Thursday, September 10, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াবিবাহ বিচ্ছেদের মহামারী: আমরা কোথায় হারিয়ে গেলাম?

বিবাহ বিচ্ছেদের মহামারী: আমরা কোথায় হারিয়ে গেলাম?

বিবাহ বিচ্ছেদের মহামারী: আমরা কোথায় হারিয়ে গেলাম?

গ্রামের বাড়িজুড়ে তখন উৎসবের আমেজ থাকে। লাল বেনারসি, জমকালো আলোকসজ্জা আর গোলাপের ঘ্রাণে চারপাশ ম-ম করে। কিছু সাক্ষী আর আল্লাহ তা’আলার ওপর ভরসা করে কবুল বলার মাধ্যমে আমরা দুজন মানুষকে একই সুতোয় বেঁধে দেই। স্বপ্ন দেখি এক দীর্ঘ যাত্রার, যে যাত্রার গন্তব্য হবে জান্নাত।

একটা সময় ছিল যখন ঘর ভাঙার শব্দ শুনলে পাড়ার বাতাস ভারী হয়ে আসত, বড়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, আহা! একটা সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল। তখনকার দিনে মানুষ বিয়ে করত জীবনকে একটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য। পছন্দের প্রিয় জামাটা ছিড়ে গেলে যেমন মানুষ ফেলে দেয় না, সেলাই করে আবার গায়ে দেয় তেমনি সম্পর্কের সুতো একটু আলগা হলে মানুষ সেটা ত্যাগের সুঁই-সুতো দিয়ে সেলাই করতে জানত।

কিন্তু আজ সময় বদলেছে। এখনকার বিয়েগুলো যেন কোনো দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকার নয়, বরং শোরুম থেকে কেনা দামী কোনো ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের মতো। যার ওপর কয়েক মাসের ওয়ারেন্টি আছে, কিন্তু গ্যারান্টি নেই। পছন্দ না হলে কিংবা সামান্য একটু খুঁত দেখা দিলেই আমরা তা নির্দ্বিধায় রিটার্ন করে দিচ্ছি। আমাদের এই প্রজন্ম বিয়ে করছে জীবন গড়ার জন্য নয়, বরং জীবনকে এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, ঢাকায় প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। ২০২২ সালে শুধু রাজধানী ঢাকায় তালাকের ঘটনা হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ৩৭টি করে। বর্তমানে পরিস্থিতি তো দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে, সেটা দেখতেই পাচ্ছেন।

এই শতাব্দিতে এসে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ শব্দটা এখন আর আমাদের কানে বিষ ঢেলে দেয় না, বরং এটা এখন ডাল-ভাতের মতো স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতের করিডোরে আজ তালাকের যে স্তূপ, তা কেবল পরিসংখ্যান নয়; ওটা আমাদের নীতি-নৈতিকতা আর একে-অপরের প্রতি বিশ্বাসের কঙ্কাল রূপে দাঁড়িয়েছে।

কেন এমন হচ্ছে? কেন সেই মানুষগুলো, যারা একসময় “মরলে এক কবরেই শোব” বলে কসম কেটেছিল, তারা আজ একে অপরের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতে চায় না? কোথায় হারিয়ে গেল সেই গভীর মমতা, সেই নিঃস্বার্থ ক্ষমা আর সেই “তোমার সাথেই থাকব” বলে করা কঠিন শপথগুলো? কোথায় হারিয়ে গেলে সেই শক্ত কথাটি “লাল বেনারসি পরে এসেছি এই ভিটায়, সাদা শাড়ি পরেই বের হব”।

প্রতিটি বিচ্ছেদের পেছনে কেবল দুটো মানুষের আলাদা হওয়া থাকে না, থাকে একটি সভ্যতার ভেতর থেকে ধসে পড়ার দীর্ঘ আর্তনাদ। এই সংকটের মূলে গিয়ে আমাদের একটু ভাবা দরকার, আমরা আসলে কোথায় ভুল করছি? কেন আমাদের ঘরগুলো আজ কেবল ইট-পাথরের খাঁচা হয়ে যাচ্ছে, শান্তির নীড় নয়? চলুন, সেই গভীর অসুখের কারণগুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা করি।

১. আমরা এখন চাওয়ার দাস:

মানুষ এখন আর মানুষকেন্দ্রিক নেই; মানুষ এখন হয়ে গেছে ইচ্ছাকেন্দ্রিক। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে আমি শব্দটা আমরার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সম্পর্কের ব্যাকরণে আমরা এখন কেবল উত্তম পুরুষটাই বুঝি, অন্যকে জায়গা দিতে শিখিনি।

বিয়ে মানে আগে ছিল দুটো আধো-চেনা মানুষ মিলে শূন্য থেকে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন গড়ে তোলা। অভাব থাকবে, অভিযোগ থাকবে, কিন্তু দিনশেষে একটা শক্ত হাত থাকবে, যে আবার বুকে টেনে নিবে।

