক্ষমতা নেই ৷ যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৩% । যে ৮৭% মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রয়েছে, তাদেরও একটি বড় অংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন শুধুমাত্র সচেতনতা ও নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্যতার অভাবে । আরবের যুবকেরা প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা করে, আর আমাদের দেশে অনেকে বিভিন্ন প্রকার এ্যালকোহল গ্রহণের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করে ৷ যার ফলে এক সময় দাম্পত্য জীবনে ব্যর্থ হয়ে বিভিন্ন প্রকার কবিরাজ, হাতুড়ে ডাক্তারের অপচিকিৎস্যার দ্বারস্থ হয় ৷ যার ফল হয় আরো মারাত্মক ৷
জেলখানায় এক সৌদির দেখা পেয়েছিলাম, যার স্ত্রী থানায় তার বিরূদ্ধে মদপান করার অভিযোগে করেছিল ৷ পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে জেলে নিয়ে যায় ৷ আরেকজনের স্ত্রী তার বিরূদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিল ৷ পরবর্তীতে স্ত্রীরাই আবার জেল থেকে ছাড়িয়ে আনে এবং ঐ স্ত্রীদের নিয়েই তারা সংসার করছে ৷ আমাদের দেশে কোন মেয়ে যদি স্বামীর বিরূদ্ধে অভিভাবকদের নিকটও নালিশ করে, তাও অনেক পুরুষের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে ৷
ওসব দেশে মেয়েদের যে কোন অভিযোগকে আগে প্রাধান্য দেওয়া হয় ৷ বাজার থেকে কোন সদাই কিনতে হলে তারা আগে স্ত্রীর পছন্দকে প্রাধান্য দেয় ৷ আর আমাদের দেশে স্ত্রী মানে হলো ঘরের একজন দাসী ৷ তার কোন চাওয়া-পাওয়া থাকবে না ৷ কোন স্বামী যদি স্ত্রীর চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দেয় বা দেওয়ার চেষ্টা করে তখন আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী তাকে বৌ পাগল বা বৌ এর গোলাম বলে উপহাস করে ৷ ফলে কেউ কেউ স্ত্রীকে সম্মান দিতে গিয়েও সামাজিক চাপের ভয়ে চুপ থাকে ৷
আরব দেশে সাধারণত কেউ কারো স্ত্রী নিয়ে মাথা ঘামায় না ৷ একই বিল্ডিং থেকেও ছেলের অনুপস্থিতে বাবা ছেলের বৌ এর ফ্ল্যাটে যাবে না, ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে অন্য ভাই তার স্ত্রীর সাথে কথা বলবে না ৷ আমাদের দেশে কেউ যদি স্ত্রীকে পর্দার আড়ালে রাখতে চায়, তাহলে সবাই মনে করে বিবাহ করে ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেছে ৷ ইসলামের বাস্তব সৌন্দর্য দেখতে হলে আপনাকে জাযিরাতুল আরবের লোকদের দেখতে হবে ৷
আমরা সাধারণত অর্থ, বিত্ত, পদ দিয়ে উত্তম-অধম নির্ধারণ করি ৷ কিন্তু রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম ৷” আরবের লোকেরা সাধারণত সেটাই অনুসরণ করে ৷ একজন স্বামীর স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব কি, সে আলোচনার চেয়ে একজন পুরুষ চারটা বিয়ে করতে পারবে সেই আলোচনায় আমাদের ধার্মিকরা বেশি মশগুল ৷ আর এসব শোনেই তৈরি হয় বেগম রোকেয়া, তসলিমা নাসরিনরা ৷
নিকটাত্মীয় এক ছোট ভাইয়ের বিবাহ নিয়ে কথা উঠার পর বলেছিলাম- আপনার ছেলের কাছে যারা মেয়ে বিয়ে দিবে তারা হয় বোকা, না হয় লোভী ৷ যে ছেলে নিজে উপার্জন করে জীবনে কোনদিন তার মাকে একটা কাপড়, বাবাকে একটা লুঙ্গী, ছোট বোনকে এক জোড়া চুড়ি, ছোট ভাইকে একটা বল কিনে দিতে পারেনি, তার কাছে বোকা লোক ছাড়া কেউ মেয়ে দিবে না ৷ ছেলের বাবার অর্থ-সম্পদের দিকে তাকিয়ে কেউ কেউ লোভে পড়তে পারে ৷
কথাটা ঊনাকে এমনভাবে আঘাত করেছিল যে বিয়েতে দাওয়াতও দেয়নি ৷ দাওয়াত না পাওয়াতে আফসোস হয়নি, আফসোস লেগেছিল যে কথাটা হয়তো আমি ঊনাকে এভাবে সরাসরি না বলে অন্যভাবেও বলতে পারতাম ৷ যাই হোক বিয়ের পর পাত্রীপক্ষ ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছিল, ছেলের বাবার যাই আছে ছেলের কিছু নাই ৷ দু’জনের বয়স কম ৷ কেউ কাউকে বোঝে না ৷ দাম্পত্য কলহে কখনো ছেলে সুইসাইড করতে যায়, কখনো মেয়ে ৷ সবাই মিলে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদের শান্ত করতে হয়েছে ৷
বিয়ে কোন সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি নয়; এটি ইবাদত, কঠিন এক দায়িত্ব ৷ যারা বিবাহ নিয়ে যুবকদের বিভিন্নভাবে উৎসাহিত ও আগ্রহী করেন তারা কিন্তু দায়িত্ববোধ নিয়ে সচেতন করেন না ৷ ফলে বিবাহের কয়দিন পরেই রঙ্গীন স্বপ্নগুলো সাদা কালো হয়ে উঠে ৷ শুরু হয় দাম্পত্য কলহ ৷ ডিভোর্স থেকে শুরু করে যা অনেকক্ষেত্রে সুইসাইড পর্যন্ত গড়ায় ৷
