Monday, June 22, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

HomeUncategorizedইসরাইলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়েছে ইরান

ইসরাইলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়েছে ইরান

যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর কিছু অপরাধমূলক দলিল আবার খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যখন ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজি করাতে নানা যুক্তি তুলে ধরছিল, তখন জায়নবাদী লেখক ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলামিস্ট ব্রেট স্টিফেনস তার বিভিন্ন লেখায় এমন এক ইসরাইলকে জোরালো সমর্থন দিতে থাকেন, যে দেশটি মানুষকে ধর্ষণের জন্য কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেয়। তিনি তার এক কলামে যুদ্ধে শিগগিরই পরাজিত হতে যাওয়া ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কী কী অর্জন করা উচিত, তার একটি তালিকাও তুলে ধরেন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ব্রেট স্টিফেনসের সেই বিভ্রান্তিপূর্ণ এবং ভারসাম্যহীন কলামটি আবার খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তিনি তার লেখায় ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের বিজয়ের চারটি পরিস্থিতি কল্পনা করেছিলেন। প্রথমটি ছিল ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, যা তার মতে ‘কারো উপেক্ষা করা উচিত নয়, বিশেষ করে যদি ইরান সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্রমাগত বিধ্বস্ত হতে থাকে এবং সম্ভবত নেতৃত্বের আরো উচ্চস্তর হারাতে থাকে’।

দ্বিতীয়টি ছিল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন—‘এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যা বহাল থাকবে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দাবি মেনে চলবে’। তিনি লিখেছেন, ইরানের বিচ্ছিন্নতা ‘বিশেষভাবে প্রকট হবে যদি মার্কিন বাহিনী খার্গ দ্বীপ দখল করে… যেটি ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানির টার্মিনাল হিসেবে কাজ করে।’

তৃতীয়টি ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে এবং চতুর্থটি ছিল ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের পতন। এর সবচেয়ে উদ্বেগজনক রূপটি হতে পারে ১৩ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময়কার সিরিয়ার মতো, যেখানে ইরানের কিছু এলাকায় শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে, অন্য জায়গায় এর পতন ঘটবে, যে পরিস্থিতি বিদেশি হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানাবে এবং ব্যাপক মাত্রায় হত্যাকাণ্ডের দিকে নিয়ে যাবে। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় শরণার্থীর ঢল নামবে…।’

ইসরাইল হেরেছে, ইরান টিকে গেছে

ব্রেট স্টিফেনসের ওই জঘন্য কলামটি হলো সেই বিভোর জায়নবাদীদের গণহত্যামূলক মানসিকতার এক ঐতিহাসিক দলিল, যাদের এ শহরে প্রতি সপ্তাহে পত্রিকাটির একটি পুরো কলাম দেওয়া হয় অন্য জাতিগুলোর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য। এ কাজটিকে তারা মনে করেন গণহত্যায় লিপ্ত ইসরাইলের সর্বোত্তম স্বার্থে, যে দেশটিকে রক্ষার জন্য তাদের অর্থ দেওয়া হয়।

কিন্তু বাস্তবে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান এবং মিসরে প্রায় ৮০ বছরের গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ভূমি দখলের পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে ইসরাইল। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিনির ইচ্ছা ও বিচারবুদ্ধির বিরুদ্ধে গিয়ে এই যুদ্ধে বোকা ও গুন্ডা ট্রাম্পকে টেনে এনেছিল। কিন্তু তারপরও ইসরাইল এই যুদ্ধে হেরেছে। তাদের মোসাদ ও হাসবারা, তাদের আইপ্যাক ও অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগ (এডিএল), তাদের কেনা আমেরিকান রাজনীতিবিদ, তাদের ইরানি রাজতন্ত্রবাদী দালাল এবং হুভার ইনস্টিটিউশন ও অন্যান্য স্থানে তাদের দালাল থিংক ট্যাংকাররা সবাই মিলে ইরানের কাছ থেকে শোচনীয় এক পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে উল্টো ইরান আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে। দেশটির শাসনব্যবস্থা অক্ষত আছে, পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর এর সার্বভৌম অধিকার বহাল আছে এবং এর ভৌগোলিক অখণ্ডতা মূল্যবান হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ইসরাইল ট্রাম্পকে বোকা বানিয়ে আমেরিকার সাহায্য নিয়ে ইরানের নাগরিক অবকাঠামো, সাংস্কৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র ধ্বংস করতে এবং মিনাব স্কুলের নিরীহ শিশুদের গণহত্যাসহ অনেক কিছু করেছে। কিন্তু বিজয় শেষ পর্যন্ত ইরানেরই হয়েছে।