কিন্তু বর্তমান সময়ের বিয়ের সংজ্ঞাটা বদলে গেছে। এখন বিয়ে মানে হলো আমার যাবতীয় অপূর্ণতা আর সব চাওয়া পূরণ করার একটা গ্যারান্টি কার্ড। আমরা চাই আমাদের সঙ্গী হবে একজন সুপারহিউম্যান। তার কাছে আমাদের প্রত্যাশার তালিকাটা দীর্ঘ, সে আমাকে অঢেল ভালোবাসা দিবে, চরম নিরাপত্তা দিবে, সিনেমার মতো রোমান্স উপহার দিবে, আবার আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও কেড়ে নিবে না! আমি সঙ্গও চাই, আবার যখন খুশি একাকীত্বও চাই। সবই চাই একজনের কাছে, ঠিক এই মুহূর্তেই।

এই যে ডিমান্ড-লিস্ট নিয়ে আমরা বিয়ের দরজায় দাঁড়াই, এখানেই বিয়ের মৃত্যু ঘটে। কারণ, বিয়ে কোনো চকচকে সুপারমার্কেট নয় যে আপনি একটা ট্রলি হাতে নিয়ে ঢুকবেন আর নিজের পছন্দমতো সবকিছুতে ব্যাগ ভরে বেরিয়ে আসবেন। বিয়ে হলো একটা জংলি বাগান, যেখানে শুরুতে কেবল আগাছা থাকে। সেখানে ফুল ফোটাতে হলে আপনাকে ঘাম ঝরাতে হয়, রোদে পুড়তে হয়, পরম মমতায় পরিচর্যা করতে হয়। কখনো প্রচণ্ড খরায় ধৈর্য ধরতে হয়, আবার কখনো ঝড়ে আগলে রাখতে হয়।

কিন্তু আফসোস! আজকের মানুষ দিতে রাজি নয়, সে কেবল পেতে চায়। সে মনে করে, যে সম্পর্কের বাজার থেকে যত বেশি আদায় করতে পারবে, সেই বোধহয় জিতে গেল। কিন্তু সম্পর্কের হিসাবটা তো এমন নয়। সংসার কোনো ব্যাবসায়িক ডিল নয় যে আপনি শুধু লভ্যাংশ খুঁজবেন। সংসার হলো এক আধ্যাত্মিক বিনিয়োগ, যেখানে আপনি নিজেকে যত বেশি বিলিয়ে দিবেন, আপনার ঘর তত বেশি প্রশান্তিতে ভরে উঠবে। যে সংসারে জেতা-হারার যুদ্ধ শুরু হয়, সেই সংসার আসলে আর সংসার থাকে না; ওটা হয়ে যায় এক অশান্ত রণক্ষেত্র।

২. ধর্মহীনতা:

কথাটা শুনতে একটু কড়া মনে হতে পারে, কানে একটু খটকাও লাগতে পারে। কিন্তু নগ্ন সত্য হলো, আমরা যত বেশি স্রষ্টাবিমুখ হচ্ছি, আমাদের সম্পর্কের বাঁধনগুলো তত বেশি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। যে সমাজ আজ যত বেশি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হওয়ার দাবি করছে, যেখানে আল্লাহর ভয় নেই, আখিরাতের দায়বদ্ধতা নেই, নেই কোনো চূড়ান্ত জবাবদিহিতার ভয়, সেই সমাজেই আজ বিবাহের পবিত্রতা সবচেয়ে বেশি ঠুনকো।

কেন? কারণটা খুব সাধারণ।
একটা ঘর টিকিয়ে রাখতে কেবল ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; সেখানে লাগে পাহাড় সমান ত্যাগ, লাগে অসীম ক্ষমা আর এক সমুদ্র সহ্য ক্ষমতা। এখন প্রশ্ন হলো, এই ত্যাগ আর ধৈর্যের রসদ আসবে কোত্থেকে? মানুষ কেন নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে অন্যকে সুখে রাখবে? এই অনুপ্রেরণা আসে কেবল বিশ্বাস থেকে।

যখন একজন মুমিন জানে যে, তার জীবনসঙ্গীর সাথে করা প্রতিটি ইনসাফ, প্রতিটি ধৈর্য আর প্রতিটি ত্যাগের হিসাব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা রাখছেন, তখন তার টিকে থাকা সহজ হয়। সে জানে, এই দুনিয়ায় হয়তো সে একটু কম পাবে, কিন্তু পরকালের রাজদরবারে এর প্রতিদান হবে বিশাল। এই বিশ্বাসটাই একটা মৃতপ্রায় সংসারকে আবার প্রাণ দেয়।

কিন্তু যে মানুষের কাছে এই জীবনটাই সব, যার কাছে এরপর আর কিছু নেই, সে কেন কষ্ট করবে? তার কাছে জীবন মানে কেবল উপভোগ। একটু অমিল হলেই সে ভাবে, কেন আমি এই মানুষটার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করব? জীবন তো একটাই, এনজয় করি! ব্যাস, এই একটি ভাবনাই তাকে ঘর থেকে বের করে আনে। সে চলে যায়, আর এভাবেই ভেঙে যায় একটি স্বপ্নের নীড়।

তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা বা আধুনিকতা মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বাধীনতা অনেকের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে দায়িত্বমুক্তির সনদ। তারা মুক্ত হতে চেয়েছে স্রষ্টার বিধান থেকে, আর শেষমেশ তারা মুক্ত হয়ে গেছে নিজের ঘর, নিজের সন্তান আর নিজের নৈতিকতা থেকেও। বিশ্বাসহীন হৃদয়ে কখনো ত্যাগের ফুল ফোটে না; সেখানে কেবল স্বার্থের কাঁটা জন্মায়। আর সেই কাঁটাই আজ আমাদের সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে।

৩. পুঁজিবাদ:

পুঁজিবাদের আসলে কোনো আত্মা নেই, এর একটাই ধর্ম—উৎপাদন এবং মুনাফা। এই ব্যবস্থাটি টিকে থাকে ভোগের ওপর আর ভোগ করার জন্য চাই অঢেল অর্থ। পুঁজিবাদ খুব কৌশলে আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, তুমি যদি ঘরে বসে থাকো, তবে তোমার কোনো মূল্য নেই। তোমার শ্রম যদি বাজারে বিক্রি না হয়, তবে তুমি বোঝা।

এই আধুনিক ব্যবস্থা অঅধিকাংশ নারীকে এসে চুপিচুপি বলেছে, কেন তুমি চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকবে? বাইরে এসো, কর্পোরেট জগতে নিজের হাত শক্ত করো, উপার্জন করো তবেই তুমি হবে প্রকৃত স্বাধীন।

আমাদের মায়েরা একসময় ঘরকে আগলে রাখতেন বটগাছের মতো, সেখানে প্রশান্তি ছিল, মমতার ছায়া ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদ সেই ছায়াকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে বসিয়ে দিল এক যান্ত্রিক প্রতিযোগিতা।

ফলে কী হলো? কর্মক্ষেত্রে হয়তো নারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ল, অফিসের ডেস্কে ডেস্কে সাফল্যের ঝাণ্ডা উড়ল।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটা কি আমরা দেখেছি? সমাজে এমন নারীর সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেল, যিনি মন থেকে একজন স্ত্রী হতে চান, যিনি পরম মমতায় একজন মা হতে চান, যিনি মাটির কিংবা ইটের দালানকে ভালোবেসে একটা ঘর বানাতে চান।

এটা কোনোভাবেই নারীর একক দোষ নয়; এটা একটা বিশাল ব্যবস্থার পাতা নিপুণ ফাঁদ। সেই ফাঁদে পা দিয়ে নারী ভেবেছে সে বুঝি দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, সে আসলে এক ধরণের অদৃশ্য শৃঙ্খল খুলে আরেকটা চকচকে শৃঙ্খল পরেছে, যার নাম কর্পোরেট দাসত্ব। যেখানে তার মমতা বা আবেগের চেয়ে তার প্রোডাক্টিভিটি বা উৎপাদনক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর এই ইঁদুর দৌড়ের ভিড়ে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি হয়ে গেছে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার। কখনো তৃতীয়, আর কখনো বা একে ফেলে দেওয়া হয়েছে ডাস্টবিনে। যে ঘর ছিল মানুষের দুনিয়ার শেষ আশ্রয়স্থল, সেই ঘর আজ কেবল রাত কাটানোর একটা হোটেল মাত্র। যেখানে সবাই থাকে, কিন্তু কারোর জন্য কারোর সময় নেই। পুঁজিবাদের এই জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আজ আমাদের শৈশব এতিম হচ্ছে, আর আমাদের বার্ধক্য হচ্ছে নিঃসঙ্গ।

৪. পুরুষ যখন ভঙ্গুর, নারী তখন রুক্ষ:

আমরা একটা অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতার যুগে বাস করছি। আজ পুরুষ অনেক জায়গায় বড্ড বেশি দুর্বল। কখনো তার মেরুদণ্ডহীন চরিত্রের কারণে, কখনো বা দায়িত্বজ্ঞানহীন অর্থনৈতিক সংকটে। যে পুরুষ একসময় ছিল পরিবারের সেই অটল পাহাড়, যার প্রশস্ত ছায়ার নিচে পুরো পরিবার নিশ্চিন্তে শ্বাস নিত, সেই স্তম্ভটি আজ অনেক ঘরেই নড়বড়ে। সে আর সেই ভরসার জায়গা হতে পারছে না, যার ওপর মাথা রেখে একজন নারী তার সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যেতে পারে।

ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। শূন্যস্থান তো আর খালি থাকে না। বাধ্য হয়েই নারীকে সামনে এগিয়ে আসতে হচ্ছে। তাকে ঘর চালাতে হচ্ছে, বাইরের পৃথিবীর সাথে লড়াই করতে হচ্ছে, কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। সোজা কথায়, তাকে প্রকৃতির দেওয়া নারীত্বর খোলস ভেঙে পুরুষের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক মরণফাঁদ। একটু ভেবে দেখুন, আপনি যদি একজন কাঠমিস্ত্রির কাছে গিয়ে বলেন পাইপলাইনের কাজ করে দিতে, সে কি পারবে? না। সে হয়তো হাতুড়ি চালাতে জানে, কিন্তু প্লাম্বারের সেই সূক্ষ্ম কারিগরি তার জানা নেই। ঠিক তেমনি, প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম আছে। নারী যখন পরিস্থিতির চাপে পড়ে দিনের পর দিন পুরুষের শক্ত ভূমিকাগুলো পালন করতে শুরু করে, তখন অজান্তেই তার ভেতরের সেই সহজাত কোমলতা মরতে শুরু করে। তার স্বভাবে চলে আসে এক ধরণের কাঠিন্য, এক ধরণের কর্কশতা আর নিয়ন্ত্রণের নেশা। সে তখন আর ‘স্ত্রী’ হয়ে থাকতে পারে না, সে হয়ে ওঠে এক ‘যোদ্ধা’।

অথচ পুরুষ? পুরুষ দিনশেষে সবসময়ই সেই চিরন্তন কোমলতা আর একটু উষ্ণতার খোঁজে নীড়ে ফেরে। সে যখন ঘরে এসে সেই চিরচেনা স্নিগ্ধতার বদলে দেখে কঠোরতা আর প্রতিযোগিতার আগুন, তখন সে ছিটকে দূরে সরে যায়। নারী যত বেশি পুরুষের জায়গা দখল করছে, তার ভেতর থেকে মায়াবী নারীত্ব তত বেশি হারিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ ফলাফল? দিনশেষে দুজন মানুষই প্রচণ্ড ক্লান্ত। দুজনই চরম বিরক্ত। একজন তার হৃত সম্মান ফিরে পাচ্ছে না, অন্যজন তার প্রাপ্য প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছে না। আর এভাবেই দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায় এক অদৃশ্য হিমশীতল দেওয়াল, যেটা কোনো ঝগড়ায় ভাঙে না, কোনো তর্কেও কমে না। কেবল নিঃশব্দে এক ছাদের নিচে দুটো অচেনা মানুষকে বয়ে বেড়ায় বিচ্ছেদের মুহূর্ত পর্যন্ত।

৫. শিক্ষার ভুল প্রতিশ্রুতি:

শিক্ষার আলো পথ দেখায়, জ্ঞান মানুষকে উন্নত করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নারীকে জ্ঞানের পরিবর্তে এক ধরণের সূক্ষ্ম অহংকার উপহার দিচ্ছে। এটি নারীকে এক অদ্ভুত মিথ্যা প্রতিশ্রুতির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

শিক্ষার সার্টিফিকেট হাতে ধরিয়ে দিয়ে সমাজ তাকে বলছে তুমি পড়েছ, তুমি যোগ্য, তুমি স্বাবলম্বী; তাই তোমার জন্য এমন একজন পুরুষ অপেক্ষা করছে যে হবে একদম পারফেক্ট। সে তোমার রাজপুত্তুর হবে, তোমার প্রতিটি স্বপ্নকে পালকিতে করে বয়ে বেড়াবে, তোমার কোনো অভাব বা ত্রুটি সে রাখবে না।

আফসোস! এই প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল রূপকথাতেই মানায়, রুক্ষ বাস্তবতার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

বাস্তব জীবনের বিয়েটা কোনো সিনেমার হ্যাপি এন্ডিং নয়। বিয়ে মানে হলো দুটো অসম্পূর্ণ, ত্রুটিযুক্ত আর একদম সাধারণ মানুষ মিলে একটা সম্পূর্ণ জীবন তৈরি করার আজীবন সংগ্রাম। কিন্তু যখন একজন নারী এই বিশ্বাস নিয়ে সংসারে ঢোকে যে, সে আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিল, তখন তার মনের ভেতর একটা অশান্ত ঢেউ সবসময় খেলা করে। সে যখন তার রক্ত-মাংসের সাধারণ স্বামীর কোনো একটা ছোট ভুল দেখে বা সীমাবদ্ধতা খুঁজে পায়, তখন তার অবচেতন মন তাকে খোঁচা দিয়ে বলে “তোমার মতো যোগ্য মেয়ের তো এমন একজনের সাথে থাকার কথা ছিল না!”

এই আরও ভালোর নেশাটা মরীচিকার মতো। সে কখনোই তার বর্তমান মানুষটার সাথে পুরোপুরি মিশে যেতে পারে না। সে সবসময় মনে মনে তুলনা করে, অফিসের কলিগের সাথে, বান্ধবীর স্বামীর সাথে কিংবা কোনো কাল্পনিক নায়কের সাথে। এই অবিরাম তুলনা তাকে দিনশেষে কেবল হতাশাই উপহার দেয়। সে ভুলে যায় যে, নিখুঁত মানুষ কেবল বইয়ের পাতায় থাকে, রক্ত-মাংসের মানুষেরা ভুল আর কমতি দিয়েই তৈরি।

