দেশে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৮৯৬ জন রোগীর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে ঢাকায় ৪০৩ জন এবং ঢাকার বাইরে ৪৯৩ জন। আগের দিন গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় রোগী ছিল ৮৪৫ জন, ঢাকার বাইরে ছিল ৯১০ জন। অর্থাৎ গত দুই দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর বেশির ভাগই ঢাকার বাইরের।

ঢাকার বাইরে রোগী বেড়েছে ১৩ গুণচলতি বছরের জুনের প্রথম ২০ দিনে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয় ৬৪৬ জন। জুলাইয়ে একই সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৮০৬। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে ১৩ গুণের বেশি।
এর আগে শুধু ২০১৯ সালে দেশের সব জেলায় রোগী পাওয়া গিয়েছিল। সে বছর আক্রান্ত হয় এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় আক্রান্ত হয় ৪৯ হাজার ৫৪৪ জন।
২০১৯ সালের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা
বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, জুলাই মাস থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ চূড়ায় অবস্থান করে। এরপর কমতে থাকে। এ বছর জুন মাস থেকে রোগী বাড়তে শুরু করেছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা সংস্থা আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন বলেন, গত বছর ডেঙ্গুর ‘পিক (সর্বোচ্চ পর্যায়)’ ছিল অক্টোবর মাসে। এখন যে অবস্থা, তা উঠতির দিকে। অক্টোবরের আগেই পিকে চলে যায় কি না, বলা যাচ্ছে না। যে পরিস্থিতি, এতে বলা যায়, এই ধারা চলবে আরো কয়েক মাস। গত বছর শীতের সময়ও রোগী পাওয়া গেছে। ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২০১৯ সালকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
তিন সপ্তাহে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ২০ হাজারের বেশি
দেশে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে চলতি মাসের ২১ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০৯ জন। এ সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২০ হাজার ৪৬৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছয় হাজার ৭৬ জন রোগী। তাদের মধ্যে ঢাকায় তিন হাজার ৫৬০ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে দুই হাজার ৫১৬ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২৮ হাজার ৪৪৩ জন, মৃত্যু ১৫৬ জনের।
গতকাল তথ্য দেয়নি ঢাকার ৩৫ হাসপাতাল
তিন দিন ধরে দৈনিক দেড় সহস্রাধিক করে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছিল হাসপাতালে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার মারা যায় ১৩ জন, তার পরের দিনই সর্বোচ্চ ১৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার এই সংখ্যা ৯ হলেও গতকাল শুক্রবার বেশির ভাগ হাসপাতাল তথ্য না দেওয়ায় প্রকৃত চিত্র উঠে আসেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম ঢাকা মহানগরের ২০টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালের এবং বেসরকারি ৪৮টি হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করে পরিসংখ্যান দেয় প্রতিদিনের বিজ্ঞপ্তিতে। এর মধ্যে ছয়টি সরকারি হাসপাতাল এবং ২৯টি বেসরকারি হাসপাতাল তথ্য দেয়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি যেসব হাসপাতাল তথ্য দেয়নি সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সাভার) এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট।
ঢাকার বাইরে ১০ জেলায় বেশি রোগী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ঢাকার বাইরে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে ১৫৬ জন, ফরিদপুরে ১০৬ জন, পিরোজপুরে ১০১ জন, গাজীপুরে ৯৭ জন, চাঁদপুরে ৯৬ জন, বরিশালে ৯০ জন, পটুয়াখালীতে ৭৫ জন, শরীয়তপুরে ৬৮ জন, লক্ষ্মীপুরে ৯ জন এবং কুমিল্লায় ৬৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, গত কয়েক বছরে ডেঙ্গু ঢাকার বাইরেও ছড়িয়েছে। এগুলো ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করেছে। আরো বাড়বে।
তিনি বলেন, ‘এত দিন আমরা শুধু ঢাকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, এখন আমাদের সারা দেশ নিয়ে কাজ করার সময় হয়েছে। এ জন্য ঢাকার বাইরেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। কীটতাত্ত্বিকদল প্রয়োজন, ল্যাবরেটরি লাগবে, মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ও যন্ত্রপাতি লাগবে। একই সঙ্গে জেলা হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, রোগী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি চিকৎসকদল গড়ে তুলতে হবে। জটিল রোগী চিকিৎসায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে রোগীকে ঢাকায় আসতে না হয়। এতে রোগীর মৃত্যু এবং ঢাকার রোগীর চাপ কমবে।’