সারা বিশ্ব যখন ইসরাইলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেখছিল, তখন নিউ ইয়র্ক টাইমসের ইসরাইলপন্থি দুই কলামিস্ট টমাস ফ্রিডম্যান ও ব্রেট স্টিফেনস ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা ভন্ডুল করার মরিয়া চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন, যাতে এটি প্রমাণ করা যায়, বসতি স্থাপনকারী এই শয়তান উপনিবেশটি ভুক্তভোগী হিসেবে একটি ন্যায়সংগত সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। ইরানকে একটি জঘন্য শাসনব্যবস্থা হিসেবে দানবীয় রূপে তুলে ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমস মার্কিন জনগণকে এই বিশ্বাস করাতে চাইছিল, ইরান শয়তান আর ইসরাইল ন্যায়পরায়ণ একটি দেশ।

আমেরিকানদের জন্য এক বিজয়

প্রভাবশালী আমেরিকান গণমাধ্যমের কথা শুনলে মনে হবে, ট্রাম্প সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং তারপর শান্তি আলোচনার সময় ঔদ্ধত্যের সঙ্গে ইসরাইলকে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়েছেন। কিন্তু ঘটনাটি সম্পূর্ণ উল্টো। নেতানিয়াহু এবং মোসাদ প্রধান ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে যোগ দিতে প্ররোচিত করেছে এবং ইরান ও লেবাননে ক্রমাগত বোমা হামলা করে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ট্রাম্প আমেরিকান জনগণের অদম্য ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে ইসরাইলকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং মার্কিনিদের সর্বোত্তম স্বার্থে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ মার্কিন জনগণ এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এটি অবৈধ যুদ্ধ ছিল, যার অনুমোদন মার্কিন কংগ্রেস দেয়নি। সুতরাং এ বিজয় ইরানের ও আমেরিকান জনগণের বিজয়।

যুদ্ধে পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর ইরানের অবিচ্ছেদ্য অধিকার ভেঙে পড়েনি। তারা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে, নৃশংস ইসরাইলি বোমারু বিমানের আঘাত সহ্য করেছে এবং কঠোর পাল্টা আঘাত হেনেছে। ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেখে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ আনন্দিত হয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা করে সেগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি তারা তাদের তুরুপের তাস হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দিয়েছে।

গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার মতোই ইরান যুদ্ধও পুরো বিশ্বকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। একের পর এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইসরাইল আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত ঔপনিবেশিক সত্তা। জরিপ অনুসারে, এই ফল ‘গ্লোবাল কান্ট্রি পারসেপশনস ২০২৬’ র‍্যাংকিংয়ের একেবারে তলানিতে স্থান দিয়েছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ‘আমেরিকানদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ইসরাইল ও নেতানিয়াহু সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমাগত বাড়ছে।’ জরিপগুলো ইঙ্গিত দেয়, ৬০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যা গত বছর ছিল ৫৩ শতাংশ। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই ৫০ বছরের কম বয়সি ভোটারদের অধিকাংশ এখন ইসরাইল এবং নেতানিয়াহুকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে।

ইরানিরা এই যুদ্ধে জিতেছে, আমেরিকান পণ্ডিতদের ভাষ্যমতে, এই যুদ্ধ ইরানিদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত উপনিবেশবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তুলেছিল। তারা সর্বদাই একই সঙ্গে বিদেশি আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা করে যাবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা ইরানিদের তাদের সরকারের সমালোচনা করার এবং তাদের নাগরিক স্বাধীনতা ও অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার রক্ষার অধিকার আছে। তাদের সংবিধানে বর্ণিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের অধিকার, স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন ও নারী অধিকার দাবি এবং তা আদায় করার আন্দোলন অব্যাহত রাখার পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। এসব বিষয়ে কারোরই দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই।

এগুলো ইরানিদের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার। কিন্তু এগুলো শুধু তখনই অর্জন করা যাবে, যদি তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা বজায় থাকে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে হত্যাকারী মোসাদের এজেন্টদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করা হয় এবং নিরীহ শিশু ও নাগরিক অবকাঠামো লক্ষ করে চালানো ইসরাইলি-মার্কিন নৃশংস বোমা হামলা বন্ধ করা হয়।

বর্তমানে অন্যান্য জাতির মতো ইরানিদের সামনেও এক দীর্ঘ ও বিপৎসংকুল পথ রয়েছে, যেখানে তাদের নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত করাই আজ সবচেয়ে মৌলিক এবং বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা। যে সরকারই শাসন করুক না কেন, জনগণের এসব মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করা তাদের আবশ্যিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

sixteen + 15 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য