যোগ্যতার এই দেওয়াল যখন ভালোবাসার চেয়ে উঁচু হয়ে যায়, তখন সেই সংসারটা কেবল টিকে থাকার এক নিরানন্দ প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। যে নারী নিজের যোগ্যতাকে স্বামীর ওপর ছড়ি ঘোরানোর অস্ত্র বানায়, সে হয়তো তর্কে জিতে যায়, কিন্তু সে হেরে যায় এক প্রশান্তিময় সংসারের দৌড়ে। দিনশেষে হাহাকারটাই তার চিরসাথী হয়ে থাকে।

৬. নারী কখনো এত ‘সহজলভ্য’ ছিল না

কথাটা বড্ড বেশি কঠিন, শুনতে হয়তো অনেকেরই কানে লাগবে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে রাখলে যেমন সূর্য ডুবে যায় না, তেমনি অস্বীকার করলেই সত্যটা মিথ্যে হয়ে যায় না। আমরা এমন এক বিকৃত সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্কগুলো ডাল-ভাতের মতো সুলভ হয়ে গেছে। আগে একটা সম্পর্ক গড়তে গেলে মানুষের ভেতরে যে ভয়, যে লাজ-লজ্জা আর যে ত্যাগের মানসিকতা লাগত, আজ তার জায়গা নিয়েছে একটা সস্তা ক্লিকের দূরত্ব।

সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন পর্দা, ডেটিং অ্যাপের অন্তহীন ক্যাটালগ আর অবাধ মেলামেশার এই আধুনিক কালচার একজন পুরুষের মগজে প্রতিনিয়ত এই বিষটা ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে, আমার স্ত্রীর চেয়েও আকর্ষণীয়, আরও হাসিখুশি এবং আরও সহজ কেউ একজন হয়তো ওপাশেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। যার সাথে কোনো দায়বদ্ধতা নেই, নেই কোনো ঝুটঝামেলা বা সংসারের ঘানি।

এই ভাবনাটাই হলো আসল বিষ। এই বিষ যখন একবার পুরুষের রক্তে মিশে যায়, তখন সে নিজের ঘরের প্রতি অন্ধ হয়ে পড়ে। তার নিজের স্ত্রী, যে হয়তো সারাটা দিন খেটে তার জন্য একটু প্রশান্তি সাজিয়ে রাখে, সেই স্ত্রীর ত্যাগ তখন তার কাছে একঘেয়েমি মনে হতে থাকে। সে তখন আর স্ত্রীর চোখে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরের জমানো কষ্টগুলো পড়তে পারে না। কারণ, তার চোখ তখন বাইরের সেই রঙিন মরীচিকার দিকে তাকিয়ে থাকে।

সে ভুলে যায় যে, বাইরের ওই উজ্জ্বল আলোটা কেবল একটা ভ্রম মাত্র। অথচ যে মানুষটি ঘরে থেকে সবসময় বাইরে তাকিয়ে থাকে, সে আসলে মানসিকভাবে তার ঘর থেকে অনেক আগেই বিচ্ছেদ নিয়ে নিয়েছে। যার মনোযোগ ঘরে নেই, তার ঘর ভেঙে পড়তে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। এই সহজলভ্য হওয়ার হাতছানি আমাদের পুরুষদের মেরুদণ্ডহীন করে দিচ্ছে, আর আমাদের পবিত্র পরিবারগুলোকে বানিয়ে দিচ্ছে এক একটি ধ্বংসস্তূপ। তারা সস্তা তৃপ্তির খোঁজে অমূল্য হীরা হারায়, আর দিনশেষে যখন হুশ ফেরে, তখন হাতে কেবল এক মুঠো ছাই ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

৭. প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক বিয়েকে একটা ধাঁকা দিয়ে রেখেছে

বিয়ের আগের সেই তথাকথিত প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কগুলো আসলে এক একটা বিশাল ধাঁধা। আমরা যাকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করি, তা আসলে এক চমৎকার মঞ্চনাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, সেই বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সম্পর্কের দিনগুলোতে দুজনেই কেবল নিজের সেরা ভার্সনটা দেখায়। সেরা পোশাক, কৃত্রিম মার্জিত আচরণ, আর ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রাখা এক চিলতে সেরা হাসি। সেখানে কোনো দায়িত্বের চাপ নেই, নেই মাঝরাতে অসুস্থ বাচ্চার কান্না থামানোর তাড়া, নেই মাস শেষে বাজারের ফর্দ নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা শ্বশুরবাড়ির মান-অভিমানের পাহাড়। সবকিছুই সেখানে যেন মেঘের ওপর ভেসে চলা এক রঙিন পালকি।

তারপর আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন—বিয়ে। আর বিয়ের ঠিক পরমুহূর্ত থেকেই শুরু হয় আসল বাস্তবতা। পর্দা নামে নাটকের, জ্বলে ওঠে কর্কশ জীবনের আলো। এখন আর পারফিউম মাখা সেই মানুষটাকে কেবল বিকেলে দেখা যায় না; এখন তাকে দেখতে হয় সকালে ঘুম থেকে ওঠা ফোলা চোখে, ঘরোয়া সাধারণ পোশাকে। তাকে দেখতে হয় রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারানো মুহূর্তে, অভাবের দিনে হতাশায় ভেঙে পড়া সময়ে কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ক্লান্তিতে।

আর তখনই মনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এসে দাঁড়ায় “আমি কি এই মানুষটাকেই ভালোবেসেছিলাম? এটা কি সেই রাজপুত্র কিংবা সেই স্বপ্নে দেখা পরী?”

