ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ইসলামী ব্যাংকিং বিস্তৃত হলেও এখন অমুসলিম দেশগুলোতে এমনকি অমুসলিম গ্রাহকরাও ইসলামী ধারার ব্যাংকিং গ্রহণ করছে। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি হচ্ছে লাভ-লোকসান দুটিই ব্যাংক ও গ্রাহক শেয়ার করবে। অথচ প্রচলিত ব্যাংকগুলো লাভের ভাগ নিতে রাজি, লোকসানের ঝুঁকি নয়। সে কারণেই অমুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী ব্যাংকিং পণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তিন দশক আগেও যেখানে ইসলামী অর্থনীতি সামান্যই ছিল, বর্তমানে তার আকার দাঁড়িয়েছে চার ট্রিলিয়ন ডলার। স্ট্যাট অব গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে বর্তমানে কয়েক শ ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ইসলামী আর্থিক শিল্পের সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং। এই খাতের মোট সম্পদের ৭০ শতাংশ বা ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং। প্রতিবেদন অনুযায়ী আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে ইসলামী অর্থনীতির আকার দাঁড়াবে ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলার।
ইসলামী অর্থনীতি বর্তমান প্রচলিত অর্থনীতির মাত্র ১ শতাংশ। যদিও ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী এই খাতে বছরে প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশ। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বলছে, প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার চেয়ে অনেক দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং। সংস্থাটি জানায়, ২০২৩ থেকে ২০২৪ এই দুই বছরে ইসলামী অর্থনীতিতে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি আসবে ১০ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে সৌদি আরব ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো।
ইসলামী অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়া অমুসলিম দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, লুক্সেমবার্গ, হংকং, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া ও আইভরি কোস্ট। বর্তমানে ইসলামী অর্থনীতি দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ মনে করা হচ্ছে সভরেইন সুকুক ও ইসলামী বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ, যা সুদমুক্ত কিন্তু লাভজনক। দুবাইভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক আলপেন ক্যাপিটালের নির্বাহী পরিচালক হামিদ নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘ইসলামী অর্থায়ন শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে এরই মধ্যে চালকের ভূমিকায় উঠে এসেছে সুকুক। গত এক বছরে আমরা দেখলাম সুকুকের ইস্যুকরণ রেকর্ড ভেঙেছে। আশা করা যায়, আগামী দিনেও এটি প্রবৃদ্ধির নেতৃত্বে থাকবে।’
তারল্য ব্যবস্থাপনা, বাজেট ঘাটতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ বিনিয়োগ ও গণ-অংশগ্রহণমূলক বিনিয়োগ হিসেবে ‘সুকুক’ এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী মুসলিম ও অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উভয় দেশগুলোতে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সুকুকের মেয়াদের বিবেচনায় দুটি রূপ আছে। একটি স্বল্প মেয়াদি। এটি সাধারণত এক বছর বা এর কম মেয়াদি হয়ে থাকে। অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি। এটি সাধারণত এক বছরের বেশি হয়ে থাকে।
প্রচলিত আর্থিক বাজারে মুসলিম গ্রাহকদের বিনিয়োগ করার আগ্রহ থাকলেও, তারা তা করতে পারেনি। কারণ শরিয়াহ আইন অনুযায়ী সুদ, জুয়া, ও ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। চুক্তি এবং অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে সুকুক ও প্রচলিত বন্ডের মধ্যে পার্থক্য আছে। সুকুক একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে সিলমোহর লাগিয়ে কাউকে অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়ার আইনি দলিল। প্রচলিত বন্ডে ইস্যুকারীর ঋণের দায়বদ্ধতার উপস্থাপন করে, অন্য পক্ষে সুকুক কোনো সম্পত্তির মালিকানা নির্দেশ করে। সাধারণত সুকুকধারীরা সম্পদের মালিকানা লাভ করেন এবং মুনাফা পান। সুকুক ইস্যুকারী চুক্তি অনুসারে মেয়াদ শেষে ফেস ভ্যালুতে বন্ড কিনতে বাধ্য থাকে। ফলে মুসলিম দেশগুলোর পাশাপাশি অমুসলিম দেশগুলোতেও সরকারের পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছে সুকুক জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বের প্রথম অমুসলিম দেশ হিসেবে সুকুক ইস্যু করে যুক্তরাজ্য। ২০১৪ সালে প্রথম দেশটি ২৫৬ মিলিয়ন ডলারের সুকুক ইস্যু করে।
ইসলামী অর্থনীতিতে আরেকটি সহায়ক শক্তি এখন ফিনটেক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বৈশ্বিক ব্যাংকিংয়ের অন্যান্য খাতের মতো ইসলামী ব্যাংকিংয়েও আগামী পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে প্রযুক্তি। সম্প্রতি ‘ফেইথ অ্যান্ড ফিন্যান্স : দ্য চেঞ্জিং ফেস অব ইসলামিক ব্যাংকিং’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে জরিপের এ তথ্য উঠে আসে। ক্লাউড ব্যাংকিং প্ল্যাটফরম ম্যামবু পরিচালিত ওই জরিপে বিশ্বজুড়ে দুই হাজার মুসলিম তরুণ অংশগ্রহণ করেন। তাতে ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, আগামী দিনের সম্ভাবনা হিসেবে তাঁরা অনলাইন ব্যাংকিংকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, ৭০ শতাংশ তরুণ বলেন, তাঁরা ব্যাংকে না গিয়েই সব কাজ সারতে চান, ৭৪ শতাংশ জানান, তাঁরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাংকের সব সেবা পেতে চান। ৮০ শতাংশ তরুণ বলেছেন, তাঁরা যেকোনো সময়ে যেকোনো স্থানে ব্যাংকের সেবা পেতে চান। সূত্র : ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকার, সিএনবিসি।