না, আপনার সঙ্গী বদলে যায়নি। বরং আপনি এতোদিন যা দেখেছিলেন তা ছিল একটা সাজানো ভ্রম। প্রেমের সম্পর্কগুলো আমাদের কক্ষনো বাস্তবতার জন্য তৈরি করে না; বরং সেগুলো আমাদের একটা ঘোরের মধ্যে আটকে রাখে। বিয়ের পর যখন সেই মোহভঙ্গের সময় আসে, যখন ভ্রমের রঙিন চশমাটা নাক থেকে খসে পড়ে, তখন ধাক্কাটা সইতে পারা বড্ড কঠিন হয়ে যায়। কারণ, আমরা বাস্তবকে ভালোবাসতে শিখিনি, আমরা ভালোবেসেছিলাম একটা কল্পনাকে।

আর এই ভ্রম যখন ভাঙে, তখন কেবল স্বপ্নগুলোই চুরমার হয় না; সাথে ভেঙে যায় একটি সাজানো সংসার, এক জোড়া মানুষের বিশ্বাস আর আগামীর সমস্ত সম্ভাবনা। আমরা আসলে ভালোবাসার নামে এক মরীচিকার পেছনে দৌড়াচ্ছি, আর আসল তৃষ্ণা মেটানোর সময় যখন আসে, তখন দেখি আমাদের হাতের পাত্রটা একদম শূন্য।

৮. ভালোবাসার ভুল সংজ্ঞা

আমরা এক অদ্ভুত ‘রোমান্টিসিজমের’ যুগে বাস করছি। আমাদের নাটক, সিনেমা আর সস্তা সব উপন্যাস আমাদের শিখিয়েছে যে, ভালোবাসা মানেই হলো কেবল হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া কিংবা এক ধরণের অবিনশ্বর উত্তেজনা। আমরা মনে করি, যতক্ষণ মনে শিহরণ আছে, ততক্ষণই ভালোবাসা বেঁচে আছে।

কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, কেউ আমাদের কানে কানে এসে এই কঠিন সত্যটা বলেনি যে, ভালোবাসা মানে আসলে এক বিশাল পাহাড় সমান দায়িত্ব। ভালোবাসা মানে হলো দিনশেষে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, অন্যের প্রতি জবাবদিহিতা থাকা।

ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। মানুষ যখন বিয়ের কয়েক বছর পর দেখে যে আগের মতো সেই উত্তেজনা কাজ করছে না, মনে আর সেই প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটাচ্ছে না, তখন সে হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, “আমাদের মাঝে বোধহয় আর ভালোবাসা নেই।”

না, ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়নি। বরং আপনি আসলে সম্পর্কের সেই পিচ্ছিল আর সহজ পথটা ছেড়ে কঠিন ও প্রকৃত পথে পা রাখতে ভয় পাচ্ছেন। প্রকৃত ভালোবাসা তো শুরুই হয় সেখান থেকে, যেখানে সস্তা রোমান্স শেষ হয়।

যখন আপনি প্রচণ্ড ক্লান্ত, আপনার সঙ্গীও সারাদিনের ঝক্কি সামলে বিধ্বস্ত, তবুও আপনি তার হাতটা ছাড়েন না; সেটাই হলো প্রকৃত প্রেম। যখন একে অপরের দোষ-ত্রুটিগুলো নগ্নভাবে সামনে চলে আসে, তবুও আপনি তাকে ছুড়ে না ফেলে আঁকড়ে ধরে রাখেন; সেটাই হলো বিয়ে।

ভালোবাসা কোনো ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির নাম নয়, ভালোবাসা হলো এক আজীবন সংগ্রামের নাম। এই ধ্রুব সত্যটা আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থা মানুষকে কেউ শেখায়নি। তারা কেবল শিখিয়েছে কীভাবে সুন্দর মুহূর্তে হাসতে হয়, কিন্তু কেউ শেখায়নি কীভাবে কঠিন মুহূর্তে কাঁদতে কাঁদতে একজনের কাঁধে মাথা রেখে ধৈর্য ধরতে হয়। আমরা আসলে ভালোবাসার মোড়কটাকেই চিনেছি, ভেতরের আসল জিনিসটা আমাদের কাছে অজানাই রয়ে গেছে।

৯. ধার্মিকতার মুখোশ

আমাদের দ্বীনি সমাজে বিয়ের পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটা বহুল প্রচলিত মাপকাঠি হলো, “ছেলেটা তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে” কিংবা “মেয়েটা তো পর্দা করে”। অবশ্যই এগুলো চমৎকার গুণ, প্রশংসনীয় অভ্যাস। কিন্তু ট্র্যাজেডি শুরু হয় তখন, যখন আমরা এই অভ্যাসগুলোকেই চূড়ান্ত ধার্মিকতা বলে ভুল করি।

বিয়ের আগে আমরা অনেকেই ধর্মের একটা সুদৃশ্য চাদর গায়ে জড়িয়ে নেই। আমরা বড্ড বেশি নামাজি হয়ে যাই, বড্ড পরহেজগার আর নম্রতার অবতার সেজে থাকি। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, চারিত্রিক ত্রুটিগুলো সাময়িকভাবে লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু সারাজীবনের জন্য মুছে ফেলা যায় না।

সংসারের ঘানি যখন কাঁধে চাপে, যখন দিনের পর দিন ক্লান্তি আর অভাবের সাথে লড়াই করতে হয়, যখন একই ছাদের নিচে ২৪ ঘণ্টা কাটানো শুরু হয়, তখন মানুষের সেই সুনিপুণভাবে ধরে রাখা মুখোশটা খসে পড়তে বাধ্য।

ইটের পর ইট সাজালে যেমন ইমারত হয়, তেমনি দিনের পর দিন একসাথে থাকতে থাকতেই মানুষের ভেতরের আসল মানুষটা বেরিয়ে আসে। আর ঠিক তখনই অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের পাশের মানুষটাকে আমরা একদমই চিনি না।

যে মানুষটা মসজিদে প্রথম কাতারে দাঁড়াত, সে-ই হয়তো ঘরে এসে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলছে। যে মেয়েটা সারাক্ষণ তসবিহ হাতে থাকত, সে-ই হয়তো তুচ্ছ কারণে ঘরকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলছে।

কেন এমন হয়? কারণ, আমরা দ্বীনকে আমাদের পোশাকে এনেছি, আমাদের কপালে সিজদাহর চিহ্ন এনেছি কিন্তু আমাদের আখলাক বা চরিত্রে ইসলামকে আনতে পারিনি।
তাই বিয়ের আগে শুধু সিজদাহর দাগ দেখলে হবে না; দেখতে হবে মানুষটার মেজাজ। দেখতে হবে রাগের চরম মুহূর্তে সে নিজেকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দেখতে হবে কষ্টের সময় তার মানসিকতা কেমন হয়, সে কি ধৈর্য ধরে, নাকি সবকিছুর ওপর দায় চাপিয়ে দেয়? মনে রাখবেন, প্রকৃত ধার্মিকতা পাঞ্জাবিতে নেই, দাড়ি কিংবা হিজাবেও নেই; প্রকৃত ধার্মিকতা লুকিয়ে থাকে মানুষের ব্যবহারে, তার গোপন চরিত্রে। কারণ, রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ কেবল ইবাদাতে নয়, বরং সম্পর্কের কোমলতা আর আচরণের মাধুর্যেও বিদ্যমান।

(অবশ্যই যে দ্বীনদার তার পোশাকে তার দ্বীনদারিত্ব ফুটে উঠবে)

১০. মনোযোগের দারিদ্র্য

আমরা ইতিহাসের এমন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের পকেট ভর্তি টাকা থাকতে পারে, কিন্তু তার মনোযোগের ভাণ্ডার একদম শূন্য। আমরা বাস করছি এক বিক্ষিপ্ত মনোযোগের যুগে। আমাদের চারপাশে আজ বিনোদনের অভাব নেই, স্মার্টফোন আছে, প্রতি সেকেন্ডে টুং করে ওঠা নোটিফিকেশন আছে, চোখের পলকে বদলে যাওয়া রিলস আর শর্টস আছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেশা ধরানো সিরিজ আছে।

আফসোস! আমাদের ফোনের ব্যাটারি ফুল চার্জ থাকলেও, আমাদের সংসারের প্রশান্তির চার্জ আজ একদম তলানিতে।
একটু খেয়াল করে দেখুন, ড্রয়িংরুমে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বসে আছেন। পাশাপাশি, হয়তো শরীরের স্পর্শ পাওয়া যায় এমন দূরত্বে। কিন্তু তারা কি আসলে একসাথে আছেন? না। স্বামী ডুবে আছেন তার ফেসবুকের ফিডে, আর স্ত্রী হয়তো স্ক্রল করছেন তার পছন্দের কোনো অনলাইন শপ। মাঝখানে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটো নীল আলোর স্ক্রিন।

স্ত্রীর মনে হয়তো কোনো একটা জমানো কষ্ট ছিল, সে হয়তো খুব চেয়েছিল আজকে তার স্বামীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে। কিন্তু স্বামীর তো অবসর নেই, তার নোটিফিকেশন তাকে ডাকছে। আবার স্বামী হয়তো সারাটা দিন বাইরের হাজারো ক্লান্তি শেষে একটুখানি মমতা চেয়েছিল, কিন্তু স্ত্রী তখন রিলসের রঙিন দুনিয়ায় বিভোর।

আমরা একই ছাদের নিচে আছি, একই বিছানায় ঘুমাচ্ছি কিন্তু আমরা আসলে ভীষণ একা। দুটো স্ক্রিনের পেছনে লুকিয়ে থাকা দুটো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আমাদের এই মনোযোগের দারিদ্র্য আজ তিল তিল করে আমাদের সংসারগুলোকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা বাইরের হাজারো মানুষকে লাইক আর কমেন্ট দিচ্ছি, কিন্তু ঘরের মানুষটার চোখের ভাষা পড়ার সময় আমাদের নেই।

এই যে নীরবতা, এই যে একে অপরের প্রতি নিস্পৃহতা, এটাই সংসার ভাঙার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তালাক হওয়ার আগেই আমাদের মনগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছেদ নিয়ে নেয় এই ছোট একটা ডিভাইসের কারণে। আমরা আধুনিক হতে গিয়ে আসলে আদিম নিঃসঙ্গতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মনোযোগ না দিলে কোনো বাগান যেমন বাঁচে না, মনোযোগ না দিলে কোনো দাম্পত্যও টিকে থাকে না। এই ডিজিটাল নেশা আমাদের ঘরগুলোকে আজ এক একটা জীবন্ত কবরে পরিণত করছে।

১১. আল্লাহকে ছেড়ে দিলে, আল্লাহও ছেড়ে দেন

এটাই শেষ কথা। এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য। আমরা মুখে নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করি, কিন্তু আমাদের জীবন কি আসলেই ইসলামের ছায়ায় ঢাকা?

আমরা ভুলে গেছি যে, আমাদের জন্য বিয়েটা কেবল কয়েক পাতার একটা সামাজিক চুক্তি নয়; বিয়ে হলো এক পবিত্র ইবাদাত।

অথচ আমরা আজ কতটুকু ইসলাম মেনে সংসার করি?

আমাদের ইসলাম কেবল টুপি-দাড়ি আর তসবিহতে আটকে গেছে। স্বামী যখন তার স্ত্রীর সাথে ব্যবহার করে, তখন সে ইসলামের সেই মহান শিক্ষাটা ভুলে যায়, যেখানে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।” সে কেবল নিজের অধিকার আদায়ের বেলায় সিংহ হয়ে ওঠে, কিন্তু স্ত্রীর হক দেওয়ার বেলায় সে এক স্বার্থপর দাসে পরিণত হয়।
আবার স্ত্রী? সে কি তার স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ? নাকি তার সারাদিনের পুঁজি কেবল এক ঝুড়ি অভিযোগ আর অপ্রাপ্তির হাহাকার? সে ভুলে যায় যে, কৃতজ্ঞতা ছাড়া কোনো ঘর কখনো বরকতময় হয় না।

আফসোস! আমরা ইসলামকে ব্যবহার করি কেবল অন্যের ওপর ছড়ি ঘোরানোর জন্য। আমরা কুরআনের আয়াত খুঁজি নিজের পাওনা বুঝে নিতে, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনের সময় আমাদের আর ইসলামের কথা মনে থাকে না। এই যে ভারসাম্যহীনতা, এই যে দ্বিমুখী নীতি, এটাই আজ আমাদের ঘরগুলো ভাঙার সবচেয়ে বড় কারণ।

আজ আমাদের ঘরে যে হাহাকার, যে বিচ্ছেদের মিছিল, তা আসলে আল্লাহর দেওয়া এক নীরব সতর্কবার্তা। আমরা আল্লাহকে আমাদের ঘরের বাইরে রেখে শান্তি খুঁজতে চেয়েছি। কিন্তু যে ঘরে আল্লাহর হুকুম নেই, সেখানে প্রশান্তি আসবে কোত্থেকে? যে মানুষগুলো স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তারা কোনোদিন সৃষ্টির সাথে সুখে থাকতে পারে না। আমরা যদি আবার সেই শেকড়ে ফিরে না যাই, তবে বিচ্ছেদের এই মহামারী আমাদের পুরো সভ্যতাকেই একদিন গিলে খাবে।

শেষ কথা: ফিরে আসার আকুতি

তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ কেবল একটা সংখ্যা নয়। প্রতিটি বিচ্ছেদের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক বুক ভাঙা স্বপ্ন, এক নদী কান্না আর এক জোড়া নিষ্পাপ শিশুর আকাশসমান শূন্যতা। ঘর ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মাত্র একটি প্রশ্ন করুন—

“আমি কি এই সংসারে কেবল নিতে এসেছি, নাকি কিছু দিতে এসেছি?”

আপনার এই উত্তরটাই ঠিক করে দিবে আপনার সংসার জান্নাতের পথে যাবে, নাকি আদালতের করিডোরে। বিচ্ছেদ সমাধান নয়, সমাধান হলো নিজেকে বদলে ফেলা, বিশ্বাসে ফিরে আসা এবং ভালোবাসার বাগানে আবার নতুন করে পানি ঢালা।

© সংকলক: জাহিদ হাসান
শিক্ষক, লেখক, কিডস এন্ড প্যারেন্টিং অ্যাক্টিভিস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eighteen + 12 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য